কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী পাইলট উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় সরকারিকরণের ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। সেই ঘোষণার ৩৩ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও বাস্তবায়ন হয়নি সরকারিকরণের প্রক্রিয়া। দীর্ঘদিনের এই দাবি পূরণে এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিকে তাকিয়ে কটিয়াদীবাসী। তাদের প্রত্যাশা- মায়ের দেওয়া প্রতিশ্রুতি এবার ছেলের হাত ধরে বাস্তবায়িত হবে।
১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত কটিয়াদী পাইলট উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে কটিয়াদীসহ আশপাশের এলাকায় নারী শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এসএসসি পরীক্ষায় ধারাবাহিক ভালো ফলাফলের পাশাপাশি ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক, বিতর্ক, বিজ্ঞান ও বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমেও সাফল্য রয়েছে বিদ্যালয়টির।
বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের অনেকে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছেন। আবার অনেকে প্রশাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রকৌশল, ব্যাংকিং ও বিচার বিভাগসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পেশায় কর্মরত রয়েছেন।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৩ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কটিয়াদী সফরকালে বিদ্যালয়টি সরকারিকরণের ঘোষণা দেন। এর তিন দিন পর ৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন একান্ত সচিব ড. কামাল সিদ্দিকী স্বাক্ষরিত একটি চিঠির মাধ্যমে সরকারিকরণের বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরুর নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে অজ্ঞাত কারণে সেই প্রক্রিয়া আর শেষ হয়নি। এরপর কেটে গেছে তিন দশকেরও বেশি সময়। পরিবর্তন হয়েছে সরকার, এসেছে নতুন শিক্ষানীতি ও বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি। কিন্তু সরকারিকরণের অপেক্ষায় থাকা বিদ্যালয়টির ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি।
বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। এমপিওভুক্ত শিক্ষক রয়েছেন ২৬ জন। এর মধ্যে ১২টি পদ শূন্য রয়েছে। তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী রয়েছেন তিনজন। বিদ্যালয়টি ১৯৮১ সালে এমপিওভুক্ত হয়। প্রায় ১ একর ৯৩ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিতে সরকারিকরণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও অন্যান্য শর্ত পূরণ হয়েছে বলে দাবি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের মতে, সরকারিকরণ হলে শিক্ষকদের চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়ন আরও গতিশীল হবে। নির্মাণ করা যাবে নতুন একাডেমিক ভবন, আধুনিক বিজ্ঞানাগার ও গ্রন্থাগার। বাড়বে তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার সুযোগ এবং সরকারি বিভিন্ন সুবিধা।
দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ইয়া ইসলাম বলে, বিদ্যালয়টি লেখাপড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমেও ধারাবাহিক সাফল্য অর্জন করছে। সরকারিকরণ হলে এসব কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত হবে।
ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী সাওদা জামান বলে, সরকারিকরণ হলে আধুনিক শিক্ষা উপকরণ, উন্নত শ্রেণিকক্ষ, বিজ্ঞানাগার ও কম্পিউটার সুবিধা পাওয়া যাবে। এতে শিক্ষার মান আরও উন্নত হবে।
দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মারিয়া আলম রামিশা বলে, সরকারিকরণ হলে মেয়েরা আরও নিরাপদ ও আধুনিক পরিবেশে পড়াশোনার সুযোগ পাবে। ভবিষ্যতে দেশের উন্নয়নে তারা আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।
একই শ্রেণির শিক্ষার্থী ঝিলমৌ মনি বলে, সরকারের শিক্ষা উন্নয়নের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বিদ্যালয়টির সরকারিকরণ এখন সময়ের দাবি।
দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাসমিয়া আমিন নিছু বলে, সরকারিকরণ হলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষার মান বৃদ্ধি এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত হবে।
অভিভাবক মোহাম্মদ মতিউর রহমান কাজুল বলেন, বিদ্যালয়টি দীর্ঘদিন ধরে কটিয়াদীর শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ফলাফল, অবকাঠামো ও শিক্ষার পরিবেশ বিবেচনায় বিদ্যালয়টি সরকারিকরণের যোগ্যতা অর্জন করেছে। সরকারিকরণ হলে শিক্ষার্থীদের পরিবারের আর্থিক চাপ কমবে এবং মেয়েদের উচ্চশিক্ষায় আগ্রহ আরও বাড়বে।
তিনি বলেন, আমি মনে করি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মা বেগম খালেদা জিয়ার দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতি এবার ছেলের হাত ধরে বাস্তবায়িত হবে।
পার্শ্ববর্তী ১ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বলেন, কটিয়াদীর দুটি পাইলট বিদ্যালয়ের মধ্যে একটি ইতোমধ্যে সরকারিকরণ হয়েছে। তাই অপর বিদ্যালয়টিও সরকারিকরণ করা সময়ের দাবি।
বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা সুলতানা রাজিয়া বলেন, সরকারিকরণ হলে দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে। একই সঙ্গে নারী শিক্ষার প্রসার ও শিক্ষার গুণগত মান আরও বৃদ্ধি পাবে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছালাহ্ উদ্দিন ভূঞা বলেন, সরকারিকরণের ঘোষণা শুধু মৌখিক ছিল না, প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিবের স্বাক্ষরিত চিঠিও আমাদের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী, আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সরকারিকরণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব শর্তই রয়েছে। তাই দীর্ঘদিনের ঘোষণার বাস্তবায়নের মাধ্যমে দ্রুত বিদ্যালয়টি সরকারিকরণের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি আরিফুর রহমান কাঞ্চন বলেন, ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে নারী শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ১৯৯৩ সালে সরকারিকরণের ঘোষণা দেওয়া হলেও আজও তা বাস্তবায়ন হয়নি। কটিয়াদীবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা- দ্রুত বিদ্যালয়টি সরকারিকরণ করা হোক। একই সঙ্গে অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য বহুতল ভবন নির্মাণের আবেদনও করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কটিয়াদী সফরে বিষয়টি সংসদ সদস্যের মাধ্যমে তার কাছে তুলে ধরা হবে।
কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দিন বলেন, কটিয়াদী পাইলট উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়টি দীর্ঘদিন ধরে নারী শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ১৯৯৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার দেওয়া সরকারিকরণের ঘোষণা এত বছরেও বাস্তবায়ন না হওয়া দুঃখজনক। বিদ্যালয়টির শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি বিবেচনায় নিয়ে সরকারিকরণের বিষয়টি দ্রুত বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
৩৩ বছর ধরে ঝুলে থাকা এই দাবির সামনে এখন নতুন সম্ভাবনা দেখছেন কটিয়াদীবাসী। আগামী ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কটিয়াদী সফরকে ঘিরে তাদের প্রত্যাশা, মায়ের দেওয়া প্রতিশ্রুতির অসমাপ্ত কাজ এবার ছেলে তারেক রহমানের হাত ধরে বাস্তবায়িত হবে।
উল্লেখ্য, আগামী ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলায় জাতীয় মৎস্য পক্ষ ও মৎস্য সপ্তাহের উদ্বোধন করবেন।
আরএআর
