ইলিশের ভরা মৌসুমে সাগরে মাছ ধরতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েও ঘাট ছাড়তে পারছে না পটুয়াখালীর আলীপুর-মহিপুরের শত শত মাছ ধরার ট্রলার। দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের কারণে স্থানীয় বরফ কলগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে তীব্র বরফ সংকট। অতিরিক্ত দাম দিয়েও প্রয়োজন অনুযায়ী বরফ মিলছে না বলে জানিয়েছেন জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা।
সোমবার (১০ আগস্ট) পটুয়াখালীর আলীপুর ও মহিপুর মৎস্যবন্দর এলাকার বিভিন্ন বরফকল ঘুরে দেখা যায়, বেশির ভাগ কল বন্ধ। বরফের অপেক্ষায় ৪-৫ দিন ধরে ঘাটে নোঙর করে আছে অনেক মাছ ধরার ট্রলার। মাছ ধরার সরঞ্জাম ও বাজার নিয়ে প্রস্তুত থাকলেও বরফ না পাওয়ায় সাগরে যেতে পারছে না তারা।
আলীপুর-মহিপুর এলাকায় ছোট-বড় প্রায় ৩৬টি বরফকল রয়েছে। এসব কলের কোনোটি দিনে ২০-২৫ ক্যান, আবার কোনোটি সর্বোচ্চ ২০০ ক্যান পর্যন্ত বরফ উৎপাদন করে। তবে প্রায় ১০ দিন ধরে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমেছে। ফলে স্থানীয়ভাবে যে পরিমাণ বরফ তৈরি হচ্ছে, তা দিয়ে ট্রলারগুলোর চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
৪ দিন ধরে বরফের অপেক্ষায় থাকা এফবি নিশাত ট্রলারের জেলে শুক্কুর বলেন, একটি ট্রলারে সাগরে মাছ ধরতে গেলে ২০০-২২০ ক্যান বরফ প্রয়োজন হয়। কিন্তু ৪ দিন অপেক্ষা করেও ১ ক্যান বরফ পাওয়া যায়নি। বরফ ছাড়া মাছ সংরক্ষণ করে সাগরে মাছ ধরা সম্ভব নয়।

এছাড়াও ঘাটে নোঙর করা এফবি তামান্না, এফবি মা মনি ও এফবি কামালসহ শত শত ট্রলারেরও একই অবস্থা। বরফ না পাওয়ায় অনেক ট্রলার নির্ধারিত সময়ে সাগরে যেতে পারছে না।
বরফের সংকটের ঘাটতি মেটাতে ব্যবসায়ীরা খুলনা, বরিশাল ও পটুয়াখালীর বিভিন্ন এলাকা থেকে অতিরিক্ত ভাড়ায় ট্রাকে করে বরফ আনছেন। এতে পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে গেছে। এতে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মাছ সংরক্ষণ ও সরবরাহের খরচও বাড়ছে।
আড়তদার রহিম খান বলেন, ১৫০ টাকার বরফ এখন ৩০০ টাকা দিয়েও কিনতে হচ্ছে। তাও চাহিদামতো পাওয়া যাচ্ছে না। সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থেকে অল্প পরিমাণ বরফ পাওয়া যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্রাকে করে বরফ আনতে হচ্ছে।
আলীপুর-মহিপুর মৎস্য আড়তদার সমবায় সমিতির সাবেক সভাপতি মো. ফজলু গাজী বলেন, লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় বরফকলগুলো স্বাভাবিকভাবে উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে সরবরাহ কমে গিয়ে দাম বেড়েছে। এভাবে লোডশেডিং অব্যাহত থাকলে বরফকলগুলো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বরফকল মালিকরা জানান, বর্তমানে প্রতিদিন ১২-১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এর আগে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি তাদের। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় উৎপাদন কমেছে, বিপরীতে ইলিশের মৌসুমে বরফের চাহিদা বেড়েছে কয়েক গুণ। এতে সংকট আরও তীব্র হয়েছে।

মহিপুর মৎস্য সমিতির নেতা গাজী মো. মজনু বলেন, বরফ উৎপাদনে একটানা ১৫-১৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ প্রয়োজন। অথচ ১ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়ার পর ৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। এভাবে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় বরফ উৎপাদন করা সম্ভব নয়। মৎস্যবন্দর ও কুয়াকাটার জেলে-ব্যবসায়ীদের স্বার্থে আলাদাভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি জানান তিনি।
পটুয়াখালী পল্লি বিদ্যুৎ সমিতির জিএম আবুল কাশেমও লোডশেডিংয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে। পটুয়াখালী জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৩০ মেগাওয়াট, বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে পাওয়া যাচ্ছে ৮৫ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি রয়েছে ৪৫ মেগাওয়াট।
তিনি আরও জানান, মোট চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে প্রায় ৫২ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। বাকি ৪৮ শতাংশ ঘাটতির কারণে নিয়মিত লোডশেডিং করতে হচ্ছে। জ্বালানি সংকট কেটে যাওয়ার পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণের কারণে বন্ধ থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু হলে লোডশেডিং পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে জানান তিনি।
এসএম আলমাস /এমএমবি
