সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন নাটোরের নলডাঙ্গার শামীম হোসেন, সাব্বির হোসেন শুভ ও রবিউল আউয়াল হৃদয়। রিয়াদের মানফুয়া এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় কাজ করতেন তারা। গতকাল রোববার (৯ আগস্ট) ওই কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন নলডাঙ্গা উপজেলার খাজুরা ইউনিয়নের এই তিন যুবক।
নিহত শামীম হোসেন উপজেলার দিঘীরপাড় গ্রামের জাকির হোসেনের ছেলে। সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতে আট মাস আগে সৌদি আরবে যান তিনি। বিদেশ যাওয়ার খরচ জোগাতে জমি বন্ধক রেখেছিল তার পরিবার। গর্ভবতী স্ত্রীকে দেশে রেখে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন শামীম।
এরপর দেশে জন্ম নেয় তাদের কন্যাসন্তান। এক মাস বয়সী সেই মেয়েকে সৌদি আরব থেকে ভিডিও কলে দেখতেন শামীম। প্রবাসের ব্যস্ততার মাঝেও অপেক্ষা করতেন দেশে ফিরে মেয়েকে কোলে নেওয়ার। কিন্তু সেই আশা পূরণ হলো না। মেয়ের মুখ দেখার আগেই আগুনে পুড়ে প্রাণ গেল তার।
শামীমের মা শাহীনুর বেগম বলেন, অনেক আশা নিয়ে আমার সন্তান বিদেশে গিয়েছিল। দেশে ফিরে মেয়ের মুখ দেখবে, তাকে কোলে নিয়ে আদর করবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হলো না। আমার নাতনি তার বাবাকে জীবিত অবস্থায় দেখতেই পারল না। সরকারের কাছে আমার একটাই দাবি, আমার সন্তানের লাশ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে দিন। পাশাপাশি আমার নাতনির ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সরকার যেন আর্থিক সহায়তা করে।
নিহত সাব্বির হোসেন শুভ উপজেলার খাজুরাশ্রীপুর পাড়া গ্রামের গোলাম রাব্বানীর ছেলে। প্রায় চার বছর আগে ছয় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে সৌদি আরবে যান তিনি। পরিবারে বাবা-মা, স্ত্রী ও ছোট বোন রয়েছে। প্রবাসে থেকে ঋণের কিছু টাকা পরিশোধও করেছিলেন। দুই বছর আগে মোবাইলে ভিডিও কলের মাধ্যমে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার এক তরুণীকে বিয়ে করেন সাব্বির। স্বপ্ন ছিল দেশে ফিরে সুখের সংসার গড়বেন। তবে আগুনে পুড়ে শুরুর আগেই শেষ সাব্বিরের সংসার।
সাব্বিরের বাবা গোলাম রাব্বানী বলেন, ঋণ করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম। সে কিছু টাকা পরিশোধও করেছে। এখনো কয়েক লাখ টাকা ঋণ রয়েছে। ঋণ পরিশোধ করে ঘরের কাজ শেষ করার কথা ছিল। ঘর ঠিক না করে ছেলে বাড়িতে আসতে চাইতো না। সরকারের কাছে দাবি, দ্রুত আমার সন্তানের লাশ আমাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হোক।

অন্যদিকে নিহত রবিউল আউয়াল হৃদয় উপজেলার মহিষডাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা। প্রায় তিন বছর আগে প্রবাসী বড় ভাইয়ের মাধ্যমে সৌদি আরবে যান তিনি। তার ভিসা ও পাসপোর্ট থাকলেও ছিল না সৌদি আরবে কাজের অনুমতিপত্র ‘আকামা’। ফলে বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই সেখানে কাজ করছিলেন রবিউল। কিছুদিন পর দেশে ফেরার কথা ছিল তার। সেই ফেরাও আর হলো না।
একসঙ্গে তিন স্বজনকে হারিয়ে নলডাঙ্গার তিন পরিবারে এখন চলছে শোকের মাতম। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে এলাকার পরিবেশ। পরিবারের সদস্যরা দ্রুত মরদেহ দেশে ফিরিয়ে এনে শেষবারের মতো প্রিয়জনকে দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন।
নলডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল ইমরান খান বলেন, ঘটনাটি জানার পরই জেলা প্রশাসনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানানো হয়েছে। নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করে সমবেদনা জানানো হয়েছে। পরিবারের কোনো সহযোগিতার প্রয়োজন হলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তা করা হবে। মরদেহগুলো পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতে সরকারিভাবে কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
আশিকুর রহমান/আরএআর
