পদ্মায় কমেছে পানির প্রবাহ। কমেছে গভীরতা, বেড়েছে চর ও বালুর আধিক্য। এমন পরিস্থিতিতে নদীতে মাছ কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। ইলিশের পাশাপাশি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে দেশি মাছের বহু প্রজাতি। এর প্রভাব পড়েছে নদীনির্ভর জেলেদের জীবন-জীবিকাতে। ফলে রাজশাহী অঞ্চলে পদ্মা নদীতে বিলুপ্তির পথে ইলিশ মাছ।
রাজশাহী জেলা মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় গত বছরের (২০২৫) জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে গোদাগাড়ী, পবা, চারঘাট ও বাঘার চারটি উপজেলায় ৫ দশমিক ৩৭ টন ইলিশ ধরা পড়েছিল। আর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২৮ দশমিক ৫৫ টন ইলিশ ধরা পড়লেও পরের বছর থেকেই ইলিশ আহরণ কমতে শুরু করে। মাত্র আট বছরের ব্যবধানে রাজশাহীতে ইলিশের আহরণ আশঙ্কাজনক হারে কমেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পদ্মায় শুধু জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব পড়েনি। পড়েছে ফারাক্কা বাঁধের প্রভাব। এতে করে নদীতে পানির প্রবাহ ও গভীরতা কমে প্রজননক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে। এছাড়া কৃষিতে অপরিকল্পিত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহারসহ নানা কারণে পদ্মার মাছের স্বাভাবিক পরিবেশ বদলে গেছে। পদ্মার উজানে ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে পানির প্রবাহ কমার পাশাপাশি নদীর স্বাভাবিক পরিবেশেও পরিবর্তন এসেছে। নদীর স্বাভাবিক ধারার পরিবর্তন হয়ে অনেক অংশে জেগে উঠেছে চর। কোথাও কোথাও পানির বদলে বছরের পর বছর বিস্তীর্ণ বালুর চর থাকছে।
পদ্মায় পানি কমে যাওয়ায় কমেছে স্রোতও। ফলে ইলিশ সেভাবে নিচু এলাকা থেকে উজানে আসে না। অপরিকল্পিত ড্রেজিংয়ের কারণে পানিতে বালুর পরিমাণ বেড়ে ঘোলা হয়ে যাওয়ার-কারণে ইলিশের আগমন কমে গেছে। পানির গভীরতা ২০-২৫ ফুট না হলে ইলিশ নদীতে আসতে চায় না। পদ্মায় পানির গভীরতা ও স্বাভাবিক স্রোত কমে যাওয়ায় ইলিশের উজানে আসার পথও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ইলিশ প্রসঙ্গে চারঘাট উপজেলার জেলে শ্রী রাম জানান, ইলিশ এখনও সেইভাবে ধরা পড়ে না জালে। অল্প পেলেও তা আকারে ছোট। যেই সময় দেশে মাছ শিকারের নিষেধাজ্ঞা থাকে তার কিছুদিন পরে অল্প মাছে পাওয়া যায়। সেই সময়গুলো আরও নজরদারি বাড়াতে হবে প্রশাসনকে।
পদ্মা নদীর আয়তন কমে যাওয়া নিয়ে গবেষণা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শামস মুহা. গালিব। তিনি বলেন, ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে পদ্মা নদীর আয়তন অর্ধেক কমেছে। গভীরতার পাশাপাশি পানির প্রবাহ কমায় আবাসস্থল হারিয়ে এখন বিলুপ্তির আশঙ্কায় বিভিন্ন দেশি প্রজাতির মাছ। আছে খাদ্যসংকটও।
তিনি বলেন, রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী-চারঘাটের সারদা পর্যন্ত পদ্মা নদীর ৭০ কিলোমিটার অংশ নিয়ে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়। ওই এলাকার ৯টি পয়েন্টে মৎস্য প্রজাতির নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পদ্মাপাড়ের ২৭টি জেলেপল্লি থেকে নেওয়া হয় তথ্য। স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবি বিশ্লেষণের মাধ্যমে পদ্মার বর্তমান চিত্র তুলে আনার চেষ্টা করেছেন গবেষক দলের সদস্যরা। গবেষণায় উঠে এসেছে, পদ্মার মাছের প্রজাতিগুলোর বড় একটি অংশ এখন সংকটের মুখে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ইয়ামিন হোসাইন ইলিশের প্রজনন মৌসুম নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি বলেন, ইলিশ দ্রুত বেগে ছোটে এবং উজানের দিকে যেতে পছন্দ করে। এ মাছ ঝাঁকে ঝাঁকে চলাচল করে। পাকিস্তান আমলেও বঙ্গোপসাগর থেকে উজানে রাজশাহী হয়ে ভারতের ভাগলপুর পর্যন্ত ইলিশ যেত এবং ডিম ছাড়ত। ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর রাজশাহীতে ইলিশ কমতে থাকে।
এ বিষয়ে রাজশাহী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, পদ্মায় ছোট ইলিশ অল্প পাওয়া যায়। এছাড়া অন্য প্রজাতির ছোট মাছ যেমন ট্যাংড়া, পুঁটি পাওয়া যায়। পদ্মায় অবৈধ জালে মাছ শিকার রোধে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করি। আমাদের সীমিত জনবল। তারপরেও চায়না দুয়ারি জাল বন্ধে জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
শাহিনুল আশিক/এসএইচএ
