নরসিংদীর বেলাবো উপজেলার পাটুলী ইউনিয়নের সুটুরিয়া ফজলুল হক খান দাখিল মাদরাসায় ১৮ জন শিক্ষক থাকলেও ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১৬ জন শিক্ষার্থীর কেউই পাস করতে পারেনি। এ ঘটনায় অভিভাবক ও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তারা শিক্ষকদের গাফিলতি ও প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
জানা যায় , ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত সুটুরিয়া ফজলুল হক খান দাখিল মাদরাসাটি পরবর্তীতে এমপিওভুক্ত হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষক রয়েছেন ১৮ জন। অথচ ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১৬ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৭ জন মেয়ে ও ৯ জন ছেলে, কেউই পাস করতে পারেনি। আগামী ২০২৭ সালের পরীক্ষায় এ প্রতিষ্ঠান থেকে ২০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে বলে জানিয়েছে শিক্ষকরা।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সরেজমিনে মাদরাসাটিতে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটিতে মোট শিক্ষার্থী রয়েছে প্রায় ২০০ জন। তবে ৯ম, ১০ম শ্রেণি ও প্রাথমিক শাখা মিলিয়ে উপস্থিত রয়েছে মাত্র ২০ জনের মতো শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থী সংকটের কারণে একটি কক্ষেই দুই শ্রেণির পাঠদান করতে দেখা যায়। প্রতিষ্ঠানটিতে মোট ১০টি শ্রেণিকক্ষ থাকলেও বেশ কয়েকটি কক্ষ জরাজীর্ণ। কোনো কোনো কক্ষে ভাঙাচোরা টিনের স্তূপ পড়ে থাকতে দেখা যায়।
অভিভাবকদের অভিযোগ, মাদরাসার শিক্ষকরা নিয়মিত পাঠদান না করায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটির এমন অবস্থা চললেও কর্তৃপক্ষকে বারবার জানিয়ে কোনো কার্যকর পরিবর্তন হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।
দাখিল পরীক্ষায় ফেল করা শিক্ষার্থী সিয়ামের বাবা বাচ্চু মিয়া বলেন, এই মাদরাসায় কোনো শিক্ষক পড়ালেখা করায় না। শিক্ষকরা গল্প করে, যার যার মতো চলে যায়। আমার এমনিতেই অর্থ সংকট। গত বছর আমার ছেলেকে পরীক্ষা দেওয়াইছি, আমার ছেলে দুই বিষয়ে ফেল করছে। এ বছর আবার পরীক্ষা দিছে, এবারও ফেল। আমরা বারবার অভিযোগ করেছি, তারা আমাদের কথা গুরুত্ব দেন না। আমরা এটার একটা পরিবর্তন চাই। প্রায় ২০ বছর ধরে মাদরাসার এই অবস্থা।
মাদরাসার সাবেক শিক্ষার্থী তৌহিদ বলেন, ‘আমি ২০০৭ সালে এই মাদরাসা থেকে পড়ে গেছি। তখন খুব জমজমাট ছিল। কিন্তু বর্তমানে দেখা যায় রেজাল্টের দিক দিয়েও খারাপ, ছাত্রছাত্রী নাই। প্রতি ক্লাসে একজন-দুজন পাওয়া যায়। স্যাররা বসে থাকে, আড্ডা মারে এই হচ্ছে মাদরাসার অবস্থা। পরিচালনাও ঠিক নাই এখানকার। সবাই ফেল করছে, মাদরাসার কমিটির গাফিলতি আছে, শিক্ষকদেরও গাফিলতি আছে। ১৬ জন পরীক্ষা দিছে, একজনও নাই, শিক্ষকই তো আছে ১৮ জন।’
স্থানীয় বাসিন্দা তৌফাজ্জল হোসেন বলেন, একটা মাদরাসায় যদি ১৬ জনের মধ্যে ১৬ জনই ফেল করে, তাহলে এটা লজ্জার বিষয়। শিক্ষক ১৮ জন থাকতে ১৬ জন শিক্ষার্থী কীভাবে ফেল করে? পড়াশোনার ব্যবস্থা ভালো না। তাদের এবার শিক্ষা হওয়া উচিত। আমরা আশা করব, এখন থেকে ভালোভাবে পড়াশোনা করে পরের বছর যাতে ভালো ফলাফল পেতে পারে।
তবে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ বলছে, পড়ালেখার অব্যবস্থাপনা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে শিক্ষকরা পাঠদান করতে অসুবিধায় পড়েন। জরাজীর্ণ ভবন থেকে তারা মুক্তি চান।
মাদরাসার প্রধান শিক্ষক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘আমি এই ফলাফলে নিজেই হতভম্ব। আমার বলার মতো ভাষা নাই। আসন্ন যে পরীক্ষা ২০২৭ সালে, আমি একটা চমক সৃষ্টি করব চেষ্টা করছি। আর যারা ফেল করেছে, কী কারণে ফেল করেছে, তাদের খাতা মূল্যায়নের জন্য আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। ভিতরে কী সমস্যা, আমি দেখব। আর সকল শিক্ষার্থীর একসঙ্গে ধস নামার কথা না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি ক্লাস কীভাবে নেব, আমার তো শ্রেণিকক্ষই ঠিক না। ৪০ বছরের প্রতিষ্ঠানে সরকারের কোনো ছোঁয়া আমার নাই। আমার ছাত্র রিকশা চালিয়ে লেখাপড়া করে। আমার মাদরাসা আধুনিকায়ন নাই। ক্লাস করানোর পরিবেশ নাই। দুইটা রুম দিয়ে ৯টা ক্লাস চলে আমার। সামনে বছর আমি ১০০ শতাংশ পাস করব, কথা দিলাম। পাশাপাশি তার জন্য সব চেষ্টা আমি করছি।’
বেলাবো উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা গোলাম ফারুক বলেন, আমরা মাদরাসায় চিঠি পাঠাব, এই অবস্থা কেন হলো। প্রতিষ্ঠান প্রধানকে এই বিপর্যয়ের কারণ ব্যাখ্যাসহ কীভাবে উত্তরণ করবে, আমরা ডাকব। তারা কী বলে আমরা শুনব, তারপর পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
শিক্ষকদের অভিযোগ, পড়ালেখার পরিবেশ ভালো না থাকায় ফলাফল খারাপ হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা কর্মকর্তা গোলাম ফারুক বলেন, গাছতলায় লেখাপড়া করলেও ৫/৭ জন পাস করবে। ভবন সংস্কারের জন্য আমি কথা বলব। কিন্তু শতভাগ ফেল করবে, তা মানা যায় না। তারা বেশির ভাগ বাংলা আর ইতিহাসে ফেল করেছে।
১৬ জন পরীক্ষার্থীর সবাই ফেল করায় প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম, পাঠদানের পরিবেশ এবং শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে এবং আগামী বছর প্রতিষ্ঠানটির ফলাফলে ভালো পরিবর্তন আসবে।
আমিনুর রহমান সাদী/এসএইচএ
