নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের জালকুড়ি এলাকায় গৃহবধূ তানিয়া আক্তারকে (২৪) শ্বাসরোধে হত্যার ঘটনায় তার স্বামী সোহাগ মিয়া জুলহাসকে (৩৩) গ্রেপ্তার করেছে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ঘটনার প্রায় ১৫ দিনের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের সহায়তায় হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বিকালে পিবিআই নারায়ণগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার মো. মোস্তফা কামাল রাশেদ স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে পুলিশ সুপার মো. মোস্তফা কামাল রাশেদ উল্লেখ করেন, স্ত্রীকে হত্যার পর সোহাগ মিয়া জুলহাস তার ব্যবহৃত মুঠোফোন বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যান। পরে তার অবস্থান শনাক্ত করে মঙ্গলবার ভোরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার সাইনবোর্ড এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্ত্রীকে শ্বাসরোধে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন তিনি। পরে তাকে আদালতে পাঠানো হলে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
গ্রেপ্তার সোহাগ মিয়া জুলহাস গাইবান্ধা সদর উপজেলার পূর্ব কোমরজানি (ডাক্তার বাড়ি) এলাকার সেকান্দার আলীর ছেলে। তিনি সিদ্ধিরগঞ্জের জালকুড়ি পশ্চিমপাড়া এলাকার মাতবর বাড়িতে ভাড়া থাকতেন।
পিবিআই জানায়, গত ২৬ জুলাই সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সোহাগ তার স্ত্রী তানিয়ার খালা নাছিমা আক্তারের বাসায় গিয়ে তাদের বাসার চাবি দিয়ে বলেন, তানিয়া গার্মেন্টসে গেছেন। গার্মেন্টসের পিএমের সঙ্গে কথা হয়েছে, তানিয়াকে ছুটি দিয়ে দেওয়া হবে। চাবিটি রেখে দুপুরে তাদের বাসায় যেতে বলেন তিনি।
এরপর নাছিমা আক্তার বেলা ১১টার দিকে তানিয়ার কর্মস্থলে গিয়ে জানতে পারেন, সেদিন তানিয়া গার্মেন্টসে যাননি। পরে তিনি বাড়ির মালিকের পরিবারের একজনকে সঙ্গে নিয়ে তানিয়ার বাসায় যান। বাইরে থেকে দরজায় তালা লাগানো দেখতে পান তারা। চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে তানিয়াকে মশারির মধ্যে পড়ে থাকতে দেখেন।
তানিয়াকে ডাকাডাকি করে কোনো সাড়া না পেয়ে মশারি সরিয়ে নাছিমা আক্তার তার নাক-মুখে রক্ত দেখতে পান। শরীরে হাত দিয়ে শক্ত হয়ে যাওয়ায় তিনি চিৎকার করে আশপাশের লোকজনকে ডাকেন। পরে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন।
পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তানিয়ার মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। এ ঘটনায় তানিয়ার খালা নাছিমা আক্তার বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা করেন। ১০ আগস্ট মামলাটি করা হয়।
পিবিআই জানায়, ঘটনার পর থেকেই ছায়া তদন্ত শুরু করে সংস্থাটি। তদন্তে পিবিআই জানতে পারে তানিয়ার স্বামী সোহাগের সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয়ের পর তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে পরিবারের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে তারা বিয়ে করেন। বিয়ের পর থেকে তাদের মধ্যে প্রায়ই পারিবারিক কলহ হতো। সোহাগের স্থায়ী কোনো কর্মসংস্থান ছিল না। সংসারের অভাব-অনটন নিয়ে তানিয়ার সঙ্গে তার প্রায়ই ঝগড়া হতো। একপর্যায়ে সোহাগ তাকে মারধরও করতেন বলে স্বজন ও স্থানীয়দের কাছ থেকে তথ্য পায় পিবিআই। হত্যাকাণ্ডের পর সোহাগ মুঠোফোন বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যান। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তার অবস্থান প্রথমে ঢাকার খিলগাঁও, পরে মেরাদিয়া ও সবুজবাগ এলাকার আশপাশে শনাক্ত করা হয়। এসব এলাকায় একাধিকবার অভিযান চালিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।
পরে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) ভোর ৪টা ৫০ মিনিটের দিকে গাইবান্ধা থেকে নারায়ণগঞ্জগামী একটি দূরপাল্লার বাসে তল্লাশি চালানো হয়। ফতুল্লা থানার সাইনবোর্ড এলাকার চৌরঙ্গী ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে সোহাগকে গ্রেপ্তার করে পিবিআইয়ের একটি দল।
পিবিআইয়ের ভাষ্য, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সোহাগ জানান, ২৫ জুলাই দিবাগত রাত সাড়ে ১২টা থেকে রাত ১টার মধ্যে সংসারের অভাব-অনটন নিয়ে তানিয়ার সঙ্গে তার কথা-কাটাকাটি ও ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে তিনি তানিয়ার গলা চেপে ধরে শ্বাসরোধে হত্যা করেন।
পিবিআই আরও জানায়, পরদিন সকালে তানিয়ার মরদেহ ঘরের ভেতর রেখেই তার নাকে থাকা স্বর্ণের নাকফুল খুলে নেন সোহাগ। এরপর ঘরে তালা লাগিয়ে চাবি তানিয়ার খালা নাছিমার কাছে দিয়ে মোবাইল ফোন বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যান।
গ্রেপ্তারের পর মঙ্গলবার সোহাগকে আদালতে হাজির করা হয়। সেখানে তিনি তানিয়া হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
পিবিআই জানিয়েছে, এ হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
মেহেদী হাসান সৈকত/এসএইচএ
