যৌতুকের দাবিতে এক নারীকে মারধর করে গুরুতর আহত করার ঘটনায় মামলা নিতে অস্বীকৃতির অভিযোগে ফেনীর দাগনভূঞা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে ওই অভিযোগসহ পৃথক ঘটনায় আরও একটি মামলা নিতে এবং আগে মামলা না নেওয়ার বিষয়টি তদন্ত করে ওসির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে ফেনীর পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) ঘটনাটি জানাজানি হলে জেলাজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি হয়। ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালের একটি সূত্র ঢাকা পোস্টকে আদেশের তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন। এর আগে রোববার (৯ আগস্ট) ওই ট্রাইব্যুনালের বিচারক এ এন এম মোরশেদ খান এ আদেশ দেন।
আদালত আদেশে উল্লেখ করেন, দাগনভূঞার মমারিজপুর এলাকার বিবি মারজাহান (২৪) তার স্বামী রাকিব হাসান হৃদয়সহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে যৌতুকের দাবিতে মারধর ও গুরুতর আঘাতের অভিযোগ করেন। আসামিরা হলেন, রাকিব হাসান হৃদয়, লোকমান হোসেন রিফাত, ইউসুফ আলী, রোহানা আক্তার রিছি ও বিবি আমেনা। এ নিয়ে থানায় মামলা করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে তিনি আদালতে অভিযোগ করেন।
সেই অভিযোগকারীকে পরীক্ষা, তার জবানবন্দি এবং উপস্থাপন করা কাগজপত্র পর্যালোচনা করে আদালত অভিযোগটি এজাহার হিসেবে গ্রহণ করে তদন্তের প্রয়োজনীয়তা দেখতে পান। পরে অভিযোগটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করে তদন্তের জন্য পিবিআইকে দায়িত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা করতে দাগনভূঞা থানার ওসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়। সাত কার্যদিবসের মধ্যে এ বিষয়ে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতেও বলা হয়।
আদেশে আরও বলা হয়, গৃহবধূ মারজাহানকে আসামিদের হাত থেকে উদ্ধারের জন্য তার স্বজনরা জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করেন। পরে দাগনভূঞা থানার পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তার চিকিৎসার কাগজপত্রে মাথায় আঘাতসহ শারীরিক আঘাতের কথা উল্লেখ রয়েছে। গুরুতর আহত একজন নারীকে পুলিশ উদ্ধারের পরও তার অভিযোগ কেন মামলা হিসেবে নেওয়া হয়নি, তা বোধগম্য নয় বলে আদালত উল্লেখ করেন।
এদিন শুনানির সময় আইনজীবীরা একই থানায় আরেক গৃহবধূ তানিয়া আক্তারকে (২২) যৌতুকের দাবিতে হত্যার অভিযোগে করা একটি মামলাও গ্রহণ না করার বিষয় আদালতের নজরে আনেন। ওই মামলায় এক গৃহবধূকে হত্যা করে ঝুলিয়ে রাখার অভিযোগ করা হলেও থানায় মামলা নেওয়া হয়নি বলে তারা অভিযোগ করেন। এ সময় নিহত গৃহবধূর ঝুলন্ত অবস্থার একটি ছবিও আদালত পর্যবেক্ষণ করেন।
আইনজীবীদের অভিযোগ, ওই ঘটনায় বাদী দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারায় মামলা করতে চাইলে ওসি তাকে মামলা নিতে পারবেন কি না, সেই বিষয়ে অনিশ্চয়তার কথা জানান।
আদালত আদেশে আরও উল্লেখ করেন, পৃথক দুটি ঘটনার অভিযোগ মামলা হিসেবে গ্রহণে অস্বীকৃতির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট অভিযোগ, আইনজীবীদের বক্তব্য ও সংযুক্ত কাগজপত্র পর্যালোচনায় গুরুতর বলে প্রতীয়মান হয়েছে। এতে ওই কর্মকর্তার থানায় দায়িত্ব পালনের অযোগ্যতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এ অবস্থায় দাগনভূঞা থানার ওসিকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে পৃথক দুটি ঘটনায় মামলা নিতে অস্বীকৃতির বিষয়টি তদন্ত এবং তার বিরুদ্ধে যথাযথ বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের স্টেনোগ্রাফার মো. শামছুদ্দীন ঢাকা পোস্টকে বলেন, এই আদেশের পত্র ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) সাহাব উদ্দিন আহমেদ বলেন, ওসিকে প্রত্যাহারের আদেশের বিষয়টি শুনেছি। আমি আরও বিস্তারিত খোঁজ নেব।
এ ব্যাপারে জানতে দাগনভূঞা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ ফয়জুল আজীম নোমানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও সাড়া মেলেনি।
ফেনীর সহকারী পুলিশ সুপার (সোনাগাজী ও দাগনভূঞা সার্কেল) সৈয়দ মুমিদ রায়হান ঢাকা পোস্টকে বলেন, এ ধরনের আদেশের বিষয় সাধারণত পুলিশ সুপার দেখেন। সেজন্য বিষয়টি আমি অবগত নই। তবে উল্লেখিত ঘটনার মধ্যে গৃহবধূর মৃত্যুর পর ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে আত্মহত্যার কথা উঠে এসেছিল। সেই হিসেবে পুলিশ অপমৃত্যু মামলা নিয়েছিল। কিন্তু নিহতের পরিবার পরবর্তীতে প্রতিকার চেয়ে আদালতে যান।
এ ব্যাপারে ফেনীর পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার বলেন, এ ধরনের আদেশের কোনো পত্র এখনো হাতে পাইনি। বিষয়টি এখনো অবগত না।
তারেক চৌধুরী/এনটি
