বরগুনায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্মিত প্রায় ৪৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ উঁচু করায় বর্তমানে বাঁধের উপরে থাকা পাকা সড়কগুলো আবারও কাঁচায় পরিণত হয়েছে। এতে সামন্য বৃষ্টি হলেই সড়কগুলো কর্দমাক্ত হয়ে ছোট-বড় গর্তে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। ফলে বন্ধ হয়ে গেছে এসব বাঁধের উপরের সড়কে চলাচল করা যানবাহন।
এ ছাড়া দীর্ঘবছর ধরে সড়কগুলো কাঁচা অবস্থায় থাকায় এবং বিকল্প সড়ক না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন ওই এলাকার বাসিন্দারা। তবে মানুষের ভোগান্তি কমাতে সড়কগুলো আবারও পাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বরগুনা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান খান।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থকে রক্ষা পেতে বরগুনার বিভিন্ন এলাকায় মোট ৮০৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এসব এলাকার বাসিন্দাদের যোগোযোগের জন্য বিকল্প সড়ক না থাকায় অধিকাংশ বেড়িবাঁধই যোগাযোগের মাধ্যম সড়ক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমোঝোতার মাধ্যমে জনগণের চাহিদা অনুযায়ী অনেক বাঁধই কার্পেটিং করছে এলজিইডি। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পূনরায় অনেক বাঁধ উঁচু করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বরগুনা সদর উপজেলায় ২০ কিলোমিটার, তালতলী উপজেলায় ৩ কিলোমিটার এবং পাথরঘাটা উপজেলায় ২২ কিলোমিটার পাকা সড়ক বেড়িবাঁধ উঁচু করায় বর্তমানে তা কাঁচায় পরিণত হয়েছে। এতে ওই বাঁধগুলো যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সরেজমিনে সদর উপজেলার বরগুনা থেকে গুলবুনিয়া ও পুরাকাটা এলকার একটি বেড়িবাঁধ ঘুরে দেখা যায়, বাঁধটি উঁচু করায় বর্তমানে বাঁধের উপরের সড়কটি কাঁচা অবস্থায় রয়েছে। প্রায় ৮ বছর আগে এ বেড়িবাঁধের প্রায় ১৫ কিলোমিটার সড়ক পাকা করে এলজিইডি। কিন্তু গত ২ বছর আগে বেড়িবাঁধ উঁচু করায় এ সড়ক এখন কাঁচায় পরিণত হয়েছে। ফলে বৃষ্টি হলেই সড়কটি কর্দমাক্ত হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ছোট-বড় বিভিন্ন গর্তে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে যানবাহন চলাচল। এতে চলাচলে ভোগান্তির সৃষ্টি হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। শুধু ওই বেড়িবাঁধের সড়কটিই নয়, জেলার বিভিন্ন এলাকার ৪৫ কিলোমিটার সড়কের এখন একই অবস্থা। এতে সব থেকে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীরা। এ ছাড়া ওইসব এলাকায় উৎপাদিত ফসল পরিবহনেও ভোগান্তিতে পড়ছেন কৃষকরা। ফলে দ্রুত বাঁধের সড়কগুলো পাকা করার দাবি স্থানীয় ভুক্তভোগী বাসিন্দাদের।
গুলবুনিয়া এলাকার বাসিন্দা নূর ইসলাম মুসল্লী ঢাকা পোস্টকে বলেন, একই সড়ক পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং এলজিইডির আওতায় থাকায় কোনো কাজই হচ্ছে না। দুই বছর ধরে রাস্তাটি কাঁচা হয়ে পরে আছে। আমরা গ্রামের কেউ ঠিকভাবে যাতায়াত করতে পারছি না। বিশেষ করে গাড়ি চলাচলে সমস্যা হওয়ায় বর্ষার মৈসুমে মাঠের ফসল নিয়ে আমাদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
একই এলাকার মো. আরিফ নামে আরেক বাসিন্দা ঢাকা পোস্টকে বলেন, রাস্তাটি একসময় পাকা ছিল। কিন্তু এখন দীর্ঘদিন ধরে কাঁচা অবস্থায় আছে। আমরা যারা কম বয়সী তারা কষ্ট করে হলেও চলাচল করছি। কিন্তু এলাকার শিশু এবং বয়স্কদের বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। আমরা চাই আগের মতো আবারও সড়কটি পাকা করা হোক।
আলম শিকদার নামে আরেক বাসিন্দা ঢাকা পোস্টকে বলেন, সড়কটি যখন নিচু ছিল তখন পাকা ছিল। এরপর উঁচু করার পরে এখন কাঁচা অবস্থায় আছে। বৃষ্টিতে এখন খুবই খারাপ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কোনো গাড়ি চলাচল করতে না পাড়ায় অন্তত চার কিলোমিটার পথ হেঁটে বাড়িতে যেতে হয় আমাদের।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জোয়ারের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বেড়িবাঁধ উঁচু করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এতে পাকা সড়ক কাঁচা হয়ে যাওয়ায় রাষ্ট্রের অর্থ সাশ্রয়ের জন্য ভবিষ্যতে বেড়িবাঁধ পাকা না করে বিকল্প সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে জানিয়ে বরগুনার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল হান্নান প্রধান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসের ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে বরগুনায় ৮০৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এ বেড়িবাঁধগুলো মানুষের যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কালের বিবর্তনে বিভিন্ন সময়ে এলজিইডির সঙ্গে সমোঝোতায় অনেক বাঁধ কার্পেটিং করা হয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাঁধগুলো উঁচু করার প্রয়োজন হয়। আর এ কারণেই প্রয়োজনীয় বাঁধ উঁচু করতে কার্পেটিং খুলে উঁচু করা হয়েছে। তবে যদি বাঁধের বাইরে যোগাযোগের জন্য আলাদা সড়ক নির্মাণ করা যায়, তাহলে আর এ সমস্যার সৃষ্টি হবে না। তবে পানির উচ্চতার লেভেল বিবেচনায় এবং জনগণের চাহিদা অনুযায়ী কোথাও যাদি বাঁধ কার্পেটিং করার প্রয়োজন হয় তা পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে অনুমোদন দেওয়া হয়।
অপরদিকে নথিপত্রে কাঁচা সড়কগুলো এখন পর্যন্ত পাকা সড়কের তালিকায় রয়েছে জানিয়ে বরগুনা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান খান ঢাকা পোস্টকে বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধের ওপরে আমাদের কয়েকটি সড়ক আছে। বেড়িবাঁধ উঁচু করার কারণে বর্তমানে পাকা সেই সড়কগুলো কাঁচা হয়েছে। আমাদের একটি রোড ডাটাবেইজ আছে। সেখানে ওই সড়কগুলো এখন পর্যন্ত পাকা দেখানো রয়েছে। ডাটাবেইজে ওই সড়কগুলোকে কাঁচা দেখানোর জন্য কাজ চলছে। পাশাপাশি সদর দপ্তরে ছবিসহ তথ্য পাঠানো হয়েছে। এ কাজ সম্পন্ন হলেই সড়কগুলো পুনরায় পাকা করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
মো. আব্দুল আলীম/এএমকে
