বিজ্ঞাপন

ছয় বছরে ময়মনসিংহের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কমেছে ২ লাখ ৬৬ হাজার শিক্ষার্থী

ছয় বছরে ময়মনসিংহের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কমেছে ২ লাখ ৬৬ হাজার শিক্ষার্থী

একসময় যে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষগুলো শিক্ষার্থীদের কোলাহলে মুখর থাকত, কয়েক বছরের ব্যবধানে সেসব বিদ্যালয়ের অনেকগুলোতেই এখন উপস্থিতি কম। কোথাও শিক্ষার্থী সংখ্যা অর্ধেকের কাছাকাছি নেমে এসেছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির সংখ্যা কমার পাশাপাশি ঝরে পড়ার হারও ভাবিয়ে তুলছে শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের।

ময়মনসিংহে ছয় বছরের ব্যবধানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কমেছে ২ লাখ ৬৬ হাজার ২০২ জন। ২০২০ সালে জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী ছিল ৬ লাখ ৯২ হাজার ২৪ জন। ২০২৬ সালে এসে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ২৫ হাজার ৮২২ জনে।
অর্থাৎ ছয় বছরে শিক্ষার্থী কমেছে প্রায় ৩৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ। জেলার ১৩টি উপজেলার ২ হাজার ১৪০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই চিত্র পাওয়া গেছে। এক বছরেই কমেছে ১ লাখ ১২ হাজার শিক্ষার্থী।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৪৮ হাজার। ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৪ লাখ ২৭ হাজারে।

২০২৩ সালে কিছুটা বেড়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৪ লাখ ৬৯ হাজারে। ২০২৪ সালে ছিল ৪ লাখ ৬৬ হাজার। ২০২৫ সালে আবার বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৩৮ হাজারে।

কিন্তু চলতি বছর আবার বড় ধরনের পতন হয়েছে। ২০২৫ সালের তুলনায় এক বছরের ব্যবধানে ২০২৬ সালে শিক্ষার্থী কমেছে ১ লাখ ১২ হাজার ১৭৮ জন। শিক্ষার্থী কমার পাশাপাশি চলতি বছরের জরিপে জেলায় ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে গফরগাঁওয়ে

জেলার উপজেলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার গফরগাঁওয়ে। সেখানে ঝরে পড়ার হার প্রায় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২০ সালে গফরগাঁওয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল ৬০ হাজার ৮১৫ জন। চলতি বছর ভর্তি হয়েছে ৩৫ হাজার ২৭ জন।

অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে উপজেলাটিতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

কেন গফরগাঁওয়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার বেশি, জানতে চাইলে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ আবু সাঈদ বলেন, অভিভাবকদের অসচেতনতা, শিক্ষক সংকট ও প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো সমস্যা এর অন্যতম কারণ।

শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হারে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে তারাকান্দা উপজেলা। সেখানে ঝরে পড়ার হার ৪ শতাংশ। ২০২০ সালে তারাকান্দায় শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল ৬০ হাজার ৮২০ জন। চলতি বছর ভর্তি হয়েছে ২৯ হাজার ৭২৩ জন।

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জীবন আরা বেগম বলেন, অভিভাবকদের বুঝিয়ে শিক্ষার্থী বাড়ানোর চেষ্টা করছেন তারা। তবে তারাকান্দার বাস্তবতায় আরও কিছু কারণ রয়েছে বলে জানান তিনি।

জীবন আরা বেগম বলেন, গ্রামের মানুষ ধর্মভীরু হওয়ায় অনেকে সন্তানদের মাদরাসায় ভর্তি করান। আবার অনেকে কিন্ডারগার্টেনেও সন্তানদের ভর্তি করেন।

শুধু ঝরে পড়া নয়, বদলে যাচ্ছে ভর্তির প্রবণতাও

ময়মনসিংহের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী কমার হিসাব শুধু ঝরে পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একদিকে বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে, অন্যদিকে অভিভাবকদের একটি অংশ সন্তানদের মাদরাসা ও কিন্ডারগার্টেনমুখী করছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে দারিদ্র্য, শিশুশ্রম ও সামাজিক-অর্থনৈতিক নানা বাস্তবতা।

ময়মনসিংহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, করোনা-পরবর্তী সময়ে বেসরকারি বিদ্যালয় ও মাদরাসামুখী হওয়ার প্রবণতায় শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার একটি কারণ। তবে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার জন্য শিক্ষক সংকটকে দায়ী করেননি তিনি। তার ভাষ্য, দারিদ্র্য, শিশুশ্রম এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক বিভিন্ন কারণই শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার জন্য বেশি দায়ী।

২০২০ সালের পর থেকেই বড় পরিবর্তন

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার প্রবণতাটি আরও স্পষ্ট হয়। ২০২০ সালে যেখানে জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রায় ৭ লাখ শিক্ষার্থী ছিল, ছয় বছর পর তা কমে সাড়ে চার লাখের নিচে নেমে এসেছে।

২০২২ সালে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৪ লাখ ২৭ হাজারে নেমে যাওয়ার পর ২০২৩ ও ২০২৫ সালে কিছুটা বৃদ্ধি দেখা গেলেও সেই বৃদ্ধি স্থায়ী হয়নি। চলতি বছর আবার বড় ধরনের পতন ঘটেছে।

শিক্ষা কর্মকর্তারা বলছেন, অভিভাবকদের সচেতন করা, বিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়ানো এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা না করলে এই প্রবণতা ঠেকানো কঠিন।

ময়মনসিংহের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান তাই শুধু শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার হিসাব নয়। অভিভাবকদের মানসিকতার পরিবর্তন, আর্থসামাজিক বাস্তবতা এবং প্রাথমিক শিক্ষায় শিশুদের ধরে রাখার বড় চ্যালেঞ্জেরও প্রতিচ্ছবি।

আরকে