বিজ্ঞাপন

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ‘ড্রাই ম্যাংগো’ তৈরি করে সাড়া ফেলেছেন ইসমাইল

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ‘ড্রাই ম্যাংগো’ তৈরি করে সাড়া ফেলেছেন ইসমাইল

আমের রাজধানীখ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে উন্মোচিত হয়েছে এক সম্ভাবনাময় অর্থনীতি। ক্ষণস্থায়ী আমভিত্তিক অর্থনীতিকে টেকসই রূপ দিতে এবং পচনশীল ফলের অপচয় রোধে স্থানীয় পর্যায়ে আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে তৈরি করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের ‘ড্রাই ম্যাংগো’ বা শুকনা আম। 

শিবগঞ্জের তরুণ উদ্যোক্তা ইসমাইল খান শামীমের হাত ধরে চালু হওয়া ‘নবাবি ম্যাংগো’ নামের এই কারখানাটি এখন শুধু শিবগঞ্জে নয়, পুরো অঞ্চলের কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

উদ্যোক্তা ইসমাইল খান শামীম দীর্ঘ এক যুগ ধরে আম চাষ, ব্যবসা ও রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা থেকে এই উদ্যোগের সূচনা করেন। ২০১৯ সালে থাইল্যান্ড ভ্রমণে গিয়ে সেখানকার আম প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, প্রসেসিং শিল্প এবং বিশাল পাইকারি বাজার সরেজমিনে দেখার সুযোগ পান তিনি। সেখান থেকেই মূলত ড্রাই ম্যাংগোর প্রতি তার আগ্রহ জন্মায়। পরবর্তীতে ২০২২ সালের শেষের দিকে পুনরায় থাইল্যান্ড সফরকালে তিনি দেখতে পান, সেখানকার ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের চেহারা পুরোপুরি বদলে গেছে এবং প্রায় প্রতিটি ব্র্যান্ডই ড্রাই ম্যাংগো উৎপাদনে ঝুঁকে পড়েছে। এরপর ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রথম প্রিমিয়াম মানের ড্রাই ম্যাংগো উৎপাদন শুরু করেন তিনি।

কারখানায় কর্মরত শ্রমিক আলামিন বলেন, আমরা ভালো আম দিয়ে প্রসেসিং করে ড্রাই ম্যাংগো তৈরি করি। মেশিনের মাধ্যমে ড্রাই ম্যাংগো করি, তারপর বাছাই করি এবং প্যাকেটজাত করি। এখান থেকে আমরা একটা ভালো মজুরি পাই, যা দিয়ে আমাদের সংসার চলে।

আরেক শ্রমিক শহিদুল বলেন, আমরা আমগুলো বাজার থেকে কিনে নিয়ে আসি। তারপর কাটা বাছাই করি, পরিষ্কার করি। এরপর মেশিনের মাধ্যমে ড্রাই ম্যাংগো তৈরি করি। এ থেকে আমাদের পরিবারের সচ্ছলতা আসে এবং বেকারত্ব দূর হয়। আমরা এই কাজ করে অনেক উপকৃত হয়েছি। আমাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। আমরা এখানে চার থেকে পাঁচজন কাজ করি।

শিবগঞ্জের তরুণ উদ্যোক্তা ইসমাইল খান শামীম বলেন, আমি দীর্ঘ একযুগ যাবত আম চাষ, ব্যবসা ও রপ্তানির সঙ্গে জড়িত। আম প্রক্রিয়াজাতকরণে আসার গল্পটা হচ্ছে, ২০১৯ সালে আমি প্রথম থাইল্যান্ডে গিয়েছিলাম। সেখানে বিভিন্ন আম প্রক্রিয়াজাতকরণ সেন্টার, প্রসেসিং শিল্প ও তাদের হোলসেল মার্কেটসহ তাদের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা দেখার জন্য আমার থাইল্যান্ডে যাওয়ার সুযোগ হয়। ওইখানে গিয়ে আমি প্রথম ড্রাই ম্যাংগো প্রোডাক্টটা দেখি। তারপর আমি ২০২২ সালের শেষে আবারও থাইল্যান্ডে যাই এবং আগের মতো আবারও আম প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন বাজারজাতকরণ সবকিছু দেখে একটা বিষয় আমার নজরে আসে। সেই সময় তারা ম্যাংগো লেদার এই টাইপের প্রোডাক্টগুলো তৈরি করতো। কিন্তু ২২ সালে গিয়ে দেখি তারা শিল্পের চেহারাটাই পাল্টে ফেলেছে। যেখানেই যাচ্ছি সেখানেই তারা শুধু ড্রাই ম্যাংগো উৎপাদন করছে। তারা বিভিন্ন ব্র্যান্ডে তাদের প্রোডাক্টগুলো উৎপাদন করছে এবং বাজারজাত করছে। 

তিনি বলেন, বিষয়টা আমার নজরে আসে, যেহেতু আমাদের দেশে প্রচুর পরিমাণে আম উৎপাদন হয়। আমাদের দেশে প্রায় ২৫ লাখ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হয়। আমাদের দেশে উৎপাদিত আমের মধ্যে মাত্র ১২ ভাগ আম প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হয়। আর এগুলো কিন্তু বড় বড় জায়ান্ট কোম্পানিগুলো করে থাকে। থাইল্যান্ডে একটা বিষয় দেখে আমার খুব ভালো লাগে, তা হলো সেখানে যতগুলো এমন ফ্যাক্টরি আছে তা কিন্তু এসএমই উদ্যোক্তারাই করেছে। এটা দেখেই আমার মনের মধ্যে আসে যে, আমরা যদি এমন শিল্প প্রতিষ্ঠা করতে পারি তাহলে আমসহ অন্যান্য ফলের চেহারা পাল্টে ফেলতে পারবো। সেই শিক্ষা থেকেই মূলত আমি কাজ শুরু করি। ২০২৫ সালে আমি বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ইনস্টল করি এবং বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে থাকি।

ইসমাইল খান শামীম বলেন, প্রথমে আমি ড্রাই ম্যাংগো নিয়ে কাজ শুরু করি। কিন্তু প্রথমে আমি ড্রাই ম্যাংগোর কালার নিয়ে আসতে পারছিলাম না, টেক্সচার আসছিল না, তবে খেতে স্বাদ ভালো ছিল। প্রায় ৪০ বার ট্রায়াল দেওয়ার পর আমি সফলতা লাভ করি। গত বছর আগস্টের এক তারিখ প্রথম আমি প্রিমিয়াম মানের অসমোটিক প্রযুক্তির ড্রাই ম্যাংগো তৈরি করতে সক্ষম হই। গত বছর যেহেতু আমি শেষ সময়ে আমের প্রোডাকশন করেছিলাম, তাই বেশি প্রোডাকশন করতে পারিনি। অল্প পরিমাণে প্রোডাকশন করেছিলাম। এই বছরের জুন থেকেই প্রোডাকশন শুরু করেছি। এখন এখান থেকেই প্রিমিয়াম মানের চমৎকার ড্রাই ম্যাংগো উৎপাদন হচ্ছে। বর্তমানে আমার উৎপাদিত প্রোডাক্টগুলো দেশের বাজারে ই-কমার্সের মাধ্যমে বাজারজাত করছি আমার ‘নবাবি ম্যাংগো’ পেজের মাধ্যমে।

বৃহৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে এই উদ্যোক্তা বলেন, আমার যে পরিকল্পনা আছে, এখন শুধু ড্রাই ম্যাংগো উৎপাদন করছি। আমাদের যেহেতু আমের সিজনটা সীমিত। মাত্র তিন থেকে চার মাস আমের সিজন। তাই আমি যে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছি সেটা হলো, পুরো ১২ মাস আমার কারখানার কাজ যেন চলে। আমাদের দেশীয় যতগুলো ফল আছে, যে ফলগুলো কৃষক ন্যায্য দাম পান না, সেই ফলগুলো যেমন— আনারস, কলা, পেঁপেসহ নানান ফল প্রক্রিয়াজাত করবো। ইতিমধ্যে এই ফলগুলো প্রক্রিয়াজাতকরণে সফলতা লাভ করেছি। দেশে আমার প্রতিষ্ঠানকে ড্রাই ফ্রুটসে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। 

ইসমাইল খান শামীম বলেন, আমার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশের পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানি করা। এখন একেবারে আমার উৎপাদন সীমিত পরিমাণে হচ্ছে। কারণ আমার এখানে ব্যাংক-সহায়তা দরকার। বর্তমানে ঋণের জন্য ব্যাংকের দ্বারে দ্বারে দৌড়াচ্ছি। ইতোমধ্যে জুতা অর্ধেক ক্ষয় করে ফেলেছি। বিভিন্ন ব্যাংকে যাচ্ছি, বিভিন্ন রকমের কথা শুনছি। আসলে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেটা দেখলাম, একজন এসএমই উদ্যোক্তা হিসেবে যাদের মাথায় তেল আছে তাদেরকেই তারা তেল দেয়। আমাদের মতো এসএমই উদ্যোক্তাদের তারা কিন্তু ঋণ দিতে চাচ্ছে না। আমার বাবার ১০ কোটি টাকার সম্পদ দিয়ে এক ব্যাংকে দেড় কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার জন্য কথাবার্তা হচ্ছে, দেখা যাক কী হয়। এ ছাড়া আমি যদি সরকারি সহায়তা বা পৃষ্ঠপোষকতা পাই তাহলে রপ্তানির নতুন দ্বার উন্মোচিত করবো। 

তিনি বলেন, দেশে প্রায় ২৫ লাখ মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হয়, কিন্তু যখন আমগুলো একসঙ্গে পেকে যায় তখন আমরা কৃষকরা আমের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হই। তাই আমার মতো ৫০ থেকে ১০০ উদ্যোক্তা যদি এগিয়ে আসেন আম প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য, তাহলে আমরা যারা আম চাষি আছি তাদের প্রত্যেকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত হবে এবং প্রচুর পরিমাণে বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হবে।

শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নয়ন মিয়া বলেন, আমরা এখানে দেখলাম আশ্বিনা আম সরাসরি প্রসেসিং করছে এবং তারপর ড্রাই মেশিনে দিচ্ছে। আমি ড্রয়ার থেকে আম টেস্ট করলাম, এই প্রোডাক্টের মিষ্টতা খুবই ভালো এবং অরিজিনাল ফ্লেভার পাওয়া যায়। এখানে আম ছাড়াও পেঁপে, কলাসহ নানান ফ্রুটস ড্রাই করা হচ্ছে। আমরা কৃষি অধিদপ্তর থেকে যেটা চাচ্ছি সেটা হলো, এখানে যেহেতু বৃহৎ পরিসরে আমের উৎপাদন হয়, তার মধ্যে অনেক পরিমাণ আম বিভিন্ন কারণে যেমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, একসঙ্গে পেকে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে নষ্ট হয়ে যায়। তাই খাওয়ার উপযোগী আমগুলোকে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে আমরা ড্রাই ফ্রুটস তৈরি করতে পারি। 

তিনি বলেন, আম থেকে আচার, চাটনি ও বিশেষ করে ড্রাই ম্যাংগো তৈরি করা যায়। এই ড্রাই ম্যাংগোর দেশের বিভিন্ন জেলায় চাহিদা রয়েছে এবং অনলাইনের মাধ্যমে বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে। আমাদের আশা থাকবে এটা আমরা বাইরের দেশেও রপ্তানি করবো। আমরা ইতোমধ্যে প্রস্তাবনা পাঠিয়ে দিয়েছি যে, কৃষিঋণ বা ভর্তুকির মাধ্যমে হোক— যেকোনো উপায়ে বিভিন্ন ধরনের ছোট উদ্যোক্তাদের যদি কৃষি ঋণ বা অন্যান্য সহায়তা দিতে পারি, তাহলে ছোট ছোট মেশিন দিয়ে ড্রাই ম্যাংগো তৈরি শুরু হলে একসময় এই এলাকায় বৃহৎ আকারের শিল্প হিসেবে ঘোষণা করা হতে পারে। সেই লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ ও উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছি।

আশিক আলী/আরএআর