বিজ্ঞাপন

কাছে পাওয়ার আকুতি বাবার

৩২ বছর পর হারিয়ে যাওয়া মেয়ের সন্ধান মিলল পাকিস্তানে

৩২ বছর পর হারিয়ে যাওয়া মেয়ের সন্ধান মিলল পাকিস্তানে

দীর্ঘ ৩২ বছর আগে বাংলাদেশ থেকে পাচারের শিকার হয়ে নিখোঁজ হন বরগুনার মেয়ে আছিয়া। ওই সময়ে তার বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর। ঘটনার পর পরিবারের সদস্যরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করলেও কোথাও তার সন্ধান মেলেনি। তবে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টের মাধ্যমে পাকিস্তানে সন্ধান মিলেছে আছিয়ার।

বর্তমানে ৭ সন্তানের জননী আছিয়া বাংলাদেশে ফিরতে চান ৯৫ বছর বয়সী বাবার কাছে। অপরদিকে হারিয়ে যাওয়া মেয়েকে মৃত্যুর আগে কাছে পেতে ব্যাকুল হয়ে আছেন বৃদ্ধ বাবা তমিজ উদ্দিন। 

আছিয়ার পরিবার সূত্রে জানা যায়, জীবিকার তাগিদে তমিজ উদ্দিন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ১৯৯০ সালের দিকে বরগুনা ছেড়ে ঢাকা চলে যান। সেখানে গিয়ে মিরপুর ২ নম্বরের বড়বাগ নামক এলাকার একটি বাড়িতে বসবাস শুরু করেন তারা। ওই সময় তমিজ উদ্দিন ঢাকায় দিনমজুরির কাজ করে সংসার পরিচালনা করতেন। পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে যে কোনো একদিন বিকেলে ঘর থেকে বের হয়ে মেয়ে আছিয়া নিখোঁজ হন। পরে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করলেও আছিয়ার আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। 

নিখোঁজ মেয়ে আছিয়ার কোনো সন্ধান না পেয়ে স্ত্রীসহ বাকি ৬ সন্তানদের নিয়ে আবারও বরগুনায় ফিরে আসেন তমিজ উদ্দিন। হারানো মেয়ের শোক নিয়েই তিনি পাঁচ মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেও বিয়ে করে সংসার শুরু করেছেন। এছাড়া গত তিন বছর আগে আছিয়াকে হারানোর শোক নিয়ে মারা যান মা রাহেলা। তবে দীর্ঘ ৩২ বছর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টের মাধ্যমে পাকিস্তানে সন্ধান মিলেছে নিখোঁজ মেয়ে আছিয়ার। এরপর থেকেই মেয়ের সঙ্গে প্রতিদিন মোবাইল ফোনে কথা হয় ৯৫ বছর বয়সী বাবা তমিজ উদ্দিনের। তবে দীর্ঘ বছর পর মোবাইল ফোনে মেয়ের মুখ দেখাসহ কণ্ঠ শুনতে পলেও মেয়েকে কাছে পেতে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন তিনি। পাকিস্তান থেকে আছিয়াও এখন ফিরতে চান বাবার কাছে। 

সরেজমিনে বরগুনা সদর উপজেলার এম বালিয়াতলী ইউনিয়নের চারাভাঙ্গা নামক এলাকায় তমিজ উদ্দিনের বাড়িতে ঘুরে দেখা যায়, জীর্ণশীর্ণ একটি টিনের ঘরে বসবাস করছেন তিনি। বয়সের ভারে প্রায় অচল অবস্থায় তার এখন বেশিরভাগ সময়ই কাটে বিছানায়। তবে হারিয়ে যাওয়া মেয়ের সন্ধান পাওয়ায় এখন নিয়মিত মোবাইল ফোনে ভিডিও কলে কথা হয় মেয়ের সঙ্গে। আর ভিডিও কল এলেই তমিজ উদ্দিনের চোখেমুখে ফুটে ওঠে আনন্দ। কখনো মৃদু হাসেন, কখনো চোখের পানি মুছতে মুছতে কান্না করেন তিনি। জীবনের শেষ বয়সে এসে মৃত্যুর আগে এখন শুধু মেয়েকে কাছে পেতে চান বৃদ্ধ তমিজ উদ্দিন। অপরদিকে আছিয়াও ফিরতে চান বাবার কাছে। তবে পাসপোর্ট, ভিসা ও প্রশাসনিক জটিলতায় তাদের এ আশা পূরণ আঁটকে আছে বলে জানিয়েছেন আছিয়ার স্বজনরা।

হারিয়ে যাওয়ার বিষয়ে জানতে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ভিডিও কলে কথা হয় পাকিস্তান থাকা আছিয়ার সঙ্গে। তিনি ঢাকা পোস্টকে জানান, একটি চক্র তাকে ঢাকার সদরঘাট এলকা থেকে প্রলোভন দেখিয়ে প্রথমে ভারতে নিয়ে যায়। পরে সেখানে কিছুদিন রেখে পাকিস্তানের মোজাফফর নগরে পাঠানো হয়। এরপর সেখানে ৪০ হাজার রুপির বিনিময়ে একজনের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে পাকিস্তানের এক নাগরিকের সঙ্গে বিয়ে হয় আছিয়ার। বর্তমানে সেখানে তার ৬ মেয়ে ও ১ ছেলে সন্তান রয়েছে। তবে একবছর আগে স্বামীর মৃত্যুর পর স্বজনদের কথা মনে পড়লে তিনি নিজের পরিচয় এবং বাংলাদেশে থাকা বাবার নাম ও ঠিকানা জানিয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট করেন। পরে ওই পোস্টটি খোঁজ নামের একটি ফেসবুক পেজে শেয়ার করলে প্রথমে স্থানীয় রিয়াজ উদ্দিন খান নামে একজনের নজরে আসলে সন্ধান মেলে আছিয়ার বাবা ও স্বজনদের। এর পর ২০ জুলাই থেকেই বাবার সঙ্গে নিয়মিত কথা শুরু হয় পাচারের শিকার হয়ে নিখোঁজ থাকা আছিয়ার। 

আছিয়া আরও বলেন, পরিবারের সন্ধান পাওয়ার পর এখন তিনি দেশে ফিরতে চান। আর সবার সহযোগিতা বিশেষ করে সরকারি সহযোগিতা পেলে দ্রুতই দেশে ফিরতে পারবেন বলেও জানান আছিয়া।  

প্রতিবেশী রিয়াজ উদ্দিন খান ঢাকা পোস্টকে বলেন, নিখোঁজ থাকা আছিয়া আমার দূঃসম্পর্কে ফুফু হয়। ফেসবুকে খোঁজ নামক একটি পেজে তার একটি পোস্ট আমার নজরে আসে। ওই পোস্ট দেখে, দেখি উল্লেখ করা সকল স্বজনরাই আমার পরিচিত। এর পর মোবাইলে যোগাযোগ করে ছবি আদান প্রদানের মাধ্যমে তাদের উভয় পক্ষের পরিচয় নিশ্চিত হয়ে এখন প্রতিদিনই তাদের সঙ্গে কথা হয়। তবে তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসতে চাইলে কিছু একটা জটিলতার কারণে ফিরতে পারছেন না। আমরা চাই সরকার তাকে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করুক। 

আছিয়ার ভাই মোস্তফা ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমার বোনের বয়স যখন ১৬-১৭ বছর তখন বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয়। আমরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও তাকে পাইনি। না পেয়ে এক সময় ধরেই নিয়েছিলাম, সে হয়তো আর বেঁচে নেই। কিন্তু এখন পাকিস্তানে বোনের খোঁজ মিলেছে। বোনকে ফেরত পেতে আমাদের সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন।   

দীর্ঘ ৩২ বছর পর হারিয়ে যাওয়া মেয়েকে খুঁজে পেয়ে বৃদ্ধ বাবা তমিজ উদ্দিন ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে ঢাকা পোস্টকে বলেন, হারিয়ে যাওয়ার পর আছিয়াকে কোথাও খুঁজে পাইনি। ৩২ বছর পর মোবাইল মেয়েকে দেখতে পেয়েছি। মৃত্যু আগে একবার হলেও মেয়েকে কাছে পেতে চাই। সরকারের কাছে আবেদন জানাই যাতে আছিয়াকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়। 

এ বিষয়ে বরগুনার জেলা প্রশাসক তাছলিমা আক্তার ঢাকা পোস্টকে বলেন, আছিয়ার ফিরে আসার জন্য দুটি প্রক্রিয়া রয়েছে। এর মধ্যে তার যদি বাংলাদেশে জন্ম নিবন্ধন অথবা নাগরিকত্ব সনদ থাকে তা নিয়ে পাকিস্তানের হাইকমিশনে গিয়ে প্রমাণ করতে পারলে একটি ট্রাভেল পাস পেতে পারেন। তবে যেহেতু ৩২ বছর ধরে পাকিস্তানে রয়েছেন তার যদি জন্ম নিবন্ধন অথবা নাগরিকত্ব সনদ না থাকে, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশে থাকা স্বজনরা জেলা প্রশাসককে মাধ্যম করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বরাবর একটি আবেদন করতে পারেন। সে অনুযায়ী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিদ্যমান যে নীতি রয়েছে, সে অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

আব্দুল আলীম/আরকে