মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলা সদরের একটি সড়কের দুই পাশে গড়ে উঠেছে চড়ুই পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়। প্রতিদিন পড়ন্ত বিকেলে ঝাঁকে ঝাঁকে চড়ুই এসে জড়ো হয় গাছের ডালে। তাদের কিচিরমিচির, ডানা ঝাপটানো আর দলবেঁধে ওড়াউড়িতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। স্থানীয়দের কাছে জায়গাটি এখন পরিচিতি পেয়েছে ‘চড়ুই চত্বর’ নামে।
মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলা সদরের বাসস্ট্যান্ডের পশ্চিম পাশ থেকে কলেজ রোড পর্যন্ত প্রায় ১০০ গজ সড়কের দুই ধারে কয়েকটি কাঁঠাল, বট, ও মেহগনি গাছ। এসব গাছই এখন শত শত চড়ুই পাখির রাত্রিযাপনে আশ্রয়স্থল। প্রতিদিন বিকেল হলেই দূর-দূরান্ত থেকে দল বেঁধে উড়ে এসে গাছগুলোর ডালে বসে পাখিগুলো।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগ মুহূর্তে হঠাৎ করেই আকাশে দেখা দেয় ছোট ছোট পাখির ঝাঁক। মুহূর্তেই গাছের ডালপালা ভরে যায় চড়ুইয়ে। কেউ ডালে বসে ডাকছে, কেউ আবার এক গাছ থেকে অন্য গাছে উড়ে যাচ্ছে। কখনো দল বেঁধে আকাশে চক্কর দিচ্ছে, আবার মুহূর্তেই ফিরে আসছে আশ্রয়স্থলে।
চড়ুইদের এমন চঞ্চলতায় পুরো এলাকা যেন হয়ে ওঠে ছোট্ট এক প্রাকৃতিক অভয়ারণ্য। ব্যস্ত সড়ক দিয়ে চলাচলকারী পথচারীরাও অনেক সময় থমকে দাঁড়িয়ে উপভোগ করেন পাখিদের এই ব্যতিক্রমী দৃশ্য।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ভোরের আলো ফুটতেই চড়ুইয়ের দল গাছগুলো ছেড়ে খাবারের সন্ধানে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। পড়ন্ত বিকেলে আবার ফিরে আসে এই গাছগুলোতে। দিনের পর দিন একই নিয়মে ফিরে আসায় জায়গাটি যেন তাদের স্থায়ী নিরাপদ নীড় হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. ইমামুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন বিকেলের দিকে ঝাঁকে ঝাঁকে চড়ুই এখানে এসে জড়ো হয়। সন্ধ্যার আগে গাছগুলোতে নামার পর চারপাশ কিচিরমিচির শব্দে মুখর হয়ে ওঠে। পাখিগুলোর এমন দৃশ্য দেখতে খুব ভালো লাগে। মনে হয় শহরের মধ্যেই যেন একটি পাখির অভয়ারণ্য।

পথচারী আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, মহম্মদপুর বাজার থেকে এই সড়ক দিয়ে প্রায়ই যাতায়াত করি। চড়ুই পাখির কলরব শুনলেই এখানে একটু থেমে দাঁড়াই। এতগুলো পাখি একসঙ্গে দেখা সত্যিই দারুণ লাগে। প্রকৃতির এমন দৃশ্য এখন খুব বেশি দেখা যায় না। সাধারণভাবে পাতি চড়ুই ও গেছো চড়ুই বেশি দেখা যায়। মানুষের ঘরবাড়ি, ভবনের কার্নিস, ভেন্টিলেটর কিংবা আশপাশের গাছপালায় এরা আশ্রয় নেয়।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) মাগুরা জেলা শাখার সভাপতি এটিএম আনিসুর রহমান বলেন, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় ছোট্ট এই পাখিটির ভূমিকা থাকলেও নানা কারণে দিন দিন তাদের আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। পুরোনো গাছ কেটে ফেলা, নতুন ভবন নির্মাণ, ঝোপঝাড় কমে যাওয়া এবং খাদ্য ও বাসা বাঁধার উপযোগী জায়গা কমে যাওয়ায় চড়ুইয়ের নিরাপদ আবাসস্থলও হুমকির মুখে পড়ছে। চড়ুই শুধু সৌন্দর্য বাড়ায় না, পরিবেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রজননকালীন সময়ে বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকামাকড় ও তাদের লার্ভা খেয়ে এরা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। ফলে কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের জন্যও পাখিটির উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, মহম্মদপুরের চড়ুই চত্বর এখন শুধু পাখিদের আশ্রয়স্থল নয়, এটি এলাকার একটি প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ও আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। তাই এসব গাছ সংরক্ষণ, পাখিদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং এলাকায় পাখি শিকার ও বিরক্ত করা বন্ধে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
তাদের দাবি, উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা চাইলে জায়গাটিকে ছোট পরিসরে ‘চড়ুই সংরক্ষণ এলাকা’ হিসেবে পরিচিত করতে পারেন। গাছগুলো সংরক্ষণের পাশাপাশি সেখানে পাখিদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে এটি হতে পারে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের একটি অনন্য উদাহরণ।
জেলা জীব বৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি মো. সাইফুল্লাহ বলেন, চড়ুই পাখি আমাদের জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মানুষের বসতির খুব কাছাকাছি থেকেও এরা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। মহম্মদপুরে যে জায়গাটিতে প্রতিদিন অসংখ্য চড়ুই নিরাপদ আশ্রয় নিচ্ছে, সেটি নিঃসন্দেহে প্রকৃতির জন্য একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। পাখিদের নিরাপদ আবাসস্থল টিকিয়ে রাখতে গাছপালা সংরক্ষণ করতে হবে এবং কোনোভাবেই পাখি শিকার, নিধন বা তাদের বিরক্ত করা যাবে না।
তাছিন জামান/আরকে
