বিজ্ঞাপন

৪ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে সাইকেলে স্কুলে, বদলে যাচ্ছে চরটেকীর মেয়েদের স্বপ্ন

৪ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে সাইকেলে স্কুলে, বদলে যাচ্ছে চরটেকীর মেয়েদের স্বপ্ন

কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার নদীবেষ্টিত চরাঞ্চল চরটেকী। কাঁচা রাস্তা, সীমিত যোগাযোগ ব্যবস্থা আর দীর্ঘ পথ— এসব বাধা এখানে মেয়েদের শিক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। প্রতিদিন ভোরে সাদা পোশাক, কাঁধে বইয়ের ব্যাগ আর হাতে সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে শতশত শিক্ষার্থী ছুটে আসে চরটেকী গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে। সাইকেলের বেলের টুং টাং শব্দ যেন প্রত্যন্ত জনপদে শিক্ষা আর আত্মবিশ্বাসের নতুন বার্তা ছড়িয়ে দেয়।

১৯৯৩ সালে প্রত্যন্ত গ্রামীণ মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় চরটেকী গার্লস স্কুল। পরে উচ্চমাধ্যমিক স্তর চালু হলে এর নাম হয় চরটেকী গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ৫০০-এর বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। শিক্ষা, শৃঙ্খলা ও ফলাফলের ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠানটি আজ পুরো উপজেলার অন্যতম আস্থার নাম।

শিক্ষার মানেও রয়েছে ধারাবাহিক সাফল্য। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে ভর্তি হতে আসেন। মাধ্যমিক (এসএসসি) ও উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় প্রতিবছরই ভালো ফলাফল করছে প্রতিষ্ঠানটি এবং জেলা ও উপজেলার শীর্ষে স্থান করে নিচ্ছে।

জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির সাইকেলযাত্রার গল্প অনেক পুরোনো। প্রতিষ্ঠার বছরেই ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয় সামিয়া ফেরদৌসী কলি। তার বাড়ি বিদ্যালয় থেকে ৫-৬ কিলোমিটার দূরে। সে সময় চরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত দুর্বল, গণপরিবহনও ছিল হাতে গোনা। তাই প্রতিদিন বাইসাইকেল চালিয়েই বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করতো সে। 

কলির সেই উদ্যোগ ধীরে ধীরে অন্য শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করে। চরাঞ্চলের দুর্গম পথ ও যাতায়াতের সীমাবদ্ধতার কারণে একসময় সাইকেলই হয়ে ওঠে শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বাহন। এখন বিদ্যালয়ের অধিকাংশ ছাত্রীই প্রতিদিন ৪-৫ কিলোমিটার পথ সাইকেল চালিয়ে বিদ্যালয়ে আসে। সাদা পোশাক, কাঁধে ব্যাগ আর সারিবদ্ধ সাইকেলের দৃশ্য এখন চরটেকীর পরিচয়ের অংশ। সম্প্রতি এই ব্যতিক্রমী চিত্র দেশজুড়ে আলোচনায় এসেছে। অনেকেই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এখন ‘সাইকেল বালিকা’ নামেই চেনেন।

সরেজমিনে চরটেকী গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে গিয়ে দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি শিক্ষার্থীই সাইকেল চালিয়ে বিদ্যালয়ে আসছে। নির্দিষ্ট জায়গায় সাইকেল রেখে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করছে তারা। গ্রামের মেঠোপথে সাইকেল নিয়ে শিক্ষার্থীদের দলবেঁধে আসার দৃশ্য মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে।

বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাইশা বলে, অনেকেই বলে মেয়ে মানুষ হয়ে তোমরা কেন সাইকেল চালাও। কিন্তু আমরা সেটা পাত্তা দিই না। কারণ আমাদের শিক্ষিত হতে হবে, বড় হতে হবে। সেজন্য আমরা সাইকেল চালিয়ে বিদ্যালয়ে আসি। আমরা সবাই সাইকেল চালিয়ে বিদ্যালয়ে আসি। আমাদের স্কুল সাইকেলের জন্যই হয়তো বিখ্যাত। এটায় আমরা গর্ববোধ করি। তবে যে যাই বলুক কারো কথায় কান দেবো না। শিক্ষার পথে যেতে থাকবো। 

একই শ্রেণির শিক্ষার্থী আফরিন জানায়, তাদের বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় ৪ কিলোমিটার। আগে হেঁটে আসতে অনেক সময় লাগতো। এখন সাইকেলে নির্ধারিত সময়েই পৌঁছানো যায়। তবে বর্ষাকালে কাদাময় সড়কে চলাচল এখনও কষ্টকর। দ্রুত সড়ক সংস্কার হলে দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে বলে সে জানায়।

আয়েশা বেগম নামে একজন অভিভাবক বলেন, মেয়ে আগে হেঁটে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করতো। এতে হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরত সে। এখন সাইকেলে আসা-যাওয়া করে। সময়ও বাঁচছে, পড়াশোনার জন্য বাড়তি সময় পাচ্ছে।

শিক্ষার্থী মাহিয়ার বাবা আব্দুল মান্নান বলেন, আগে মেয়েকে একা এত দূর পাঠাতে ভয় লাগতো। আবার প্রতিদিন পৌঁছে দেওয়া বা নিয়ে আসাও সম্ভব হতো না। সাইকেল কেনার পর সেই দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমে গেছে। এখন সে সময়মতো বিদ্যালয়ে যায়, সময়মতো বাড়ি ফেরে। সবচেয়ে বড় কথা, তার আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়েছে।

চরটেকী গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও পরিচালনা কমিটির সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রতিবছর ভালো ফলাফল অর্জিত হচ্ছে। কিন্তু ভাঙাচোরা সড়ক, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষের অভাব ও অসম্পূর্ণ অবকাঠামোর কারণে শিক্ষার্থীদের নানা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও উন্নত হলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রূপম দাস বলেন, সম্প্রতি তিনি প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করেছেন। শিক্ষার পরিবেশ ও মান অত্যন্ত ভালো। প্রত্যন্ত এলাকার মেয়েদের প্রতিদিন সাইকেল চালিয়ে বিদ্যালয়ে আসার বিষয়টি অনুকরণীয় উদ্যোগ। চরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

আরএআর