শরীরের নিচের অংশে শক্তি নেই। নিজেরা চলাফেরা করতে পারেন না। তবু স্বপ্ন দেখেছেন অন্যদের মতোই পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর। সেই স্বপ্ন পূরণে একের পর এক প্রতিকূলতা পেরিয়েছেন একই পরিবারের পাঁচ ভাই-বোন। তাদের বাবা মহরম আলী ছিলেন প্রতিবন্ধী। এখন তার পাঁচ সন্তানও শারীরিক প্রতিবন্ধী। কিন্তু শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাদের শিক্ষার পথে থামাতে পারেনি।
কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার বিলপাড় গজারিয়া গ্রামের এই পাঁচ ভাই-বোন এখন জীবনের নতুন একটি সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছেন। যোগ্যতা অনুযায়ী সরকারি চাকরির সুযোগ চান তারা। নিজেদের মেধা দিয়ে দেশের জন্য কাজ করতে চান।
পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে বড় সুজন মিয়া হিসাববিজ্ঞান বিভাগে কিশোরগঞ্জ সরকারি গুরুদয়াল কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। তার ছোট বোন মারজিয়া বেগম ব্যবস্থাপনা বিভাগে বাজিতপুর সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক শেষ করেছেন। আরেক বোন জহুরা বেগম সমাজকর্ম বিভাগে প্রথম বর্ষে পড়ছেন। মুক্তা আক্তার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছেন। সবার ছোট পান্না আক্তার পড়ছেন দশম শ্রেণিতে।
পরিবারটির সদস্যরা জানান, ছোটবেলা থেকেই তাদের জীবন ছিল নানা সীমাবদ্ধতায় ঘেরা। অন্যদের মতো স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে না পারলেও পড়াশোনার প্রতি তাদের আগ্রহ ছিল প্রবল। পরিবারের সামর্থ্য সীমিত হলেও সন্তানদের লেখাপড়া বন্ধ করেনি পরিবারটি। একে একে পাঁচ ভাই-বোনই শিক্ষার পথে এগিয়েছেন।
তাদের এই পথচলা সহজ ছিল না। বিদ্যালয়, কলেজে যাওয়া-আসা, দৈনন্দিন কাজ—সবকিছুতেই অন্যের সহযোগিতা নিতে হয়েছে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি আর্থিক সংকটও ছিল নিত্যসঙ্গী। তারপরও পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন তারা। বড় দুই ভাই-বোন উচ্চশিক্ষা শেষ করেছেন, অন্যরাও এগিয়ে চলেছেন শিক্ষার পথে। এখন পরিবারের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা ভবিষ্যৎ নিয়ে। উচ্চশিক্ষা শেষ করেও সুজন ও মারজিয়ার সামনে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা।
স্থানীয় বাসিন্দা মোজাম্মেল হক বলেন, পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে অন্তত একজনকে তার যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে সরকারি চাকরির সুযোগ দেওয়া হলে পরিবারটি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। আমরা গ্রামবাসী সরকারের প্রতি এমনটাই দাবি জানাই।
মো. উজ্জল মিয়া নামে অপর এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মহরম আলী আট বছর আগে মারা যান। পরে তার ভাই পরিবারটির দায়িত্ব নেয়। বছর খানেক আগে তিনিও প্যারালাইজড হয়ে যান। এখন পরিবারটি খুবই হতাশায় রয়েছে। যোগ্যতা অনুযায়ী একজনের চাকরির ব্যবস্থা হলে প্রতিবন্ধী এই পরিবারটিতে সুখের দেখা মিলতো।
পরিবারটির সদস্যদের ভাষ্য, তারা কারও করুণা চান না। তারা চান নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ। যে প্রতিবন্ধকতা জয় করে তারা শিক্ষাজীবনে এগিয়ে এসেছেন, কর্মক্ষেত্রেও সুযোগ পেলে সেই মেধা ও শ্রম দেশের কাজে লাগাতে চান।
তাদের সেই আকুতি এখন প্রধানমন্ত্রীর কাছে। আগামী ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কিশোরগঞ্জ সফরকে ঘিরে তাই নতুন করে আশাবাদী পরিবারটি। তাদের চাওয়া, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলার সুযোগ। নিজেদের জীবনসংগ্রামের কথা তার কাছে তুলে ধরতে চান তারা।
সুজন মিয়া বলেন, আমরা পাঁচ ভাই-বোনই প্রতিবন্ধী। তারপরও পড়াশোনা করেছি। অনেক কষ্ট করে এগিয়েছি। আমাদের মধ্যে একজনকে যদি যোগ্যতা অনুযায়ী সরকারি চাকরির সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে আমাদের পরিবারটি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। আমরা কারও দয়া চাই না, কাজ করার সুযোগ চাই।
পরিবারটি বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান ইকবালের সহযোগিতা ও সুদৃষ্টি কামনা করেছে। তাদের প্রত্যাশা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের উদ্যোগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ তৈরি হবে।
পিরিজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাফর ইকবাল জুয়েল বলেন, পাঁচ ভাই-বোনের এই পরিবারটি প্রতিবন্ধকতা জয় করে শিক্ষার ক্ষেত্রে যে দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে, তা অনন্য। প্রধানমন্ত্রী মানবিক দিক বিবেচনা করে পরিবারটির পাশে দাঁড়ালে সেটি শুধু একটি পরিবারের জন্য সহায়তা হবে না, দেশের অন্য প্রতিবন্ধী মানুষের জন্যও বড় অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবে।
বাজিতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জালাল উদ্দিন বলেন, আমি এখানে কিছুদিন আগে যোগদান করেছি। আপনাদের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারলাম। খোঁজখবর নিয়ে পরিবারটিকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।
আরএআর
