যে বয়সে কাঁধে তুলে নেওয়ার কথা ছিল পুরো পরিবারের দায়িত্ব, সেই বয়সেই বিছানায় শুয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন নাটোরের দত্তরাপাড়ার শিবপুর গ্রামের যুবক রনি আহমেদ (২৭)। প্রায় এক দশক ধরে ত্বকের ক্যান্সারের সঙ্গে এক অসম লড়াইয়ে তিনি আজ ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। একসময়ের প্রাণচঞ্চল এই যুবকের চিকিৎসায় সহায়-সম্বল সব হারিয়ে নিঃস্ব তার পরিবার।
চিকিৎসকরা উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে নেওয়ার পরামর্শ দিলেও বিপুল অঙ্কের টাকার অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে সব পথ। এমন অবস্থায় একমাত্র ছেলেকে বাঁচাতে সমাজের বিত্তবানদের কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন রনির বাবা-মা।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১০ বছর আগে মাঠে বাদাম তুলতে গিয়ে রনির পেটে একটি পোকা কামড় দেয়। এরপর থেকেই শরীরে শুরু হয় তীব্র জ্বালাপোড়া। স্থানীয় চিকিৎসায় কাজ না হওয়ায় তাকে প্রথমে বগুড়া ও পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। দুই হাসপাতালেই তার পেটে টিবি (যক্ষ্মা) হয়েছে বলে জানানো হয়। দীর্ঘ দুই বছর টিবির ওষুধ খাওয়ার পরও তার অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। অবশেষে, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (পিজি হাসপাতাল) পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ধরা পড়ে রনি আসলে মরণব্যাধি স্কিন ক্যান্সারে আক্রান্ত।
ঢাকাগামী বাসের সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করে স্ত্রী, সন্তান আর বাবা-মাকে নিয়ে কোনোমতে সংসার চালাতেন রনি। বিয়ের পর ঘর আলো করে আসে একটি ছেলে সন্তান। ৫ বছর বয়সী অবুঝ শিশুটি এখনো বোঝে না বাবার অসুস্থতা কতটা গভীর। তার একটাই অপেক্ষা, বাবা সুস্থ হয়ে আবার তাকে কোলে নিয়ে আগের মতো খেলতে যাবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজ অনিশ্চিত।
রনি আহমেদ বলেন, শরীরজুড়ে অসহ্য জ্বালাপোড়া। কোনো ওষুধই যেন কাজ করছে না। যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে মাঝে মাঝে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। চিকিৎসা করাতে গিয়ে ভিটেমাটি ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। ডাক্তাররা বলেছেন বিদেশে নিলে হয়তো সুস্থ হতে পারব। সমাজের বিত্তবান মানুষেরা এগিয়ে না এলে আমার চিকিৎসা চালানো সম্ভব না।
ছেলের শয্যার পাশে বসে মা হাফিজা খাতুন বলেন, দিনরাত ছেলেটা ব্যথায় কাতরায়। মা হয়ে এই কষ্ট কীভাবে সহ্য করি! বগুড়া, রাজশাহী, ঢাকা—কোথাও চিকিৎসা বাকি রাখিনি। এখন টাকার অভাবে চোখের সামনে ছেলেটা শেষ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কিছুই করতে পারছি না।
একইভাবে নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন রনির বাবা রমজান আলী। তিনি বলেন, ছেলের চিকিৎসায় নিজের জমিজমা বিক্রি ও আত্মীয়দের সহায়তায় প্রায় ১৪-১৫ লাখ টাকা খরচ করেছি। এখন ৪ শতাংশ বসতভিটা ছাড়া আর কিছুই নেই। ছেলের চিৎকারে কলিজা ফেটে যায়, কিন্তু বাবা হয়ে কিছুই করার ক্ষমতা আমার নেই। আমি আমার ছেলেকে বাঁচাতে সবার সাহায্য চাই।
এলাকার বাসিন্দা সুলতান আলী জানান, রনি খুব ভালো ছেলে। তার এই অবস্থায় আমরা এলাকাবাসী সাধ্যমতো পাশে দাঁড়িয়েছি। কিন্তু ক্যান্সারের চিকিৎসার খরচ এতটাই বেশি যে আমাদের পক্ষে আর সাহায্য করা সম্ভব হচ্ছে না।
এ বিষয়ে নাটোর সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আজাহার আলী বলেন, রনি আহমেদ দীর্ঘদিন যাবত ক্যান্সারে ভুগছেন। আমাদের উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে আগে ক্যান্সার রোগের চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হতো। এখন সেটি বৃদ্ধি করে ১ লাখ টাকা করা হয়েছে। তার কাছ থেকে আবেদন পেলে তা নিষ্পত্তি করে আমরা দ্রুত তার চিকিৎসার জন্য ১ লাখ টাকা অনুদান দেওয়ার চেষ্টা করব। পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদের রনি আহমেদের পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধ করেন তিনি।
রনি আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের মোবাইল নম্বর- ০১৭৫৮০৩৪৯৬০
আশিকুর রহমান/এএমকে
