সংসারের হাঁড়ি চড়াতে একসময় প্রতিদিন কাজের খোঁজে বের হতে হতো সীমা মিনজিকে। কখনো ধানের জমিতে, কখনো ফসলের মাঠে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে দিনভর অন্যের জমিতে কাজ করতেন তিনি। দিন শেষে পাওয়া মজুরিই ছিল পাঁচ সদস্যের সংসারের ভরসা। কোনো দিন কাজে যেতে না পারলে কখনো কখনো চুলোয় হাঁড়ি ওঠাও কঠিন হয়ে পড়ত।
সেই সীমার জীবন এখন বদলে গেছে। আর অন্যের জমিতে কাজের জন্য ছুটতে হয় না তাকে। নিজের ঘরেই তৈরি হয়েছে কর্মস্থল। সামনে সেলাই মেশিন, পাশে কাপড়ের স্তূপ। মাপ নেওয়া, কাপড় কাটা, সেলাই করা থেকে শুরু করে পোশাক তৈরি সবই করেন নিজ হাতে। এই কাজ করে এখন মাসে ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন তিনি। কোনো কোনো মাসে আয় আরও বেশি হয়। একসময় যে হাত অন্যের জমিতে শ্রম দিয়ে সংসার টিকিয়ে রাখত, সেই হাতই এখন নিজের দক্ষতায় সংসারের ভবিষ্যৎ গড়ছে।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়নের একটি আদিবাসী গ্রামের ২৫ বছর বয়সী সীমা মিনজির এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে তার নিজের চেষ্টা ও পরিশ্রমের পাশাপাশি ইকো-সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) সহায়তায় রেইজ প্রকল্পের প্রশিক্ষণ।
সীমার বিয়ে হয় ২০২১ সালে ওই এলাকার বাসিন্দা উজ্জ্বল ওরাওয়ের সঙ্গে। পেশায় বিদ্যুৎ মেকানিক উজ্জ্বলের সঙ্গে সংসারে আছেন তাদের এক সন্তান এবং বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ি। সব মিলিয়ে পাঁচ সদস্যের পরিবার। বিয়ের পর সংসারে এসে সীমা বুঝতে পারেন, শুধু স্বামীর আয় দিয়ে পরিবারের সব খরচ চালানো সহজ নয়। পরিবারের সদস্য বেশি, কিন্তু আয় সীমিত। তাই সংসারের পাশে দাঁড়াতে তিনিও কাজে নামেন। মাঠের কাজই ছিল তার প্রধান ভরসা। ধান রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, ফসল কাটা যে কাজ মিলত, সেটিই করতেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অন্যের জমিতে কাজ করে পাওয়া মজুরি তুলে দিতেন সংসারে।

জীবনের সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেই একদিন নতুন একটি সুযোগের কথা জানতে পারেন সীমা। একটি কমিউনিটি আউটরিচ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তিনি জানতে পারেন, কায়িক শ্রমের পাশাপাশি কারিগরি দক্ষতা অর্জন করে নিজের আয় করার সুযোগ রয়েছে। ইএসডিওর সহায়তায় রেইজ প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার পর সেই সুযোগ আসে তার সামনে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ইএসডিও যুক্ত রয়েছে এবং সহযোগিতায় রয়েছে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন।
প্রকল্পটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো Apprenticeship বা গুরু-শিষ্য পদ্ধতি। এতে শুধু শ্রেণিকক্ষে তাত্ত্বিক শিক্ষা নয়, একজন অভিজ্ঞ কারিগরের তত্ত্বাবধানে বাস্তব কর্মপরিবেশে হাতে-কলমে কাজ শেখার সুযোগ পান প্রশিক্ষণার্থীরা। সীমা নিজের আগ্রহ অনুযায়ী বেছে নেন ‘ফ্যাশন গার্মেন্টস ড্রেস মেকিং অ্যান্ড টেইলারিং’ ট্রেড। ছয় মাসের প্রশিক্ষণে তার ওস্তাদ ছিলেন মোছা. হাসনা বানু ময়না। প্রশিক্ষণের শুরুতে সেলাইয়ের অনেক কাজই সীমার কাছে নতুন ছিল। প্রশিক্ষণ শেষে সীমা আর আগের জীবনে ফিরে যাননি। ইএসডিওর ঋণ সহায়তায় নিজেই সেলাই মেশিন কিনেন।
সীমার এই পরিবর্তন শুধু পরিবারের মানুষই দেখেননি, দেখেছেন প্রতিবেশীরাও।
এক প্রতিবেশী ঢাকা পোস্টকে বলেন, সীমাকে আমরা অনেক দিন ধরেই চিনি। আগে প্রায় প্রতিদিনই তাকে মাঠে কাজ করতে যেতে দেখতাম। সংসারে অভাব ছিল, তাই কাজ না করে তার উপায়ও ছিল না। রোদ-বৃষ্টি কিছুই তাকে থামাতে পারত না। এখন তাকে আর আগের মতো মাঠে যেতে হয় না। নিজের ঘরে বসেই কাজ করেন। সেলাই শিখে যে নিজের সংসারে এতটা সহযোগিতা করতে পারছেন, এটা আমাদের জন্যও আনন্দের বিষয়।
আরেক প্রতিবেশী ঢাকা পোস্টকে বলেন, মেয়েটার মধ্যে কাজ করার আগ্রহ আগে থেকেই ছিল। সুযোগ পেলে সে কিছু করতে পারবে, সেটা বোঝা যেত। কিন্তু সুযোগ কোথায়? পরে প্রশিক্ষণের সুযোগ পাওয়ার পর সে সেটা কাজে লাগিয়েছে। এখন নিজের হাতে সেলাই করে আয় করছে। আমাদের গ্রামের অন্য মেয়েরাও যদি এমন প্রশিক্ষণের সুযোগ পায়, তাহলে তারাও নিজেদের সংসারে অবদান রাখতে পারবে।
এক নারী প্রতিবেশী ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের মতো আদিবাসী নারীদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, ঘরের কাজ সামলে বাইরে গিয়ে নিয়মিত কাজ করা কঠিন। সীমা সেলাইয়ের কাজ শিখে ঘরে বসে আয় করার একটা পথ তৈরি করেছেন। এতে সংসারও সামলাতে পারছেন, আবার নিজের আয়ও হচ্ছে। তার কাছ থেকে অন্যরাও উৎসাহ পাচ্ছেন।
সীমার পরিবর্তনে সবচেয়ে কাছের মানুষ হিসেবে গর্বিত তার স্বামী উজ্জ্বল ওরাও। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, বিয়ের পর থেকেই দেখেছি, সংসারে অভাব ছিল। আমার একার আয়ে সবকিছু সামলানো কঠিন হয়ে পড়ত। সীমাও তখন মাঠে কাজ করতে যেত। অনেক সময় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করে বাড়ি ফিরত। শরীর ক্লান্ত হয়ে গেলেও সংসারের জন্য পরদিন আবার কাজে যেতে হতো। একদিন কাজ না হলে সংসারে তার প্রভাব পড়ত।
তিনি আরও বলেন, সীমার সব সময়ই নিজের কিছু করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু কী করবেন, কোথা থেকে শুরু করবেন তা বুঝতে পারতেন না। ইএসডিওর মাধ্যমে রেইজ প্রকল্পের প্রশিক্ষণের সুযোগ পাওয়ার পর তার মধ্যে পরিবর্তন আসে। সেলাইয়ের কাজ শেখার প্রতি ওর খুব আগ্রহ ছিল। প্রশিক্ষণ থেকে ফিরে এসে বাড়িতেও নিয়মিত অনুশীলন করত। ধীরে ধীরে কাজটা ভালোভাবে শিখে নেয়।
সীমা মিনজি ঢাকা পোস্টকে বলেন, একদিন কমিউনিটি আউটরিচের একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে জানতে পারি, প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজের কাজ করা যায়। তখন মনে হলো, আমি যদি একটা কাজ ভালোভাবে শিখতে পারি, তাহলে হয়তো আর প্রতিদিন মাঠে কাজ করতে হবে না। সেই ইচ্ছা থেকেই রেইজ প্রকল্পের প্রশিক্ষণে ভর্তি হই। ইএসডিও আমাকে এই সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেছে।
তিনি আরও বলেন, ছয় মাসের প্রশিক্ষণে অনেক কিছু শিখেছি। শুরুতে সেলাইয়ের কাজ কঠিন মনে হলেও পরে ধীরে ধীরে সব শিখে ফেলি। এখন নিজের হাতে কাজ করে মাসে ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারি। এই আয় দিয়ে সংসারে সহযোগিতা করতে পারছি, সন্তানের জন্য খরচ করতে পারছি। আগের জীবনের সঙ্গে বর্তমানকে মিলিয়ে দেখলে নিজের মধ্যেই যেন নতুন এক সীমাকে দেখতে পান তিনি। সুযোগ পেলে অন্য মেয়েদেরও সেলাই শেখাতে চাই। ইএসডিও ও রেইজ প্রকল্পের মাধ্যমে যে সুযোগ পেয়েছি, সেটি আমার জীবনের জন্য অনেক বড় পাওয়া। আমি চাই, আমার মতো আরও যেসব নারী কষ্ট করে সংসার চালাচ্ছেন, তারাও যেন এমন সুযোগ পান।
ইকো-সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) সহায়তায় বাস্তবায়িত রেইজ প্রকল্পের ফিল্ড কোঅর্ডিনেটর সামসুত তাবরিজ ঢাকা পোস্টকে বলেন, সীমা মিনজির মতো নারীদের জন্য কারিগরি দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করাই রেইজ প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। শুধু প্রশিক্ষণ দেওয়াই নয়, প্রশিক্ষণ শেষে তারা যেন সেই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আয় করতে পারেন, সেদিকেও আমরা গুরুত্ব দিই। সীমা প্রশিক্ষণ নিয়ে সেলাইয়ের কাজ শুরু করে এখন নিজের সংসারে অবদান রাখছেন এটি আমাদের জন্যও আনন্দের বিষয়।
তিনি আরও বলেন, বিশেষ করে গ্রামীণ ও আদিবাসী নারীরা যদি ঘরে বসে আয় করার মতো দক্ষতা অর্জন করতে পারেন, তাহলে তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি পরিবারের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। আমরা চাই, সীমার মতো আরও নারীরা প্রশিক্ষণের সুযোগ নিয়ে নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে স্বাবলম্বী হয়ে উঠুন।
এএমকে
