সাতক্ষীরা সদর থেকে কালিগঞ্জ হয়ে শ্যামনগর পর্যন্ত প্রায় ৬২ কিলোমিটার সড়ক এখন যেন মরণফাঁদ। সংস্কারকাজের ধীরগতিতে অধিকাংশ স্থানে সৃষ্টি হয়েছে ছোট-বড় খানাখন্দ। ঝুঁকিপূর্ণ এ পথে প্রতিদিনই চলছে যানবাহন, ঘটছে দুর্ঘটনা। এতে ভোগান্তিতে পড়ছেন কয়েক লাখ মানুষ। ব্যাহত হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থা, চিংড়ি ও বিভিন্ন মাছ পরিবহন এবং সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন।
সাতক্ষীরার অন্যতম আকর্ষণ সড়কপথে সুন্দরবন ভ্রমণ। কিন্তু সুন্দরবনে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটি দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় যাত্রী ও চালক উভয়কেই চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। একইসঙ্গে জেলা শহর থেকে দেবহাটা, কালিগঞ্জ ও শ্যামনগরে যাতায়াতের প্রধান সড়ক হিসেবেও এটি গুরুত্বপূর্ণ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সাতক্ষীরা-ভেটখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের কালিগঞ্জ ও শ্যামনগর অংশের বিভিন্ন স্থানে রাস্তা কেটে রাখা হয়েছে। কোথাও বড় বড় গর্ত, কোথাও কাদা ও পানি জমে আছে। বৃষ্টির সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। এসব খানাখন্দে যানবাহন আটকে যাচ্ছে, আবার কখনো উল্টে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটছে।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সাতক্ষীরা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরা থেকে ভেটখালী পর্যন্ত এই আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণে বরাদ্দ রয়েছে ৮২২ কোটি টাকা। দুই বছর আগে প্রকল্প শুরু হলেও বন্ধ থাকে, এরপর ২০২৫ সালের অক্টোবরে মহাসড়কটির নির্মাণকাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। চলতি বছরের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। ৬২ কিলোমিটার সড়কের নির্মাণকাজ দেওয়া হয়েছে পাঁচটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সংস্কারকাজের ধীরগতির কারণে সড়কের দুর্ভোগ দিন দিন বাড়ছে। প্রতিদিনই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলাচল করায় যাত্রীদের পাশাপাশি চালকরাও আতঙ্কে থাকেন। দীর্ঘ সময় ধরে সড়কের এমন অবস্থার কারণে কয়েক লাখ মানুষের স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসচালক আব্দুর রউফ বলেন, এই রাস্তায় গাড়ি চালানো মানেই জীবন বাজি রাখা। প্রতিদিন কোনো না কোনো গাড়ি কাদায় আটকে যাচ্ছে বা দুর্ঘটনা ঘটছে। গাড়ি মেরামতের পেছনে অতিরিক্ত টাকা খরচ হচ্ছে। দ্রুত সড়কটি ঠিক করা না হলে গাড়ি চালানো কঠিন হয়ে যাবে।
শ্যামনগরের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, রাস্তার যে অবস্থা, সুস্থ মানুষও এ পথে চলাচল করলে অসুস্থ হয়ে পড়বে। আশঙ্কাজনক কোনো রোগীকে এভাবে হাসপাতালে নেওয়া খুবই কঠিন। সংস্কারের নামে আমাদের এভাবে দুর্ভোগে রাখার কোনো মানে হয় না।
শুধু মানুষের যাতায়াত নয়, সড়কের বেহাল দশার প্রভাব পড়ছে উপকূলীয় অর্থনীতিতেও। সাতক্ষীরা-শ্যামনগর উপকূলীয় অঞ্চলে উৎপাদিত চিংড়ি ও বিভিন্ন প্রজাতির মাছ সময়মতো ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছাতে পরিবহনকারীদের বেগ পেতে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় লাগার পাশাপাশি পণ্য পরিবহনে বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।
জেলা চিংড়ি পোনা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ডা. আবুল কালাম বাবলা বলেন, সাতক্ষীরার চিংড়ি শিল্পের জন্য এই সড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে চিংড়ি পোনা ও মাছ পরিবহনে সময় বেশি লাগছে, পরিবহন খরচও বেড়ে যাচ্ছে। এতে ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। দ্রুত সড়কটির সংস্কারকাজ শেষ করে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যোগাযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, ভাঙাচোরা সড়কের কারণে চিংড়ি ও মাছ পরিবহনে সময় ও ব্যয় দুটোই বেড়েছে। যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং পথে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকায় পরিবহন খরচও বেড়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে ব্যবসার ওপর।
একইসঙ্গে সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সাতক্ষীরা থেকে সড়কপথে সুন্দরবন ভ্রমণের অন্যতম প্রবেশপথ শ্যামনগর। কিন্তু সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে অনেক পর্যটক আগ্রহ হারাচ্ছেন বলে স্থানীয় পর্যটনসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এতে স্থানীয় হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও অন্যান্য ব্যবসার ওপরও প্রভাব পড়ছে।
কালিগঞ্জের স্থানীয় ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর হোসেন ও সাইফুল ইসলাম বলেন, সড়কটি এই অঞ্চলের মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিংড়ি ও মাছ পরিবহনের পাশাপাশি সুন্দরবনে পর্যটক আসার ক্ষেত্রেও এই সড়কের গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু সড়কের অবস্থা এতটাই খারাপ যে ব্যবসায়ীদের বাড়তি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। দ্রুত সংস্কারকাজ শেষ না হলে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
শ্যামনগর উপজেলার স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন পর আমাদের এই সড়কটি নির্মাণ হচ্ছে। এখন যদি কাজের মধ্যে আবারও কোনো ধরনের অনিয়ম করা হয়, তাহলে এই সড়ক বেশিদিন টিকবে না। এটি শ্যামনগরবাসীর সাতক্ষীরা শহরে যাতায়াতের প্রধান সড়ক। সড়কটি টেকসইভাবে নির্মাণ করা না হলে কয়েক বছরের মধ্যেই আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের দাবি, নির্মাণকাজের মান কঠোরভাবে তদারকি করে সড়কটি ভালোভাবে নির্মাণ করা হোক।
সাতক্ষীরা-ভেটখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের দৈর্ঘ্য ৬২ কিলোমিটার। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সড়কটির বিভিন্ন অংশ আগে থেকেই খানাখন্দে ভরা ছিল। পরে সড়কটি নির্মাণ ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
কাজের অগ্রগতি নিয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগের সাতক্ষীরা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার পারভেজ বলেন, বিভিন্ন জটিলতার কারণে ২০২৫ সালের অক্টোবরে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কাজের মেয়াদ ছিল দুই বছর ১১ মাস। অথচ বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় প্রায় দুই বছর সময় নষ্ট হয়েছে। ১১ মাসে আমাদের কাজের অগ্রগতি ৩২ শতাংশ। এর মধ্যে বৈদ্যুতিক পোলের কারণে ২ ও ৩ নম্বর প্যাকেজের কাজের অগ্রগতি হচ্ছে না। চলতি বছরের জুনে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও তা শেষ হয়নি। আশা করছি, ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে সমুদয় কাজ শেষ হবে। কাজ নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে।
নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে নির্মাণকাজে নিয়োজিত এমডি মাঈনুদ্দীন লিমিটেডের প্রকল্প পরিচালক রবিউল ইসলাম বলেন, আমরা যখন কোনো সামগ্রী আনি, তখন সেটার উৎস অনুমোদিত থাকে। এ ছাড়া নির্মাণসামগ্রী পরীক্ষা করে আনা হয়। অনিয়ম করার কোনো সুযোগ নেই।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের সংস্কারকাজ দ্রুত শেষ করতে হবে। পাশাপাশি নির্মাণকাজ চলাকালে যেসব অংশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে, সেগুলো দ্রুত চলাচলের উপযোগী করার ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের মতে, সড়কটি নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন না হলে উপকূলের মানুষের যোগাযোগ, চিংড়ি ও মাছ পরিবহন এবং সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন সব ক্ষেত্রেই ক্ষতির প্রভাব আরও বাড়বে।
এএমকে
