বিজ্ঞাপন

রয়েছে জমি-জনবল ও অনুমোদন

দুই দশকেও গড়ে ওঠেনি হাসপাতাল, বাবুগঞ্জের নির্ধারিত জমিতে ধানখেত

দুই দশকেও গড়ে ওঠেনি হাসপাতাল, বাবুগঞ্জের নির্ধারিত জমিতে ধানখেত

হাসপাতাল নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। অনুমোদন পেয়েছে জনবল কাঠামোও। সরকারি নথিতে রয়েছে ২০ শয্যার হাসপাতালের প্রকল্প। কিন্তু দুই দশক পেরিয়ে গেলেও হাসপাতাল ভবনের কোনো অস্তিত্ব নেই।

বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার ফায়ার সার্ভিস স্টেশন-সংলগ্ন ওলানকাঠিতে হাসপাতালের জন্য নির্ধারিত জায়গায় এখন দিগন্তজোড়া ধানখেত।

২০০৬ সালে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবা সহজ করতে ওলানকাঠিতে ২০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার। এ জন্য প্রায় তিন একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ২০১০ সালে জমিটি সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। 

হাসপাতালের জন্য ২৩টি পদের জনবল কাঠামোও অনুমোদন করা হয়েছিল। তবে এরপরও শুরু হয়নি নির্মাণকাজ।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, হাসপাতাল নির্মাণ হবেএই আশায় অনেক কৃষক তাদের জমি সরকারকে দিয়েছেন। জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণও পেয়েছেন, কিন্তু দীর্ঘদিনেও হাসপাতাল না হওয়ায় হতাশ তারা।

স্থানীয় কৃষক কামাল হাওলাদার জানান, হাসপাতাল হবে শুনেই তারা জমি দিয়েছিলেন। কিন্তু ২০ বছরেও সেখানে কোনো ভবন হয়নি। এখন ওই জমিতে ধান চাষ হচ্ছে।

সরকারি নথি অনুযায়ী, ওলানকাঠি ২০ শয্যার হাসপাতাল প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ ও জনবল কাঠামো অনুমোদনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দাপ্তরিক ওয়েবসাইটেও প্রকল্পটির উল্লেখ রয়েছে। তবে বাস্তবে হাসপাতাল নির্মাণের কোনো চিহ্ন নেই।

চিকিৎসার নিতে যেতে হয় দূরে

ওলানকাঠি ও আশপাশের এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল, স্থানীয়ভাবে হাসপাতাল হলে সহজেই চিকিৎসাসেবা পাওয়া যাবে। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি দেহেরগতি ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামে হওয়ায় উপজেলা সদরসহ বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষের যেতে নদী পার হতে হয়। আর উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে যেতে হয় প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে বরিশাল শহরে। জরুরি রোগীদের ক্ষেত্রে এতে দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।

স্থানীয় শিক্ষক আজিজুল হক বলেন,  ওলানকাঠিতে হাসপাতাল চালু হলে শুধু ওই এলাকার মানুষ নয়, আশপাশের কয়েকটি ইউনিয়নের বাসিন্দারাও উপকৃত হতেন। রাজনৈতিক কারণে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি নদীর ওপার থাকায় উপজেলা সদরের মানুষ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। 

বাবুগঞ্জ উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আল আমিন বলেন, ওলানকাঠী ২০ শয্যা হাসপাতালটি সাবেক এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের চেষ্টায় অনুমোদন হয়ছিল। দীর্ঘ ১৭ বছর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন হাসপাতালটির কোনো অগ্রগতি হয়নি। বর্তমান এমপি জনাব অ্যাড. জয়নুল আবেদীন হাসপাতালের নির্ধারিত স্থান পরিদর্শন করেছেন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন। 

একই সময়ে অনুমোদিত হাসপাতাল চালু

ওলানকাঠি হাসপাতাল নির্মাণে দীর্ঘসূত্রতার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় একই সময়ে নেওয়া অন্য একটি প্রকল্পের বাস্তবায়ন দেখে।

২০০৬ সালে বরিশাল জেলায় দুটি ২০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এর একটি বানারীপাড়া উপজেলার চাখারে নির্মাণ শেষে চালু হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে নেওয়া বাবুগঞ্জের ওলানকাঠি হাসপাতাল এখনো নির্মাণের অপেক্ষায়।

একই সময়ের একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়ে মানুষকে চিকিৎসাসেবা দিলেও অন্যটির জন্য অধিগ্রহণ করা জমি দুই দশক ধরে পড়ে আছে। এ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

স্বাস্থ্য প্রকৌশলী যা বললেন

হাসপাতাল নির্মাণের বিষয়ে বরিশাল স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুল আলম বলেন, ওলানকাঠি ২০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের বিষয়টি পঞ্চম ওপিটিতে (অপারেশনাল প্ল্যান অ্যান্ড বাজেট) অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু ওই ওপিটি অনুমোদন না হওয়ায় নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে প্রকল্পটি অনুমোদিত হলেই নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হবে।

তবে ২০০৬ সালে নেওয়া একটি প্রকল্পের জন্য এত বছরেও প্রয়োজনীয় অনুমোদন না পাওয়ার কারণ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. রেফায়েতুল হায়দার জানান, ওলানকাঠি ২০ শয্যার হাসপাতাল প্রকল্পের বিষয়ে তিনি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করবেন।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। কীভাবে এই স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানটি করা যায়, সে বিষয়ে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।

দুই দশকের অপেক্ষা

২০০৬ সালে হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ, প্রায় তিন একর জমি অধিগ্রহণ, ২০১০ সালে জমি সরকারের কাছে হস্তান্তর এবং ২৩টি পদের জনবল কাঠামো অনুমোদন—সবই হয়েছে। সরকারি নথিতেও প্রকল্পটির অস্তিত্ব রয়েছে। শুধু নির্মাণ হয়নি হাসপাতাল।

দুই দশক ধরে অপেক্ষায় থাকা ওলানকাঠির মানুষের এখন একটাই প্রশ্ন—আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে?

প্রশাসনিক জটিলতা বা অনুমোদনের কারণে যে অবস্থাতেই প্রকল্পটি আটকে থাকুক, দ্রুত তা অনুমোদন করে নির্মাণকাজ শুরু করা হোক বলে স্থানীয় সাধারণ মানুষ দাবি জানিয়েছেন। হাসপাতালের জন্য জমি দেওয়া মানুষ এখন আর প্রতিশ্রুতি নয়, নিজেদের দেওয়া জমিতে একটি হাসপাতাল দেখতে চান।

এএমকে