কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার চরটেকী গ্রামে বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডারে শিক্ষকতা ও ব্যাংকের ভালো পদে চাকরি ছেড়ে সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে তুলেছেন ইখতেয়ার উদ্দিন আহমেদ মুন্না নামের এক যুবক উদ্যোক্তা। মাছ চাষ, মুরগি পালন, ষাঁড় গরু মোটাতাজাকরণ ও ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন— এই ৪ খাতকে একসঙ্গে নিয়ে গড়ে তুলেছেন ‘এমএম এগ্রো’ নামের এক সমন্বিত কৃষি খামার।
নিরাপদ চাকরি ছেড়ে নিজের সব পুঁজি খামারে বিনিয়োগ করেছেন ইখতেয়ার। সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে তুলতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে অভিজ্ঞতা ও কৌশল আয়ত্ত করেছেন তিনি। প্রায় দুই বছর পর এখন তার উদ্যোগে সাফল্যের ছাপ দেখা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ‘এমএম এগ্রো’র কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়েছে উপজেলাজুড়ে।
গ্রামের বেকার ও শিক্ষিত তরুণদের কাছেও খামারটি হয়ে উঠেছে অনুপ্রেরণার জায়গা। অনেকেই তার কাছ থেকে সমন্বিত কৃষি খামার পরিচালনার কৌশল শিখতে আগ্রহী হচ্ছেন।
স্থানীয় কৃষি বিভাগ বলছে, সমন্বিত কৃষি খামারটি গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাদের মতে, সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থাপনা বর্তমান সময়ে একটি টেকসই ও লাভজনক মডেল। এমএম এগ্রো শুধু একটি খামার নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করার একটি কার্যকর উদ্যোগ। এ উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হলে গ্রামীণ অর্থনীতির পাশাপাশি দেশের কৃষি খাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সরেজমিনে চরটেকী গ্রামের এমএম এগ্রো ঘুরে দেখা গেছে, মাছ চাষ, মুরগি পালন, ষাঁড় গরু মোটাতাজাকরণ ও ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন চলছে একসঙ্গে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে স্থানীয় বাজারে কৃষিপণ্য সরবরাহের পাশাপাশি কয়েকজন বেকার যুবকের কর্মসংস্থানও হয়েছে। ফলে খামারটি এলাকায় একটি সম্ভাবনাময় কৃষি উদ্যোগ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

মাছ চাষের পাশাপাশি খামারে ফাওমি জাতের মুরগি পালন করা হচ্ছে। খামারে প্রায় ২ হাজার ফাওমি মুরগি রয়েছে। উন্নত ব্যবস্থাপনার কারণে এসব মুরগি থেকে নিয়মিত ডিম ও মাংস উৎপাদন হচ্ছে, যা স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখছে।
প্রত্যন্ত গ্রামীণ পরিবেশে গড়ে ওঠা এমএম এগ্রোতে রয়েছে ৪টি আধুনিক ফিশারি। সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করা হচ্ছে। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মাছ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে ইতোমধ্যে সাফল্য পেয়েছে খামারটি। মাছ চাষের পাশাপাশি খামারে প্রায় ২ হাজার ফাওমি জাতের মুরগি পালন করা হচ্ছে। উন্নত ব্যবস্থাপনায় এসব মুরগি থেকে নিয়মিত ডিম ও মাংস উৎপাদন হচ্ছে, যা স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখছে।
এছাড়া খামারে অর্গানিক পদ্ধতিতে ষাঁড় গরু পালন ও মোটাতাজাকরণ করা হচ্ছে। গরুর খাবারের জন্য খামারের নিজস্ব জমিতে ঘাস চাষ করা হয়। নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করে বছরজুড়ে গবাদিপশু পালনের মাধ্যমে আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছেন উদ্যোক্তা।
সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে খামারে উৎপাদন করা হচ্ছে ভার্মি কম্পোস্ট। গবাদিপশুর বর্জ্য ও বিভিন্ন জৈব উপাদান ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব এই সার তৈরি করা হচ্ছে। এতে একদিকে খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সহজ হচ্ছে, অন্যদিকে জৈব সার উৎপাদনের মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে বাড়তি আয়ের সুযোগ।
উদ্যোক্তা জানান, বর্তমানে খামারটিকে প্রতি মাসে প্রায় ৩০ টন ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনের সক্ষমতায় গড়ে তোলা হচ্ছে। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে শিগ্গিরই এটিকে পুরোপুরি বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইখতেয়ার উদ্দিন আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিন ব্যাংকে চাকরি করলেও নিজের এলাকায় কিছু করার ইচ্ছা থেকেই এই উদ্যোগ নিয়েছেন। শুরুতে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হলেও ধৈর্য, পরিকল্পনা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার তাকে সফলতার পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।
তিনি বলেন, ‘শুধু নিজের জন্য নয়, গ্রামের মানুষের জন্যও কিছু করতে চেয়েছিলাম। আমার বিশ্বাস, কৃষিকে আধুনিকভাবে পরিচালনা করলে এটি লাভজনক খাতে পরিণত করা সম্ভব।’

ভবিষ্যতে খামারের পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, মাছ, গবাদিপশু ও পোলট্রির পাশাপাশি নতুন কৃষিভিত্তিক প্রকল্প যুক্ত করে আরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চান। খামারটিতে বর্তমানে এলাকার কয়েকজন বেকার যুবক নিয়মিত কাজ করছেন। কেউ মাছের পরিচর্যা, কেউ গরু-মুরগির দেখভাল আবার কেউ ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনে যুক্ত রয়েছেন। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং অনেক তরুণ কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা হওয়ার বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
ইখতেয়ারের বড় ভাই ইলিয়াস উদ্দিন চুন্নু বলেন, আমার ছোট ভাই বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডারে শিক্ষকতা করেছে এবং পরে দীর্ঘদিন ব্যাংকে ভালো পদে চাকরি করেছে। নিরাপদ চাকরি ছেড়ে প্রত্যন্ত গ্রামে তার এই উদ্যোগকে আমরা পরিবারের পক্ষ থেকে সমর্থন করি। তার সফলতা দেখে এলাকার অনেক তরুণ এখন কৃষি ও খামারভিত্তিক ব্যবসায় আগ্রহী হচ্ছেন।
পাকুন্দিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূরে-ই-আলম বলেন, বছর দুয়েক আগে ওই খামারি আমার কাছে পরামর্শ নিতে এসেছিলেন। তাকে সমন্বিত কৃষি সম্পর্কে হাতে-কলমে ধারণা নিতে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখার পরামর্শ দিয়েছিলাম। পরে তিনি বিভিন্ন খামার ঘুরে এসে এখন সফলভাবে সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে তুলেছেন।
তিনি বলেন, সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো একটি খাতের উৎপাদিত উপকরণ অন্য খাতে ব্যবহার করা যায়। এতে উৎপাদন খরচ কমে, সম্পদের অপচয় কমে এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এমএম এগ্রো একটি সম্ভাবনাময় মডেল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করার পাশাপাশি বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও খামারটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সাখাওয়াত হোসেন হৃদয়/এমএমবি
