খাগড়াছড়ির পাহাড়ে দিন দিন বাড়ছে কচুরমুখী চাষ। জেলার মাটিরাঙ্গা, পানছড়ি, গুইমারা, রামগড় ও মানিকছড়ি উপজেলায় এ চাষের বিস্তার সবচেয়ে বেশি। গত কয়েক বছর ধরে খাগড়াছড়ি সদরের সর্বোচ্চ উঁচু পাহাড় আলুটিলাতেও কচুরমুখী চাষ করা হচ্ছে। কৃষকদের জন্য এটি একটি অর্থকরী ফসল হলেও উঁচু পাহাড়ের বনজঙ্গল পরিষ্কার করে চাষাবাদ করায় মাটির ক্ষয়, বন উজাড়, জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষি ও বন বিভাগের কর্মকর্তারা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর খাগড়াছড়িতে প্রায় ৮৪৫ হেক্টর পাহাড়ি জমিতে কচুরমুখি চাষ হয়েছে। গত বছর এ পরিমাণ ছিল ৭৮০ হেক্টর এবং তার আগের বছর ৭৪০ হেক্টর। অর্থাৎ তিন বছরের ব্যবধানে কচুরমুখী চাষের জমি বেড়েছে ১০৫ হেক্টর। তবে স্থানীয় কৃষক ও বাসিন্দাদের দাবি, সরকারি হিসাবের চেয়ে বাস্তবে চাষের পরিমাণ আরও বেশি।
পাহাড়ে সাধারণত ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে বনজঙ্গল পরিষ্কার করে আগুন দিয়ে জমি প্রস্তুত করা হয়। এরপর পাহাড়ের মাটি কুপিয়ে কচুরমুখির জন্য জমি তৈরি করা হয়। এপ্রিল মাসে বৃষ্টি শুরু হলে বীজ বপন করা হয়। পরিচর্যা শেষে আগস্টের শেষ দিকে বাজারজাত শুরু করেন কৃষকেরা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, জুম চাষের তুলনায় কচুরমুখী চাষে পাহাড়ের মাটির ওপর চাপ বেশি পড়ে। কারণ চাষের আগে পাহাড়ের মাটি গভীরভাবে কুপিয়ে ঝুরঝুরে করা হয় এবং গাছের গোড়ায়ও মাটি তুলে দিতে হয়। ফলে বৃষ্টির পানিতে সহজেই উপরিভাগের উর্বর মাটি ধুয়ে ছড়া-ঝিরিতে গিয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন একই জায়গায় চাষ করার ফলে মাটির উর্বরতাও কমে যাচ্ছে।
ঝর্ণাটিলা এলাকার কচুরমুখী চাষি মো. আবুল কালাম জানান, চলতি বছর তিনি পাঁচ একর পাহাড়ি জমিতে কচুরমুখি চাষ করেছেন। এতে তার প্রায় দুই লাখ টাকা খরচ হয়েছে।
তিনি বলেন, কোনো বছর কচু চাষ করে লাভ হয়, আবার কোনো বছর পুঁজিও ওঠে না। পাহাড় পরিষ্কার করা, মাটি কুপিয়ে জমি তৈরি, বীজ, সার, কীটনাশক ও পরিচর্যায় খরচ অনেক বেশি।
মরাটিলা এলাকার কৃষক কমল ত্রিপুরা এবার দুই একর পাহাড়ে কচুরমুখী চাষ করেছেন। গত বছর সাড়ে তিন একর জমিতে চাষ করলেও বিক্রি করে পুঁজি তুলতে পারেননি। বিকল্প আয়ের সুযোগ না থাকায় ধারদেনা করে এবারও চাষে নেমেছেন তিনি।

কমল ত্রিপুরা বলেন, একই পাহাড়ে বারবার চাষ করায় এবার আগের চেয়ে বেশি সার দিতে হয়েছে। বাজারে আলুর দাম কম থাকায় কচুরমুখীর ভালো দাম পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়েও শঙ্কায় রয়েছেন তিনি। পাহাড়ের মাটিতে কচু চাষের কারণে বন ও পরিবেশের ক্ষতি সম্পর্কে তার ধারণা নেই বলেও জানান।“চাষ না করলে খাবো কী করে” বলেন এই কৃষক।
স্থানীয় বাসিন্দা মনির হোসেন বলেন, একসময় এ এলাকায় প্রচুর বন্যপ্রাণী ছিল। ২০০৭-০৮ সালের দিকেও আমাদের এখানের পাহাড়ের বনে অসংখ্য হরিণ, বনমোরগ দেখা যেত। ছিল বানরসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী। পাহাড়জুড়ে ছিল নানা প্রজাতির বাঁশ ও গাছপালা।
তার ভাষ্য, মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে পাহাড়ের চিত্র বদলে গেছে। বনজঙ্গল অনেকটাই উধাও হয়ে গেছে। বিরাশী টিলা, ঝর্ণাটিলার উঁচু স্থান থেকে তাকালে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে সারি সারি পাহাড় দেখা গেলেও সেসব পাহাড়ে আগের মতো বনজসম্পদ নেই।
খাগড়াছড়ি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাসির উদ্দীন চৌধুরী বলেন, চলতি বছর জেলায় প্রায় সাড়ে আটশ হেক্টর পাহাড়ি জমিতে কচুরমুখী চাষ হয়েছে। আবহাওয়া ও মাটি কচু চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় কৃষকেরা এ ফসল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
তবে উঁচু পাহাড়ে কচু চাষে কৃষি বিভাগ নিরুৎসাহিত করে জানিয়ে তিনি বলেন, সাধারণত সামান্য ঢালু জায়গায় কচু চাষের পরামর্শ দেওয়া হয়, যাতে মাটির ক্ষয় কম হয়।
তিনি বলেন, কচু চাষের জন্য মাটি কুপিয়ে বীজ বপন করতে হয়। গাছের গোড়ায় মাটি তুলে দিতে হয়। এতে মাটি ক্ষয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে উঁচু পাহাড়ের মাটি বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে ছড়া ও ঝিরিতে গিয়ে পড়ে। এতে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
খাগড়াছড়ি বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ফরিদ মিঞা বলেন, জেলার উঁচু পাহাড়গুলোতে বর্তমানে কচুরমুখিসহ বিভিন্ন ধরনের চাষাবাদ হচ্ছে। এসব পাহাড়ের বনজঙ্গল পরিষ্কার করার কারণে মাটি ধসের প্রবণতা বেড়েছে।
তিনি বলেন, পাহাড়ের উপরিভাগের উর্বর মাটি বা টপ সয়েল সরে যাওয়ায় মাটির শক্তি ও উর্বরতা কমছে। ফলে পরবর্তী সময়ে ওই জমির ফসল উৎপাদন ক্ষমতাও হ্রাস পাচ্ছে।
বন কর্মকর্তা বলেন, মূলত উঁচু পাহাড়গুলো বনায়নের জন্য উপযুক্ত। মধ্যম উচ্চতার পাহাড়ে ফলজ বাগান এবং অপেক্ষাকৃত সমতল ভূমিতে কৃষি ফসল চাষ করা প্রয়োজন। এভাবে ভূমির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে পাহাড়ের বন ও পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব হবে।
তার মতে, পাহাড়ে পরিকল্পিতভাবে বনায়ন ও কৃষি কার্যক্রম পরিচালনা করা গেলে শুধু মানুষের জীবন-জীবিকা নয়, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলও রক্ষা করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে পাহাড়ের সবুজ প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্যও বজায় থাকবে।
কৃষি ও বন বিভাগের কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং স্থানীয়দের অভিজ্ঞতা বলছে, কচুরমুখী চাষ পাহাড়ি মানুষের আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠলেও উঁচু পাহাড়ের বনজঙ্গল পরিষ্কার করে এ চাষের বিস্তার দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই কৃষকের জীবিকা ও পরিবেশ সংরক্ষণ দুই দিক বিবেচনায় নিয়ে পাহাড়ের ভূমি ব্যবহারে কার্যকর পরিকল্পনা ও নজরদারি জরুরি হয়ে পড়েছে।
মোহাম্মদ শাহজাহান/আরকে
