বিজ্ঞাপন

রাজবাড়ীতে ডাকঘরের কোটি টাকা আত্মসাৎ, সামনে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

রাজবাড়ীতে ডাকঘরের কোটি টাকা আত্মসাৎ, সামনে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে গ্রাহকদের আমানতের কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের ঘটনায় সামনে এসেছে নতুন চাঞ্চল্যকর তথ্য। কোটি টাকা আত্মসাতের পেছনে ওই সময়ের পোস্ট মাস্টার বিকাশ চন্দ্রসহ আরও দুইজন জড়িত আছে বলে স্বীকার করেছেন পলাতক লেটার রাইটার শিহাব মৃধা। সম্প্রতি শিহাব মৃধা মোবাইলে তার এলাকার মূলঘর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য আব্দুল হান্নান মন্ডলের কাছে এ তথ্য প্রকাশ করেন।

এছাড়াও একই ইউপি সদস্যর কাছে আত্মসাতের অর্থের একটি অংশ ফেরত দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন সাবেক পোস্ট মাস্টার বিকাশ চন্দ্র। পোস্ট মাস্টার বিকাশ চন্দ্র তার শ্বশুরকে দিয়ে রাজবাড়ী সদর উপজেলার মূলঘর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মো. আব্দুল হান্নান মন্ডলকে মোবাইলে ফোন করে ২০ লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন বলে জানা গেছে।

মূলঘর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মো. আব্দুল হান্নান মন্ডল বলেন, রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে গ্রাহকদের টাকা আত্মসাতের বিষয়টি জানার পর খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, রাজবাড়ী ডাকঘরের অভিযুক্ত লেটার রাইটার শিহাব মৃধা আমার ওয়ার্ডের বাসিন্দা। আমি বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজখবর নিই। বর্তমানে শিহাব মৃধা পলাতক রয়েছে।

তিনি বলেন, সম্প্রতি হঠাৎ একটি অপরিচিত নম্বর থেকে শিহাব আমাকে ফোন করেন। তখন আমি তাকে ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত বলতে বলি। শিহাব আমাকে জানায়, পোস্ট অফিসের টাকা নেওয়ার দায়িত্ব তার ছিল না। সাবেক পোস্ট মাস্টার বিকাশ চন্দ্র তাকে দিয়ে এসব কাজ করাতেন। বিকাশ চন্দ্র তাকে ট্রেজারিতে টাকা জমা দিতে বলতেন। সে সময় ট্রেজারিতে প্রণব কুমার দায়িত্বে ছিলেন এবং এছাড়াও টাকা নিতেন পোস্টাল অপারেটর নাজমুল হাসান। টাকা আত্মসাতের ঘটনায় এই ৩ জনের সংশ্লিষ্টতার কথা সে আমাকে জানিয়েছে। পরে আমি বিষয়টি পোস্ট অফিস কর্তৃপক্ষকে অবগত করি।

ইউপি সদস্য আব্দুল হান্নান মন্ডল আরও বলেন, শিহাবের বিষয়টি নিয়ে আমরা সম্প্রতি মূলঘর ইউনিয়ন পরিষদে বসেছিলাম। তবে সেখানে কোনো সমাধান হয়নি। পুরো টাকার দায় অফিস থেকে শিহাবের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার একার পক্ষে এত টাকা নেওয়া বা আত্মসাৎ করার ক্ষমতা ছিল না।

তিনি বলেন, শিহাব লেটার রাইটার হিসেবে চাকরি করতো। তার কাজই যদি ক্যাশ ডিলিংসের না হয়, তাহলে তিনি কেন গ্রাহকদের টাকা লেনদেন করবেন- এ প্রশ্ন রয়েছে। নতুন পোস্ট মাস্টার যোগদানের মাত্র ছয় দিনের মাথায় শিহাবের বিরুদ্ধে অনিয়মের বিষয়টি ধরা পড়েছে। অথচ আগের পোস্ট মাস্টার বিকাশ চন্দ্র দায়িত্বে থাকা অবস্থায় প্রায় এক বছর ধরে বিষয়টি ধরা পড়েনি এ বিষয়টিও তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।

আব্দুল হান্নান মন্ডল বলেন, আমি চাই এ ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত, তদন্তের মাধ্যমে তাদের প্রত্যেককে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হোক। একই সঙ্গে গ্রাহকদের কষ্টার্জিত টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। অনেক গ্রাহক তাদের টাকা হারিয়ে পারিবারিকভাবে অশান্তিতে রয়েছে। প্রশাসনের কাছে আমার অনুরোধ, সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

ইউপি সদস্য জানান, কিছুদিন আগে একটি অজ্ঞাত নম্বর থেকে তার কাছে ফোন আসে। ফোনকারী নিজেকে সাবেক পোস্ট মাস্টার বিকাশ চন্দ্রের পক্ষের লোক হিসেবে পরিচয় দিয়ে জানায়, বিকাশ চন্দ্র ২০ লাখ টাকা দিতে রাজি। বাকি টাকা শিহাবের কাছ থেকে নিয়ে বিষয়টি সমাধান করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পরে বিষয়টি তিনি শিহাবের পরিবারকে জানান।

এ বিষয়ে সাবেক পোস্ট মাষ্টার বিকাশ চন্দ্র দাসকে ফোন করে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, ওই ফোন তিনি করেননি, তার শ্বশুর তার হয়ে ফোন করেছিলেন। এরপর এ বিষয়ে আর কোনো কথা হয়নি।

জোরপূর্বক স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামা নেওয়ার অভিযোগ

এদিকে গ্রাহকদের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর শিহাব মৃধার পরিবারের সদস্যদের গত ১৩ জুলাই রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে ডেকে এনে শিহাবের মা শিউলি বেগমসহ অন্যান্যদের ভয়ভীতি দেখিয়ে জোরপূর্বক নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে একটি কর্মকর্তাদের মনগড়া অঙ্গীকারনামা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সাবেক পোস্ট মাস্টার বিকাশ চন্দ্রসহ পোস্ট অফিসের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।

অঙ্গীকারনামায় গত ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে আত্মসাৎ হওয়া টাকা ফেরত দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয় বলে জানা গেছে। তবে শিহাব মৃধার পরিবারের দাবি, ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক ওই অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে।

অঙ্গীকারনামায় সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করেছেন- রাজবাড়ীর বর্তমান পোস্ট মাস্টার মো. শামীম আহমেদ, ওবায়েদ, প্রাক্তন পোস্ট মাস্টার বিকাশ চন্দ্র এবং রাজবাড়ী পোস্ট অফিসের পরিদর্শক মো. হুমায়ুন কবির। 

অন্যদিকে অঙ্গীকারকারী হিসেবে স্বাক্ষর করেন- শিহাব মৃধার মা শিউলি বেগম, ছোট ভাই মাহবুব মৃধা এবং শিহাব মৃধার মামা ও রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের এমএলএসএস মো. রেজাউল আলম।

শিহাবের পরিবারের অভিযোগ, প্রকৃত ঘটনা ও আত্মসাতের সঙ্গে কারা জড়িত তা যাচাই না করেই পরিবারের সদস্যদের ওপর পুরো অর্থের দায় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিজানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে গ্রাহকদের সঞ্চয় ও বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। ভুক্তভোগী গ্রাহকদের অনেকে তাদের জমা করা টাকা ফেরত না পাওয়ায় ডাকঘরে এসে অভিযোগ করেন। পরে বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে দুইটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। পরে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে পোস্ট অফিসের বর্তমান ও সাবেক ৭ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে দায়ী করা হয়। 

এ ঘটনায় গত ৩০ জুলাই গ্রাহকদের পক্ষ থেকে ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করলে রাজবাড়ী অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও সদর আমলি আদালতের বিচারক মো. হায়দার আলী অভিযুক্ত সকলের বিরুদ্ধে সমন ইস্যুর আদেশ দেন।

এরপর গত ২ আগস্ট কুষ্টিয়া ডাক বিভাগের পোস্ট অফিস পরিদর্শক(প্রশাসন) মো. শহিদুল ইসলাম বাদী হয়ে ৭ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে আসামি করে দণ্ডবিধির ৪০৯/১০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় রাজবাড়ীর সিনিয়র বিশেষ জজ আদালতে মামলাটি করেন। আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আনিসুর রহমান মামলাটি আমলে নিয়ে এজাহার হিসেবে গ্রহণ করে তদন্তের জন্য দুদক কার্যালয় ফরিদপুরকে নির্দেশ দেন।

এদিকে গ্রাহকদের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ইতোমধ্যে মামলা ও তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং ভুক্তভোগী গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।

অপরদিকে ঘটনার সাথে জড়িতদের বিচারের দাবি করেন রাজবাড়ীর বিশিষ্টজনেরা। পাশাপাশি নিরাপরাধ কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী যাতে হয়রানীর শিকার না হয় সে বিষয়েও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তারা।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে ৭৪ জন গ্রাহকের আমানতের ১ কোটি ১২ লাখ ৩০ হাজার টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের টাকা জমা নেওয়ার জন্য নির্ধারিত কর্মকর্তা ও ফরম থাকা সত্ত্বেও লেটার রাইটার শিহাব মৃধা বেআইনিভাবে জমা স্লিপের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করতো। এ কাজে পোস্ট মাস্টার বিকাশ চন্দ্র, শিহাবের ভাই মাহবুব হাসান মৃধা, অফিস সহায়ক মামা রেজাউল আলমসহ অন্য আসামিরা সহযোগিতা করে। 

ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকরা পাস বই ও হিসাব সংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগ তৎকালীন পোস্ট মাস্টার বিকাশ চন্দ্রকে জানালেও তিনি কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেননি। পরে গত ৫ জুলাই নতুন পোস্ট মাস্টার শামীম আহমেদ দায়িত্ব গ্রহণের পর অনিয়ম ও জালিয়াতির বিষয়টি শনাক্ত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন। 

উক্ত অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় গত ৪ আগস্ট দক্ষিণাঞ্চল খুলনার পোস্ট মাস্টার জেনারেল (চলতি দায়িত্ব) কবির আহমেদ স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে বিকাশ চন্দ্রকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়, জনস্বার্থে এবং সরকারি কাজের স্বার্থে বিকাশ চন্দ্রকে সরকারী কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ৩(খ) অনুযায়ী অসদাচরণের দায়ে একই বিধিমালার ১২ ধারা মোতাবেক সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

 এ বিষয়ে কুষ্টিয়া প্রধান ডাকঘরের পোস্ট মাস্টার আবুল কালাম আছাদ বলেন, রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের টাকা আত্মসাতের ঘটনায় সেখানকার তৎকালীন পোস্ট মাস্টার ও কুষ্টিয়া প্রধান ডাকঘরে কর্মরত সহকারী পোস্ট মাস্টার বিকাশ চন্দ্রকে সরকারী কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ৩ (খ) অনুযায়ী অসদাচরণের দায়ে একই বিধিমালার ১২ ধারা মোতাবেক সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

এদিকে গ্রাহকদের টাকা আত্মসাতের ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসা রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে কর্মরত পোস্টাল অপারেটর, ট্রেজারার ও এমএলএসএসসহ আরও ৬ জন কর্মচারীদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। গত ৯ আগস্ট কুষ্টিয়ার ডেপুটি পোস্ট মাস্টার জেনারেলের কার্যালয় থেকে এই কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়

মীর সামসুজ্জামান সৌরভ/আরএআর

বিজ্ঞাপন