বিজ্ঞাপন

পদ্মার বুকে ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’, বাড়ছে দর্শনার্থীর ভিড়

পদ্মার বুকে ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’, বাড়ছে দর্শনার্থীর ভিড়

নদীর বুকে তখন মেঘ আর সূর্যের লুকোচুরি। কখনো মেঘে ঢেকে যাচ্ছে চারপাশ, আবার মুহূর্তেই উঁকি দিচ্ছে রোদ। প্রকৃতির এমন খেয়ালিপনার মধ্যেই ঘড়িতে বেলা সাড়ে ১১টা। পদ্মা নদীর ডগারঘাটে তখন ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। ঘাটজুড়ে সারি সারি নৌকা। কোনোটি ঘাট ছেড়ে যাচ্ছে, কোনোটি ফিরছে, আবার কোনোটি যাত্রীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে।

হঠাৎ বেড়ে যাওয়া এই ব্যস্ততার পেছনে রয়েছে পদ্মার বুকে জেগে ওঠা একটি চর। পুরোনো নাম ‘চরখিদিরপুর’। নদীর মাঝামাঝি অবস্থানের কারণে পরে স্থানীয়দের কাছে চরটি পরিচিতি পায় ‘মিডিল চর’ নামে।

মিডিল চরের চারপাশজুড়ে পদ্মার বিস্তীর্ণ জলরাশি। নদীর বুক থেকে জেগে ওঠা বালুচরগুলো এখন ঢেকে গেছে সবুজের আস্তরণে। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, ধূসর বালুর ওপর কেউ যেন সবুজের চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। সেই সবুজ প্রান্তরে দিনভর ঘুরে বেড়ায় গরু-মহিষসহ নানা গবাদিপশু।

চরজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ছোট ছোট খড়ের ঘর। এসব ঘরেই বসবাস করেন চরবাসী। তাদের জীবনের প্রধান অবলম্বন কৃষি ও গবাদিপশু পালন। চারপাশে পদ্মার জলরাশি, মাঝখানে সবুজে মোড়া চর, তার বুকজুড়ে গবাদিপশুর বিচরণ আর খড়ের ঘরে মানুষের সাদামাটা জীবন—সব মিলিয়ে মিডিল চর যেন নদীর বুকের এক টুকরো সুইজারল্যান্ড। স্থানীয়দের কাছে তাই এর নাম হয়ে উঠেছে ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’।

পদ্মার বুকে নৌকা এগিয়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে চরবাসী আব্দুস সাত্তার (৫৩) বলতে থাকেন তার চেনা পদ্মার গল্প। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে এই নদী আর তার চরের জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখে আসা সাত্তারের চোখে আজকের পদ্মা আর আগের মতো নেই। একসময় যে নদী ছিল ঢেউ আর স্রোতের গর্জনে মুখর, সেই নদী এখন অনেকটাই শান্ত। জেলের জালে উঠত নানা প্রজাতির মাছ, মিলত ইলিশও। সেই দিনগুলো এখন শুধুই স্মৃতি।

আক্ষেপ নিয়ে আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘পদ্মায় এখন অন্য সময়ের চেয়ে বেশি পানি আছে, ঠিক। তবে এটা পদ্মার প্রকৃত রূপ না। আমি দেখেছি গাঙের ভরা যৌবন। পানির ঢেউয়ের গর্জন ছিল। পদ্মার ডাক ছিল। জেলের জালে বিভিন্ন মাছের সঙ্গে উঠত ইলিশও। তার কিছুই নেই। এখন যৌবনহারা এক নদীর নাম পদ্মা। বোধ হয় পদ্মার যৌবন আর দেখে যেতে পারব না।’

তার সঙ্গে কথা বলতে বলতে নৌকা তখন প্রায় পৌঁছে গেছে মিডিল চরের কাছে। দূর থেকেই চোখে পড়ল অস্থায়ী বেশ কিছু দোকান। কোথাও ফুচকা, কোথাও বিস্কুটসহ শুকনা খাবার। 

নদী থেকে নামার পর প্রায় দুই কিলোমিটার হাটলে মিডিলচর। সেখানে চরবাসীর বসিত ছাড়াও রয়েছে একটি মসজিদ ও চর খিদিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। 

চরের প্রতিটি বাড়ি টিন ও পদ্মার খড় দিয়ে তৈরি। পাড়াটিতে পাকা বা ইট বিছানো কোনো রাস্তা নেই। বালু উঁচু করে সেটিকেই যাতায়াতের পথ হিসেবে ব্যবহার করেন চরবাসী। প্রতিটি বাড়ির সামনেই রয়েছে গবাদিপশুর বাথান। এগুলোই এখানকার মানুষের জীবিকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন। প্রতিটি পালে ৮০ থেকে ৩০০টি পর্যন্ত গরু, ভেড়া, গারল ও মহিষ রয়েছে। সারাদিন চরে বিচরণ শেষে রাতে বাথানেই ফিরে আসে গবাদিপশুগুলো।

চরে উৎপাদিত দুধ বিক্রি হয় রাজশাহী শহরের বিভিন্ন হোটেল ও দোকানে। চরের দুধের চাহিদা থাকায় অনেকে নদীর বাঁধে বসেই প্রতি লিটার ৭০ থেকে ৮০ টাকা দরে দুধ বিক্রি করেন। এ ছাড়া গ্রামের দক্ষিণ পাশের নদীতে চলতি মৌসুমের পাট জাগ দেওয়া হয়েছে। সেখানে নারী-পুরুষ মিলে পাটের আঁশ ছাড়ানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার।

চরে সবুজের সমারহে সাদা বালুর সঙ্গে মিশে আছে কাশফুলের শুভ্রতা। নীল আকাশ, মেঘের ভেলা আর নদীর ঢেউ-সব মিলিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ছবির মতো এক দৃশ্য। জেলা পবা উপজেলার পদ্মা নদীর মিডিল চর এখন প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের কাছে আকর্ষণের নতুন নাম। শহরের কোলাহল থেকে দূরে, নদীর বুকের এই বিস্তীর্ণ চর যেন প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা এক ক্যানভাস।

বর্ষায় নদী যখন পানিতে টইটম্বুর থাকে, তখন চরটির রূপ একরকম। আবার পানি কমে গেলে জেগে ওঠে বালুর রাজ্য। ঋতু বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় চরটির সৌন্দর্যও। শীত ও শরৎকালে কাশফুলের শুভ্রতা, বর্ষায় নদীর উচ্ছ্বাস আর গ্রীষ্মে বিস্তীর্ণ বালুচর প্রতিটি ঋতুতেই মিডিল চর যেন নতুন সাজে ধরা দেয়।

বিশেষ করে বিকেলের শেষভাগে সূর্যের আলো যখন নদীর পানিতে পড়ে ঝিলিক দেয়, তখন পুরো চরজুড়ে তৈরি হয় মনোমুগ্ধকর আবহ। সূর্যাস্তের সময় আকাশের রঙ বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে পদ্মার পানিতেও ফুটে ওঠে নানা রঙের প্রতিচ্ছবি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে সৌন্দর্যের গল্প

মিডিল চরের সৌন্দর্য আগে স্থানীয়দের কাছে পরিচিত হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে এখন তা ছড়িয়ে পড়ছে রাজশাহীসহ সারাদেশে। ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকে ছড়িয়ে পড়া ছবি, রিলস ও ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে পদ্মার চরাঞ্চলের অসাধারণ প্রাকৃতিক দৃশ্য।

অনেকেই ভিডিও ও ছবির ক্যাপশনে জায়গাটিকে বলছেন ‘রাজশাহীর মিনি সুইজারল্যান্ড’। নামটি আনুষ্ঠানিক কোনো পর্যটন স্বীকৃতি নয়; বরং প্রকৃতির সৌন্দর্যে মুগ্ধ দর্শনার্থীদের দেওয়া একটি উপমা। তবে এই উপমাই এখন মিডিল চরকে নতুন করে মানুষের নজরে এনেছে।

চরে বেড়াতে আসা মদিনাতুল উলুম কামিল মাদরাসার নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. মোবাসের বলেন, ফেসবুক ও ইউটিউবে অনেক ভিডিও দেখেছি এই চরকে নিয়ে। এখানে এসে অনেক ভালো লাগছে। বিশাল জলরাশির পাশে বিশাল মাঠ। পুরো মাঠই সবুজ। সেই সবুজের বুকে বিচরণ করছে গবাদিপশু। অনেক সুন্দর লাগছে। স্কুলের বন্ধুরা মিলে এই মাঠে ফুটবল খেলেছি। নদীতে গোসল করেছি। সব মিলে অনেক ভালো লেগেছে।

রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী ইশরাত জাহান সাতজন বান্ধবী নিয়ে ঘরতে এসছেন এই চরে। তিনি বলেন, এখানে এসে শ্রীকান্ত আচার্যের একটা গান মনে পড়ে গেলে ‘আমি খোলা জানালা, তুমি ওই দক্ষিণা বাতাস, আমি নিঝুম রাত, তুমি তো জাগরী আকাশ।’ আসলে এই চরটা খোলা জানালার মতোই; ঘরের জানালা খুললে যেমন বাতাস মনটা জুড়িয়ে দিয়ে যায়। এখানে এসে সেই অনুভূতি লাগছে। অনেক সুন্দর।

শহরের ব্যস্ত থেকে ছুটি না নিয়েও আসা যায় এখানে। কারণ শহরের পাশে পদ্মার নদী থেকে রওনা দিলে সব মিলে মাত্র এক থেকে দুই ঘণ্টায় বেড়িয়ে আসা সম্ভব। তাই পদ্মার চর হতে পারে আকর্ষণীয় একটি গন্তব্য। এখানে নেই শহরের যানজট, নেই কোলাহল। আছে শুধু নদীর বাতাস, খোলা আকাশ আর প্রকৃতির বিশালতা।

রাজশাহীতে একটি মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক সুয়ায়েব ইসলাম বলেন, নদী, নদীর চর, নৌকা ভ্রমণ আসলেই সুন্দর। আল্লাহর সৃষ্টির অনন্য নির্দশন এটি। ভাবতে পারিনি এতো ভালো লাগবে। আবহাওয়া ভালো ছিল, রোদ তেমন ছিল না। পরিবার নিয়ে এসেছিলাম, বাচ্চারা অনেক মজা করল।

সৌন্দর্যের সঙ্গে সতর্কতাও জরুরি

তবে চরাঞ্চলে ভ্রমণের ক্ষেত্রে কিছুটা সতর্ক থাকা প্রয়োজন। যেমন- লাইফ জ্যাকেট পরা বাধ্যতামূলক। যদিও পদ্মার নদীপথ ও চর প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। কোথাও বালুচর শক্ত, আবার কোথাও নরম বা গভীর গর্ত থাকতে পারে। নদীতে নামার ক্ষেত্রেও প্রয়োজন বাড়তি সতর্কতা। বিশেষ করে বর্ষাকালে নদীর স্রোত ও পানির গভীরতা বিবেচনা না করে পানিতে নামা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

নৌকার মাঝিরা সুজন আলী বলেন, দুই সপ্তাহ আগেও এই ঘাটে নৌকাগুলোর মাঝি অলস সময় কাটাতো। হঠাৎ করে মানুষ আসতে শুরু করেছে চরে ঘোরার জন্য। আগেও জন প্রতি ২৫ টাকা ছিল। এখনও ২৫ টাকায় আছে। দর্শনার্থীতের উপস্থিতি বাড়ায় আমাদের উপার্জন ভালো হচ্ছে। রাজশাহী সিটি করপোরেশন থেকে লাইফ জ্যাকেট দিয়েছে। তবে আরও প্রয়োজন।

একই সঙ্গে পর্যটকদের দায়িত্বশীল আচরণও জরুরি। প্লাস্টিক, পলিথিন কিংবা খাবারের প্যাকেট ফেলে নষ্ট করা যাবে না এই নির্মল পরিবেশ। প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতে গিয়ে যেন সেই প্রকৃতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত না করা হয়—এটাই হওয়া উচিত সবার অঙ্গীকার।

পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা

মিডিল চরের জনপ্রিয়তা যদি পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো যায়, তাহলে এটি রাজশাহীর পর্যটন খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। নিরাপদ যাতায়াত, পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা, পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থা এবং স্থানীয় পর্যায়ে পর্যটনবান্ধব উদ্যোগ গড়ে উঠলে জায়গাটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।

পদ্মার বুকে জেগে ওঠা এই চর কেবল একটি বালুচর নয়; এটি রাজশাহীর প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যেরও একটি অনন্য উদাহরণ। নদী, আকাশ, বালু আর সবুজের অপূর্ব মেলবন্ধন মানুষকে বারবার টেনে নিয়ে যায় এখানে।

দর্শনার্থীদের নিরাপদ নৌযাত্রা নিশ্চিত করতে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন  নির্দেশনায় লাইফ জ্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে। রাসিক প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটনের পক্ষ থেকে সচিব সোহেল রানার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল উপস্থিত থেকে মাঝিদের হাতে লাইফ জ্যাকেট তুলে দেন।

এ সময় নৌযানে যাত্রী পারাপারের সময় লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার, অতিরিক্ত যাত্রী না তোলা এবং যাত্রীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়ে মাঝিদের সচেতন করা হয়। এ সময় রাসিকের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নাজমুল আলম সহ অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এদিকে লাইফ জ্যাকেট পেয়ে খুশি নৌকার মাঝি ও দর্শনার্থীরা।

রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের চরখিদিরপুরে ইউপি সদস্য শহিদুল ইসলাম বলেন, এই চরে আগে তেমন মানুষ ঘুরেতে আসতো না। ইদানিং অনেক মানুষ আসছে। সম্প্রতি অনেক কনটেন্ট ক্রিয়েটর সুন্দর সুন্দর ভিডিও ও ছবি প্রকাশ করেছে এই মিডিল চরকে নিয়ে। সেখানে তারা মিনি সুইজারল্যান্ড আখ্যা দিয়েছেন। তাই অনেকেই আসছে এই চরে। তবে প্রাকৃতিক সুন্দর্য ঠিক রাখকে প্লাস্টিকের জিনিসপত্র না ফেলার আহ্বান জানান তিনি। 

রাজশাহী অঞ্চলের নৌ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন বলেন, যাত্রীদের সর্তক করা হচ্ছে। অনেক যাত্রী লাইফ জ্যাকেট নিচ্ছেন না। তবে সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নৌকার মাঝিদের বলা হচ্ছে, যাত্রীরা যেন লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করেন। লাইফ জ্যাকেট না পরলে কোনো নৌকা যেন না ছাড়া হয়।

শাহিনুল আশিক/আরকে