সংখ্যাগুলো ছোট নয়। মাত্র সাড়ে সাত মাসে ঠাকুরগাঁওয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে জব্দ হয়েছে ৬ হাজার ৪৯১ পিস ইয়াবা। এর সঙ্গে রয়েছে ৪ হাজার ৬৬ পিস টাপেন্টাডল, ৩২ বোতল ফেনসিডিল, ৭ কেজি ৩৮ গ্রাম গাঁজা, ৪৪২ লিটার দেশি মদ, ১০৫ বোতল ফেন্সিবিল, ২ বোতল ইস্কফ সিরাপ ও ৩ বোতল এমকেড্রিল।
শুধু মাদকদ্রব্য জব্দেই শেষ নয়, চলতি বছরের মার্চ থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত মাদকবিরোধী অভিযানসহ বিভিন্ন মামলায় ৫১৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ঠাকুরগাঁও জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। একই সময়ে মাদক সেবনের অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে করা হয়েছে ৮৪টি মামলা। এসব মামলায় ১ লাখ ৬২ হাজার টাকা জরিমানা আদায় এবং ৮৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
শনিবার (১৫ আগস্ট) ঠাকুরগাঁও পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে ঢাকা পোস্টকে এসব তথ্য জানানো হয়।
পুলিশ সুপার কার্যালয় থেকে দেওয়া মাসভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বছরের মাঝামাঝি সময়ে মাদক উদ্ধারের পরিমাণও বেড়েছে। বিশেষ করে জুন ও জুলাই মাসে ইয়াবা ও টাপেন্টাডল উদ্ধারের পরিমাণ ছিল উল্লেখযোগ্য। মার্চে ডিবির অভিযানে জব্দ করা হয় ১ হাজার ৫৩৭ পিস ইয়াবা। একই সময়ে ৭৮৩ পিস টাপেন্টাডল, ৩২ বোতল ফেনসিডিল, ৬২৫ গ্রাম গাঁজা, ১৬১ লিটার দেশি মদ এবং ৭৮ বোতল ফেন্সিবিল উদ্ধার করা হয়। এসব ঘটনায় ৬৭টি মামলায় ৮৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এপ্রিলেও অভিযান অব্যাহত ছিল। ওই মাসে ৪২৪ পিস ইয়াবা, ১৬১ পিস টাপেন্টাডল, ৫৩৩ গ্রাম গাঁজা ও ২ বোতল ইস্কফ সিরাপ জব্দ করা হয়। এ সময় ৩২টি মামলায় গ্রেপ্তার হন ৪৬ জন। মে মাসে ইয়াবা উদ্ধারের পরিমাণ দাঁড়ায় ৭১৬ পিস। এ ছাড়া ৫৩১ পিস টাপেন্টাডল, ফেনসিডিল, ৭৮৬ গ্রাম গাঁজা ও ২৩৫ লিটার দেশি মদ জব্দ করা হয়। এসব ঘটনায় ৬০টি মামলায় ৮১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তবে জুনে এসে ইয়াবা উদ্ধারের পরিমাণ এক লাফে বেড়ে যায়। ওই মাসে জব্দ হয় ২ হাজার ১৫৯ পিস ইয়াবা। সঙ্গে ছিল ৩৫০ পিস টাপেন্টাডল ও ২ কেজি ৮৫২ গ্রাম গাঁজা। এসব ঘটনায় ৬৬টি মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় ৮৫ জনকে। জুলাইয়ে আবার টাপেন্টাডল উদ্ধারে বড় পরিমাণ দেখা যায়। ওই মাসে ১ হাজার ৩১১ পিস ইয়াবার পাশাপাশি ১ হাজার ৭৫৫ পিস টাপেন্টাডল, ২৭ বোতল ফেনসিডিল, ২ কেজি ১৫২ গ্রাম গাঁজা, ২৫ লিটার দেশি মদ ও ৩ বোতল এমকেড্রিল জব্দ করা হয়। এ সময় ৬৮টি মামলায় ৯৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আগস্টের প্রথম ১৪ দিনেও অভিযান থামেনি। এ সময়ে ৩৪৪ পিস ইয়াবা, ৪৮৬ পিস টাপেন্টাডল, ৯০ গ্রাম গাঁজা ও ২১ লিটার দেশি মদ জব্দ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ২১টি মামলায় ৩১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এতে দেখা যায় এক মাসেই দুই হাজারের বেশি ইয়াবা জব্দ করেছে পুলিশ।
পুলিশের মাসভিত্তিক হিসাবের সবচেয়ে বড় চিত্রটি পাওয়া যায় জুন মাসে। ওই এক মাসেই জব্দ হয়েছে ২ হাজার ১৫৯ পিস ইয়াবা। মার্চের ১ হাজার ৫৩৭ পিসের তুলনায় জুনে উদ্ধার হওয়া ইয়াবার পরিমাণ ৬২২ পিস বেশি। আবার টাপেন্টাডল উদ্ধারের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ছিল জুলাই মাস। ওই মাসে ১ হাজার ৭৫৫ পিস টাপেন্টাডল জব্দ করা হয়। এর আগের মাস জুনে উদ্ধার হয়েছিল ৩৫০ পিস। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে টাপেন্টাডল উদ্ধারের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এ হিসাব ঠাকুরগাঁওয়ে মাদকবিরোধী অভিযানের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র সামনে আনছে মাদকদ্রব্যের ধরন ও উদ্ধারের পরিমাণ মাসভেদে পরিবর্তিত হলেও ইয়াবা ও টাপেন্টাডল পুলিশের অভিযানে নিয়মিতভাবে উঠে আসছে।
মার্চ থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত পুলিশের মাসভিত্তিক হিসাবে বিভিন্ন মাদক মামলায় অনেকেই গ্রেপ্তার হয়েছেন। এর মধ্যে মার্চে ৮৮ জন, এপ্রিলে ৪৬ জন, মে মাসে ৮১ জন, জুনে ৮৫ জন, জুলাইয়ে ৯৩ জন এবং আগস্টের প্রথম ১৪ দিনে ৩১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের দেওয়া সামগ্রিক হিসাবে, চলতি বছরের এই সময়ে জেলা পুলিশ ও ডিবির অভিযানে বিভিন্ন মামলায় মোট ৫১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অন্যদিকে, মাদক সেবনের অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৮৪টি মামলায় ৮৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসব মামলায় ১ লাখ ৬২ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৮৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ এবং শত শত মানুষ গ্রেপ্তারের পর স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসছে একটি প্রশ্ন, এত অভিযান ও গ্রেপ্তারের পরও ঠাকুরগাঁওয়ে মাদক সরবরাহ ও সেবন কতটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে? মাদকের উৎস কোথায়, কীভাবে এসব মাদক জেলায় প্রবেশ করছে, কারা সরবরাহ করছে এবং গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে মূল হোতারা কতটা আইনের আওতায় আসছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে জেলাবাসী।
ঠাকুরগাঁও শহরের কয়েকজন বাসিন্দা ঢাকা পোস্টকে বলেন, ইয়াবা ও টাপেন্টাডলের মতো মাদক বিপুল পরিমাণে জব্দ হওয়ার বিষয়টি উদ্বেগের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযানে মাদক উদ্ধার ও সংশ্লিষ্টদের গ্রেপ্তার নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে শুধু বহনকারী বা সেবনকারীদের গ্রেপ্তার করলেই মাদকের বিস্তার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়।
তারা আরও বলেন, এসব মাদক কোথা থেকে ঠাকুরগাঁওয়ে আসছে, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং কারা সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত তা খুঁজে বের করে মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। পাশাপাশি মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদারের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
কলেজ শিক্ষক মো. আতাউর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, শুধু আইন প্রয়োগ করে মাদক পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো প্রয়োজন। একইসঙ্গে মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম রসুল কাজল ঢাকা পোস্টকে বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে ডিবির অভিযান নিয়মিতভাবেই চলছে। শুধু মাদক উদ্ধার ও মাদক বহনকারীদের গ্রেপ্তার নয়, এর সঙ্গে জড়িত মূল ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার বিষয়েও আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। কোথা থেকে মাদক আসছে, কীভাবে তা জেলার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে এবং কারা এর পেছনে রয়েছে এসব তথ্য সংগ্রহ করে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. খোদাদাদ হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে জেলা পুলিশের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। মাদকদ্রব্য উদ্ধার, মাদক কারবারি ও সেবনকারীদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি মাদকের মূল উৎস ও সরবরাহব্যবস্থা শনাক্তে পুলিশ কাজ করছে। গত সাড়ে সাত মাসে বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ এবং পাঁচ শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মাদকের সঙ্গে জড়িত কোনো ব্যক্তি যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। মাদকবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করা হবে এবং এ বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।
রেদওয়ান মিলন/এএমকে
