সকাল হতেই চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার সোনামসজিদ স্থলবন্দরের মহাসড়কে বাড়ে কোলাহল। ভারত থেকে সারিবদ্ধভাবে ঢুকতে শুরু করে পাথরবোঝাই শতাধিক ট্রাক। ভারী যানবাহনের হর্নের শব্দ আর উড়তে থাকা ধুলাবালির মাঝেই শুরু হয় একদল স্থানীয় নারীর প্রাত্যহিক জীবনসংগ্রাম।
কোনো প্রাতিষ্ঠানিক চাকরি কিংবা বড় কোনো ব্যবসা নয়, শুধু ট্রাকের খাঁজে আটকে থাকা বা রাস্তায় পড়ে যাওয়া পাথর কুড়িয়েই চলে তাদের জীবিকা। সোনামসজিদ স্থলবন্দর এলাকায় স্থানীয় অনেক দুস্থ ও সুবিধাবঞ্চিত নারী এই পাথর কুড়িয়ে তাদের সংসারের চাকা কোনোমতে সচল রেখেছেন।
বন্দর কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই পথ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১৫০ থেকে ২০০টি ট্রাকে পাথর আমদানি করা হয় এবং গত ছয় মাসে যার পরিমাণ ছিল প্রায় ১২ লাখ মেট্রিক টন। ভারত থেকে ট্রাকগুলো বন্দরে প্রবেশের সময় অতিরিক্ত বোঝাই বা ঝাঁকুনির কারণে রাস্তায় পাথর পড়ে যায়। এ ছাড়া ট্রাকের বডি কিংবা খাঁজেও আটকে থাকে ছোট-বড় পাথর। বাংলাদেশে ট্রাক ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয় নারীরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সেই পড়ে যাওয়া বা আটকে থাকা পাথর সংগ্রহ করতে শুরু করেন। সারাদিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে এবং ধুলাবালির মধ্যে অক্লান্ত পরিশ্রম করে একেকজন নারী কয়েক কেজি পাথর জমা করেন।

সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, স্থলবন্দর এলাকায় ভারতে যাওয়ার জন্য কিছু লোকজন অপেক্ষা করছে। আবার বন্দরের শ্রমিকরা নিজেদের কাজে ব্যাস্ত। আর তিনজন নারী বসে খোশ গল্প করছেন। ট্রাক আসতেই নেমে পড়েন পাথর সংগ্রহের কাজে। ট্রাকগুলোর বডির বিভিন্ন খাঁজে, চাকার খাঁজে ও পড়ে থাকা পাথরের নুড়িগুলো ছোট বাঁশের লাঠি দিয়ে তাদের ডালিতে নিচ্ছেন। চেকপোস্টে দুই থেকে তিন মিনিট দাঁড়ায় ট্রাকগুলো। এর মধ্যেই পাথর সংগ্রহ করেন তারা।
পাথর সংগ্রহকারী ডলি বেগম নামে একজন বলেন, আমার চারটা ছেলে-মেয়ে। স্বামী মারা গেছেন। এই কাজে আমি নামতাম না। কিন্তু চারটা ছেলে-মেয়ের জন্য এই পথে নামতে হলো। আজ ১৬-১৭ বছর পাথর কুড়িয়ে খাই এবং এটা করেই সংসার চালাই। স্বামী মারা যাওয়ার পর আমাকে তো সংসার চালাতে হবে, তাই বাধ্য হয়েই আমি পাথর কুড়ানোর কাজে নামি। লজ্জা করি না, পেট তো চালাতে হবে। দুইটা ডাল, আলু, ভাত খাওয়ার জন্যই এই কাজটা করি। দিনে ৫০ থেকে ১০০ টাকা আয় হয়। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কাজ করি।

সেফালি বেগম নামে আরেকজন বলেন, আমরা এখানে প্রায় ৩০ বছর যাবত কাজ করে খাই। ছেলে-মেয়েদের কষ্ট দেখতে না পেরে আমরা এই পথে নেমেছি। দিনে ৫০ টাকা হয় আবার সময়তে ১০০ টাকাও হয় ইনকাম। আমরা প্রথমে ট্রাক থেকে পাথরগুলো সংগ্রহ করি তারপর গ্রামের লোকের কাছে বিক্রি করি।
শিরিন বেগম নামের আরেকজন বলেন, পাথর কুড়িয়ে যা টাকা পাই, তা দিয়ে সুখ করে দুটা ভাত খেতে পাই। কার দিকে তাকাবো, আর হাত পেতে সাহায্য চেয়ে খেলে কি ভালো হবে? তার থেকে পাথর কুড়িয়ে খাচ্ছি। লজ্জা করলে তো আর কেউ খেতে দেবে না। কোনোদিন দুই ডালি আবার কোনোদিন তিন ডালি পাথর পাই। সেগুলো এখানে জমা রাখি। পরে একসঙ্গে বিক্রি করি। তবে এখন এই বন্দর দিয়ে গাড়ি কম ঢুকছে। ফলে আয় কম। সকাল থেকে বসেই আছি।

ভ্যানচালক আলমগীর বলেন, আমি প্রায় এখানে আসি ভাড়া নিয়ে। তাদেকে পাথর কুড়াতে দেখতে পাই। তারা গরিব মানুষ, সরকার যেন কিছু দান অনুদান দেয় তাদের। এই দাবি জানাচ্ছি।
বন্দরের পাশের চা বিক্রেতা সেলিম বলেন, আমি এখানেই চা বিক্রি করি। ভারত থেকে যে পাথরবোঝাই ট্রাক আসে। কিছু স্থানীয় বাসিন্দারা তা থেকে পাথর কুড়ান। গাড়ি থেকে, চাকা থেকে। পাথর কুড়িয়ে জমা করে বিক্রি করেন। এই টাকা দিয়ে চাল-ডাল কিনে সংসার চালান। এইভাবেই তারা দিনপার করেন। তাদেরকে তো কেউ সহোযোগিতা করে না। গন্যমান্য ব্যক্তিদের কাছে তাদের জন্য সহোযোগিতার দাবি জানাচ্ছি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ/এএমকে
