শেরপুরে টানা চার দিন ধরে সরকারি গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন শেরপুর সরকারি কলেজের আবাসিক শিক্ষার্থীরা। গ্যাস সংকটে কলেজের ছাত্র ও ছাত্রী হোস্টেলে তিন বেলার পরিবর্তে এখন দুই বেলা রান্না হচ্ছে। ফলে সকালে রান্না না হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থীকে একবেলা না খেয়েই ক্লাস ও পড়াশোনা করতে হচ্ছে। সংকট মোকাবিলায় হোস্টেল দুটিতে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করা হলেও এতে রান্নার খরচ বেড়েছে।
রোববার (১৬ আগস্ট) দুপুরে শেরপুরে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকার বিষয়টি ঢাকা পোস্টকে নিশ্চিত করেছেন, তিতাস গ্যাসের শেরপুর জেলার ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. বদরুজ্জামান।
সরেজমিনে দেখা যায়, শেরপুর সরকারি কলেজে ১০৮ শয্যার ছাত্র হোস্টেল ‘শহিদ মাহবুব হল’ ও ১৩০ শয্যার ছাত্রীনিবাস রয়েছে। জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ জেলার বাইরে থেকে আসা শিক্ষার্থীরা এসব হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করেন। তুলনামূলক কম খরচে থাকা ও পড়াশোনার সুযোগ থাকায় অনেক শিক্ষার্থী হোস্টেলে থাকলেও, গ্যাস সংকটে এখন তাদের বাড়তি ভোগান্তি ও ব্যয়ের মুখে পড়তে হচ্ছে।
হোস্টেল সূত্রে জানা যায়, সরকারি গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হওয়ার পর রান্না চালু রাখতে দুই হোস্টেলেই এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে তিন বেলা রান্না করলে দ্রুত সিলিন্ডারের গ্যাস শেষ হয়ে যায়। এতে রান্নার খরচ বেড়ে যাওয়ায় আপাতত দুপুর ও রাতে দুই বেলা রান্না করা হচ্ছে। সকালে রান্না বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের একবেলা খাবার থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের দাবি, দ্রুত সরকারি গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি সংকটকালীন সময়ে হোস্টেলগুলোতে পর্যাপ্ত বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি ও বাড়তি ব্যয় আরও বাড়বে।
শহিদ মাহবুব হলের শিক্ষার্থী নিলো মিয়া বলেন, সকালে রান্না না হওয়ায় অনেক সময় না খেয়েই ক্লাসে যেতে হচ্ছে। আমরা প্রত্যন্ত এলাকা থেকে এসে এখানে পড়াশোনা করছি। কম খরচে থাকার জন্য হোস্টেলে উঠেছি। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে এখন খাবারের খরচও বেড়ে যাচ্ছে। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা প্রয়োজন।
ছাত্রীনিবাসের শিক্ষার্থী মনিরা সুলতানা বলেন, সকালে খাবার না থাকায় আমাদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। না খেয়ে ক্লাস ও পড়াশোনা করা কঠিন। তিন বেলা রান্না করলে সিলিন্ডার দ্রুত শেষ হয়ে যায় বলে দুই বেলা রান্না করা হচ্ছে। আমরা চাই, শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে দ্রুত গ্যাসের সমস্যা সমাধান করা হোক।
ছাত্রীনিবাসের সহকারী হোস্টেল সুপার প্রভাষক শাহিদুল ইসলাম বলেন, শেরপুরে গ্যাস লাইন বন্ধ থাকায় ছাত্রীনিবাসে সিলিন্ডার গ্যাস কিনে দেওয়া হচ্ছে। খরচ কমাতে দুই বেলা রান্না হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, গ্যাসের সমস্যা দ্রুত সমাধান হোক।
শহিদ মাহবুব হলের সুপার সহকারী অধ্যাপক আবুল বাশার বলেন, সরকারি বিভিন্ন দপ্তর, হাসপাতাল, অফিস-আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ ও গ্যাস থাকা জরুরি। খরচ কমাতে মফস্বল থেকে শিক্ষার্থীরা শহরে এসে হোস্টেলে থাকছেন। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে তাদের খরচই এখন বাড়ছে। গত ৪ দিন ধরে সরকারি গ্যাস লাইনে গ্যাস নেই। সিলিন্ডার গ্যাস কিনে দিতে হচ্ছে দ্বিগুণ খরচে। তিন বেলা রান্না করলে দ্রুত সিলিন্ডারের গ্যাস শেষ হয়ে যায়। তাই দুপুর ও রাতে দুই বেলা রান্না হচ্ছে, এক বেলা রান্না বন্ধ রয়েছে।
শহরের পাশাপাশি গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ওপর। বিশেষ করে হোস্টেলে থাকা শিক্ষার্থীদের নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় তাদের পড়াশোনাতেও এর প্রভাব পড়ছে। একবেলা রান্না বন্ধ রেখে সিলিন্ডার গ্যাসে দুই বেলা রান্না করেও পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে হোস্টেল কর্তৃপক্ষ।
গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকরাও ভোগান্তিতে পড়েছেন। সিএনজি স্টেশনে গ্যাস না থাকায় অনেক চালক গাড়িতে জ্বালানি নিতে পারছেন না। ফলে অটোরিকশা চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং যাত্রীরাও বাড়তি দুর্ভোগে পড়েছেন।
তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ বলছে, মহেশখালীতে গ্যাস সরবরাহ ধীরে ধীরে শুরু হয়েছে। তবে সেখানে সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার পর শেরপুরে গ্যাস পৌঁছাতেও অতিরিক্ত সময় লাগবে। ফলে কবে নাগাদ শেরপুরের আবাসিক, বাণিজ্যিক ও সিএনজি গ্রাহকেরা স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ পাবেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
তিতাস গ্যাসের তথ্য অনুযায়ী, শেরপুরে প্রায় ৪ হাজার আবাসিক গ্রাহক ও ২২টি বাণিজ্যিক গ্যাস সংযোগ রয়েছে। এ ছাড়া জেলায় একটি সিএনজিচালিত পাম্প রয়েছে। জেলার মাসিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ২৭ থেকে ৩২ মিলিয়ন ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে গ্যাসের চাপ থাকে ২০ থেকে ২২ পিএসআই। শেরপুরে গ্যাসের সরবরাহ মূলত ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও মাতারবাড়ী অঞ্চল থেকে হয়ে থাকে।
তিতাস গ্যাসের শেরপুর জেলার ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. বদরুজ্জামান শেরপুরে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করে ঢাকা পোস্টকে বলেন, গত ১২ আগস্ট বুধবার রাত ১০টা থেকে শেরপুরে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। মহেশখালী ও মাতারবাড়ী অঞ্চলের এলএনজি টার্মিনালে গ্যাস সরবরাহে সংকটের কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি বলেন, মহেশখালীতে গ্যাসের স্বল্প পরিমাণ সরবরাহ শুরু হয়েছে। তবে শেরপুরে গ্যাস সরবরাহ শুরু হতে আরও সময় লাগবে। প্রাথমিকভাবে আমরা জানতে পেরেছি, স্বাভাবিক হতে ৫-৭ দিন সময় লাগতে পারে। তবে মহেশখালীতে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার পরও শেরপুরে গ্যাস সরবরাহ শুরু হতে আরও প্রায় ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ঠিক কবে নাগাদ শেরপুরে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনো আমাদের কাছে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই।
মো. নাইমুর রহমান তালুকদার/এমএমবি
