বিজ্ঞাপন

বিশেষ নজর ও অনুশীলনে সাফল্য, ঝালকাঠিতে নজর কাড়ছে শাহী মডেল স্কুল

বিশেষ নজর ও অনুশীলনে সাফল্য, ঝালকাঠিতে নজর কাড়ছে শাহী মডেল স্কুল

ঝালকাঠি শহরের শাহী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সরকারি বিদ্যালয় হলেও ফলাফলে প্রতিবছরই নিজেদের ভালো অবস্থান ধরে রাখছে প্রতিষ্ঠানটি। শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষার্থীদের অনুশীলন এবং দুর্বলদের প্রতি বাড়তি নজর দেওয়াকে সাফল্যের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন শিক্ষক ও অভিভাবকরা।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় বিদ্যালয়টির ১৮ শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে বৃত্তি পেয়েছে ১৫ জন। তাদের মধ্যে ট্যালেন্টপুলে চারজন এবং সাধারণ বৃত্তি পেয়েছে ১১ জন।

বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে এ নিয়ে আনন্দের পাশাপাশি রয়েছে সন্তুষ্টিও। কারণ, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থীর বৃত্তি পাওয়া এখন অনেকটা ধারাবাহিক সাফল্যে পরিণত হয়েছে।

১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত শাহী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। তাদের পাঠদানে দায়িত্ব পালন করছেন ১১ জন শিক্ষক। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতার পাশাপাশি নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষার্থীদের প্রতি ব্যক্তিগত নজর এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে বিদ্যালয়টি শিক্ষার মান ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

যেখানে অনেক অভিভাবক সন্তানদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াতে আগ্রহ হারিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকছেন, সেখানে শাহী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ব্যতিক্রমী একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। এ বিদ্যালয়ে সন্তানকে ভর্তি করাতে অভিভাবকদের আগ্রহ রয়েছে। ভালো শিক্ষার পরিবেশ, নিয়মিত পাঠদান ও ধারাবাহিক ভালো ফলাফলের কারণে বিদ্যালয়টিতে ভর্তি হতে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের আগ্রহ বছরজুড়েই দেখা যায়। সরকারি বিদ্যালয়ও যে মানসম্মত শিক্ষার জন্য অভিভাবকদের প্রথম পছন্দ হতে পারে, শাহী মডেল তারই উদাহরণ।

মো. জহিরুল ইসলাম নামে এক অভিভাবক বলেন, শাহী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমার মেয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে, নিয়মিত পাঠদান ও শিক্ষকদের আন্তরিকতায় আমরা সন্তুষ্ট। সন্তানদের পড়াশোনার প্রতি শিক্ষকদের নজর রয়েছে। সরকারি বিদ্যালয় হলেও এখানকার শিক্ষার পরিবেশ ও ফলাফল ভালো হওয়ায় অভিভাবকদের মধ্যে আস্থা তৈরি হয়েছে।

মো. মনিরুজ্জামান নামে আরেক অভিভাবক বলেন, আমরা চাই সন্তানরা ভালো পরিবেশে মানসম্মত শিক্ষা লাভ করুক। শাহী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের আন্তরিকতা, নিয়মিত পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের প্রতি বাড়তি নজর আমাদের আশ্বস্ত করে। এ কারণে অনেক অভিভাবকই তাদের সন্তানকে এ বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে আগ্রহী।

বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুধু পরীক্ষার আগে নয়, সারা বছরই শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার অগ্রগতির দিকে নজর রাখা হয়। শ্রেণিকক্ষে পাঠ বুঝিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত শ্রেণিকাজ, বাড়ির কাজ ও মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করেন শিক্ষকরা।

কোনো শিক্ষার্থী কোনো বিষয়ে পিছিয়ে পড়লে তাকে আলাদাভাবে সময় দেওয়া হয়। নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে তার দুর্বলতা কাটানোর চেষ্টা করা হয়। শিক্ষকরা জানান, শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে পড়ানোর পাশাপাশি কে কোথায় পিছিয়ে আছে, সেটি চিহ্নিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। পড়াশোনার বাইরেও শিক্ষার্থীদের আবৃত্তি, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়। এতে তাদের আত্মবিশ্বাস ও সৃজনশীলতা বাড়ে বলে মনে করেন শিক্ষকরা।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নূরুননাহার বেগম বলেন, আমাদের শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফলের পেছনে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা রয়েছে। শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ দিয়ে পাঠদান করেন এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত অনুশীলন করানো হয়। কোনো শিক্ষার্থী কোনো বিষয়ে দুর্বল হলে তার প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, আমরা শুধু পরীক্ষার ফলাফলকে গুরুত্ব দিই না। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি আবৃত্তি, সংস্কৃতি ও বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা বিকাশ করতে পারে, সেদিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বিদ্যালয়ের অভিভাবক ও পরিচালনা কমিটির সহসভাপতি আবু সালেহ মো. হাসান বলেন, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এমন সাফল্যের পেছনে শিক্ষকদের আন্তরিকতা, নিয়মিত পাঠদান এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি নজর রাখা গুরুত্বপূর্ণ। এবারের ফলাফলও বিদ্যালয়ের ধারাবাহিক সাফল্যেরই প্রতিফলন।

শাহী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই সাফল্যের সঙ্গে সাবেক শিক্ষার্থীদেরও স্মৃতি জড়িয়ে আছে। বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও ঝালকাঠি প্রেসক্লাবের সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আককাস সিকদার ১৯৮৬ সালে এই বিদ্যালয় থেকেই সর্বপ্রথম  ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছিলেন।

তিনি বলেন, আমি এই বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। ১৯৮৬ সালে এই বিদ্যালয় থেকেই প্রথম ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছিলাম। এরপর থেকে বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বৃত্তি পেয়ে আসছে। এটি আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। তার মতে, শিক্ষকদের ভালো পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের পরিশ্রমের কারণে দীর্ঘদিন ধরে এই সাফল্য ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (চলতি দায়িত্ব) মো. শাহিনুল ইসলাম মজুমদার বলেন, শাহী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এই সাফল্য অত্যন্ত প্রশংসনীয়। নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষার্থীদের অনুশীলন এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষকদের বাড়তি নজর দেওয়ার ফলে এ ধরনের ফলাফল অর্জন সম্ভব হয়েছে। একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে ভালো ফলাফলের ধারাবাহিকতা ধরে রাখছে, এটি অবশ্যই ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। জেলার অন্যান্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে এ ধরনের উদ্যোগ ও চর্চা অনুসরণ করবে বলে আমরা আশা করি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, অনেক অভিভাবক যখন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে সন্তানদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পড়াতে আগ্রহী হচ্ছেন, তখন শাহী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ধারাবাহিক সাফল্য ভিন্ন একটি বার্তা দিচ্ছে। শুধু এবার নয়, প্রতিবছরই বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল করে আসছে। নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষার্থীদের অনুশীলন, দুর্বলদের প্রতি বাড়তি নজর এবং শিক্ষকদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় বিদ্যালয়টিতে লেখাপড়ার মান ভালো রয়েছে। ফলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব, শাহী মডেল তার একটি ভালো উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

এএমকে