প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির আওতায় গাইবান্ধার সাত উপজেলায় ১৩টি খাল খননের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো। ফলে এসব খালের অসমাপ্ত কাজের প্রায় ১১ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে ভূমি জটিলতা ও জলাবদ্ধতার কারণে তিনটি খালের খনন কাজ শুরুই করা যায়নি, আর জমি-সংক্রান্ত জটিলতা ও অতিবৃষ্টির কারণে আরও দুটি খালের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। বাকি ৮টির কাজও অতিবৃষ্টিসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে শেষ করা সম্ভব হয়নি। ফলে জলাবদ্ধতা ও খরার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের খাল খননের সুফল পেতে আরও অপেক্ষা করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্র জানায়, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের ইজিপিপি প্রকল্পের আওতায় জেলার সাত উপজেলায় প্রায় ৪১ কিলোমিটারের ১৩টি খাল খনন কাজের বিপরীতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১৬ কোটি ৬২ লাখ ৫৬ হাজার ৩১৮।
এর মধ্যে মোট খালের ৫২ শতাংশ খনন কাজের বিপরীতে ওয়েজ, নন ওয়েজ ও অন্যান্য বিষয়ে খরচের পরিমাণ ৫ কোটি ৬৫ লাখ ১৭ হাজার ৬৯১ টাকা। খননসহ অন্যান্য অসম্পূর্ণ ৪৮ শতাংশ কাজের অব্যয়িত ১০ কোটি ৯৭ লাখ ৩৮ হাজার ৬২৭ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।
জেলার এই প্রকল্পের ১৩টি খালের মধ্যে সদর উপজেলার দুইটি খালের একটি সাহাপাড়া ইউনিয়নের কাশদহ নান্দিনা খাল। কাজ না হওয়ায় ১.৬ কিলোমিটার খালটির বরাদ্দের প্রায় সাড়ে ৪১ লাখ টাকা পুরো অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেয় সংশ্লিষ্ট কার্যালয়।
এ উপজেলার খনন প্রকল্পের আওতায় নেওয়া অপরটি বাটিকামারী নালা। খালটির খনন প্রকল্পে নেওয়া ১.৪ কিলোমিটার অংশের ১.৩ অংশ কাজে বিপরীতে ওয়েজ ও নন ওয়েজ কাজে মোট খরচ দেখানো হয়েছে ২০ লাখ ৭০০ টাকা। যার কাজের অগ্রগতি ৪৪.৪৬ শতাংশ।
সূত্র জানায়, খালের অবশিষ্ট খনন অংশ আটকে যায় জমি সংক্রান্ত জটিলতায়। ফলে খালটির খননসহ অন্যান্য অসমাপ্ত ৫৫.৪৬ শতাংশ কাজের অব্যয়িত ১৭ লাখ ২৮ হাজার ৩৮৭ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়।
সরেজমিনে সদর উপজেলার বোয়ালী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাটিকামারি খাল খনন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পরিত্যক্ত প্রায় খালটি হয়েছে দৃশ্যমান। খাল খনন কাজের উদ্বোধনী স্থানের সামনের কিছুটা অংশ বেশ জাকজমকভাবে বাঁধা হয়েছে খালের দুই পার। কিন্তু উত্তরদিকে তেমন কাজ হয়নি। খালের পানি প্রবাহমান থাকার বদলে রয়েছে স্থির। খাল ও খালের দুইপারের বাহিরেও সমান পানি।
অপরদিকে, খালের খনন অংশের তিনটি পয়েন্টে খালের অর্ধেক যায়গা দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে কাঁচা-পাকা তিনটি বাড়ি। এরমধ্যে খালের সুন্দরজাহান মোড়ের দিক থেকে শুরুতেই একটি অংশের যায়গা নিয়ে এক স্কুল শিক্ষক নির্মাণ করেছেন তিনতলা একটি পাকা বাড়ি। এর কিছুটা দক্ষিণে খালের যায়গায় টিনের প্রাচীর ও পাকা ওয়াশরুম নির্মাণ করেছে আলমগীর নামের এক ওয়ার্কশপ ব্যবসায়ী। এর আরো কিছুটা দক্ষিণে নালার ওপর টিনের ঘর তুলেছে রুপালি নামের এক নারী।
জানতে চাইলে তিনতলা বাড়ির মালিক উল্লা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক আতাউর রহমান মোবাইল ফোনে ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমার ভবনটি নালার যায়গায় পড়েনি। আমরা এসিল্যান্ডের কাছে আবেদন করে মেপে দেখেছি। তারপরেও সরকারের যেকোনো সিদ্ধান্ত আমি নেবো নেব।
বাটিকামারি খাল খনন এলাকার স্থানীয় কৃষকরা জানান, খাল খনন কাজ দৃশ্যমান হলেও এর সুফল এখুনি পাবেনা কৃষকরা। এজন্য তাদের পুরো কাজ সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
স্থানীয় কৃষক শফিকুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, মৃতপ্রায় খালটি দৃশ্যমান হয়েছে কিন্তু আমরা এর সুফল এখুনি পাচ্ছি না। কারণ এই নালা বা খাল দিয়ে পানি প্রবাহ হবে না। খালের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত খনন কাজ পানি প্রবাহমান করলে এর সুফল মিলবে।
রাধাকৃষ্ণপুরের বাসিন্দা ও প্রগতি লেখক সংঘের সাধারণ সম্পাদক রজতকান্তি বর্মন ঢাকা পোস্টকে বলেন, সরকারের এই প্রকল্পের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কৃষকের উপকারের জন্যই বলে মনে হয়েছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে প্রকল্পটি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের চরম উদাসিনতা ও দায়িত্বহীনতার প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় কোষাগারে টাকা ফেরত দেওয়া কোনও ক্রেডিট নয়, বরং ব্যর্থতা।
পরিবেশ ক্লাবের গাইবান্ধা জেলা আহ্বায়ক গোলাম রাব্বানী মুসা বলেন, আমরা দেখেছি এসব খাল খননের কাজ উদ্বোধন করা হয়েছে যখন খাল ভর্তি পানি ছিল। কেন? কেন তরিঘড়ি করে কাজটি আরম্ভ করতে হলো। এটি সংশ্লিষ্টদের অদূরদর্শিতা।
এ ব্যাপারে কথা বলতে একাধিকবার ফোন করা হলেও রিসিভ করেননি সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) রিয়াজুল ইসলাম। পরে একাধিক দিন অফিসে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।
বাটিকামারি খাল খনন প্রকল্পের প্রকল্প সভাপতি ও বোয়ালী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম সাবু বলেন, খালের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন এবং বাকি অংশ খনন না করা গেলে কৃষকের কোনও কাজে আসবেনা।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবুজ কুমার বসাক ঢাকা পোস্টকে বলেন, কৃষক এবং কৃষি খাতের উন্নয়নের জন্যই সরকারের এই খাল খনন প্রকল্প। কৃষকরা যাতে করে এই প্রকল্পের সুফল পান সেজন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করে সদরের বাটিকামারি খালের অবশিষ্ট অংশ প্রকল্পের আওতায় নিয়ে খননের প্রয়োনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, সুন্দরগঞ্জের দুটি খাল খনন প্রকল্পের অসমাপ্ত কাজের অব্যয়িত টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে।
ফুলছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা বা দখল হওয়ার বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করেছি। নির্দেশনা পেলে সে মোতাবেক কাজ করা হবে। এ উপজেলার একটি খালের পুরো অর্থ এবং আরেকটি খালের অর্ধেকের কিছুটা কম অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে।
মাসুম বিল্লাহ/আরকে
