প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী ইশতেহার মোতাবেক সারা দেশের ন্যায় নওগাঁতেও মরা খালগুলো পুনঃখননে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় শস্য ভাণ্ডার খ্যাত উত্তরের এ জেলার ১০টি উপজেলার ১৩টি খাল খনন বা পুনঃখনন করার জন্য অর্থ বরাদ্দ প্রদান করে সরকার। ইতোমধ্যেই সবগুলো খাল খননের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। খাল খননের পর বরাদ্দকৃত অর্থ মো. কম খরচ হওয়ায় অবশিষ্ট ১ কোটি ৩৯ লাখ ৫৪ হাজার ৯৮২ টাকা সরকারের কোষাগারে জমা দিয়েছে জেলা প্রশাসন।
জানা যায়, জেলায় ১০টি উপজেলায় ১৩টি খাল খননের জন্য মোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ৮ কোটি ৭০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৯৭ টাকা। এরমধ্যে মোট ব্যয় হয়েছে ৭ কোটি ৩০ লাখ ৮৪ হাজার ৪১৫ টাকা। অবশিষ্ট টাকা সরকারের কোষাগারে ফেরত দিয়েছেন নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম ও স্ব-স্ব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা।
এদিকে বেশ কিছু জায়গায় খননকৃত খাল মো. উপকার পেতে শুরু করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এর আগে খালগুলো ছিল মৃতপ্রায়। বর্তমানে এই খালগুলো জমে থাকা পানি দিয়ে খালপাড়ের মানুষরা তাদের জমিতে চাষাবাদ শুরু করেছে। আবার খালে জমে থাকা পানিতে অনেকেই হাঁস পালন করছে, অনেকেই ধরছেন মাছ। এছাড়া খালের দুই পাড় দিয়ে রোপণ করা হয়েছে নানাবিধ পরিবেশবান্ধব গাছ।
অপরদিকে একাধিক উপজেলায় খাল খননের কাজ নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে, আছে অভিযোগ।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জেলার সদর উপজেলার এক কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের শ্যামপুর মেইন রাস্তা হয়ে হরিপুর হয়ে কালুপাড়া বিল অভিমুখে খাল পুনঃখননের জন্য ৭১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৯ টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ৫২ লাখ ৪৫ হাজার ৭২৮ টাকা ব্যয়ে খাল খননের পর সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে ১৮ লাখ ৬৫ হাজার ১৫১ টাকা। এছাড়া ২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের হামড়ার বিল থেকে কৃষ্ণপুর অভিমুখে খাল পুনঃখননের জন্য ৯০ লাখ ৪২ হাজার ১৫ টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়। ৬৭ লাখ ৫৭ হাজার ৯৬৫ টাকা ব্যয়ে কাজ শেষে সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে ২২ লাখ ৮৪ হাজার ৫০ টাকা।
রাণীনগর উপজেলার ৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের দেওলা বড়গাছা ব্রিজ মো. মালশন গিরিগ্রাম অভিমুখে খাল পুনঃখনন কাজের জন্য ৭৭ লাখ ২৮ হাজার ৮৪২ টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যথাযথ মান বজায় রেখে এবং স্থানীয় বেকার ও অসহায় মানুষদের অংশগ্রহণে খাল পুনঃখনন কাজে ৭২ লাখ ৬০ হাজার ৯৩২ টাকা ব্যয় করার পর সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে ৪ লাখ ৬৭ হাজার ৯১০ টাকা।
আত্রাই উপজেলার ১.১৪০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের নওদাপাড়া সিংসাড়া খাল মো. শুকচারা মাঠ অভিমুখে খাল পুনঃখনন কাজের জন্য ২৯ লাখ ৩৯ হাজার ৬২৬ টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়। খনন কাজে ২৪ লাখ ৬৩ হাজার টাকা ব্যয় শেষে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৬২৬ টাকা।
বদলগাছি উপজেলার ০.৭৫০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের চাঁপাইনগর বাছিরের বাড়ি থেকে আধাইপুর শেষ মাথা পর্যন্ত খাল পুনঃখননের জন্য ৫১ লাখ ৫৩ হাজার ৯৯৫ টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়। ৩৯ লাখ ৮০ হাজার ৬০৫ টাকা ব্যয়ে খনন কাজ শেষে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে ১১ লাখ ৭৩ হাজার ৩৯০ টাকা। এছাড়া ১.২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ঢেঁকড়া সফির জমি থেকে খোর্দ্দভূবন ব্রিজ পর্যন্ত খাল/ক্যানেল সংস্কারের জন্য ৭৭ লাখ ২৮ হাজার ৮৪২ টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়। ৪৮ লাখ ২৯ হাজার ৬৩২ টাকা ব্যয়ে খনন কাজ শেষে সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে ২৮ লাখ ৯৯ হাজার ২১০ টাকা। বদলগাছি উপজেলা মো. খাল খনন ও সংস্কার কাজ শেষে সরকারি কোষাগারে সবচেয়ে বেশি অর্থ ফেরত দেওয়া হয়েছে।
মহাদেবপুর উপজেলার ২.৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের নারায়ণপুর ব্রিজ মো. কুড়াইল গ্রামের শেষ মাথা পর্যন্ত খাল পুনঃখননের জন্য ৫৯ লাখ ২৬ হাজার ৪৪৯ টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়। ৪৬ লাখ ৭৫ হাজার ৫শ টাকা ব্যয়ে কাজ শেষে সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে ১২ লাখ ৫০ হাজার ৯৪৯ টাকা।
মান্দা উপজেলার ১.৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের হারকিশোর মৌজার বিল উথরাইল ব্রিজ থেকে বাদলঘাটা ব্রিজ পর্যন্ত খাল পুনঃখননের জন্য ৫৪ লাখ ১১ হাজার ৪৮০ টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়। ৫৪ লাখ ১ হাজার ১৫৩ টাকা ব্যয়ে খনন কাজ শেষে সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে ১০ হাজার ৩২৭ টাকা। এছাড়া ২.১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বাঁকাপুর মৌজার বাঁকাপুর দফাদার মোড় মেইন রোড থেকে বিল উথরাইল খাল পুনঃখনন কাজের জন্য ৫৪ লাখ ৬২ হাজার ৯৭৭ টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়। ৫৪ লাখ ৪২ হাজার ৭৭৩ টাকা ব্যয়ে খনন কাজ শেষে সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে ৩০ হাজার ৫৩১ টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। তবে এই দুটি খাল খনন কাজে ব্যাপক অনিয়ম করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দায়সারানো ভাবে খালের খনন কাজ শেষ করা হয়েছে বলেও রয়েছে স্থানীয়দের অভিযোগ।
পোরশা উপজেলার ৩.২৫০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ইলাম মৌজার মাক্তাপুর মোড় থেকে হাতিখোচা বিল অভিমুখে খাল পুনঃখননের জন্য ১ কোটি ২৮ লাখ ৭৮ হাজার ৫৩৭ টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়। খনন কাজে ১ কোটি ১৫ লাখ ৮৮ হাজার ৮৮৮ টাকা ব্যয় করার পর সরকারি কোষাগারে ১২ লাখ ৮৯ হাজার ৬৪৯ টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে।
নিয়ামতপুর উপজেলার ২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বিষ্ণুপুর বাবুল হাজীর জমি থেকে বিষ্ণপুর ব্রিজ হয়ে সন্তোষপাড়া ছাতড়া ব্রিজ পর্যন্ত খাল পুনঃখনন কাজের জন্য ৬৪ লাখ ৪১ হাজার ৪১৯ টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়। ৫৪ লাখ ৫৭ হাজার ৬৫৭ টাকা ব্যয়ে খনন কাজ শেষে সরকারি কোষাগারে ৯ লাখ ৮৩ হাজার ৭৬২ টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে।
পত্নীতলা উপজেলার ১.৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ২নম্বর ওয়ার্ডের চক আবদাল (কাষ্ণিপুকুর) ইট ভাটার নিকট থেকে পত্নীতলা আবেদিয়া স্লুইসগেট অভিমুখে খাল খননের জন্য ৫৪ লাখ ৬৮ হাজার ১২৬ টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়। ৪৫ লাখ ৫০ হাজার ৫২৬ টাকা ব্যয়ে কাজ শেষে সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে ৯ লাখ ১৭ হাজার ৬০০ টাকা।
ধামইরহাট উপজেলার ২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের চৌঘাট ব্রিজ থেকে দক্ষিণ দিকে ছিলিমপুর স্লুইসগেট পর্যন্ত খাল পুনঃখননের জন্য ৫৭ লাখ ৪৬ হাজার ২১০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ৫৪ লাখ ৩০ টাকা ব্যয়ে খনন কাজ শেষে সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে ৩ লাখ ৪৬ হাজার ১৮০টাকা।
খাল খননের পর অবশিষ্ট কত টাকা জমা দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে মান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আখতার জাহান সাথী বলেন, আমার এখন মনে নেই, তবে ডিসি অফিসে তথ্য দেওয়া হয়েছে। আর খাল খননের অনিয়ম হয়েছে কিনা এমন বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার কাছে লিখিতভাবে কেউ অভিযোগ দেয়নি।
রাণীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাকিবুল হাসান জানান, খাল খননের পর খালের পাড় দিয়ে ঘাস জাতীয় নানা উদ্ভিদ লাগানো এবং খালের পুরো পাড়জুড়ে নানা জাতের পরিবেশবান্ধব গাছ লাগানো হয়েছে। এতে খালের পাড়টি স্থায়িত্ব বাড়বে। আর সুফল পাবে ওই এলাকার মানুষরা। সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক খাল খনন কাজ শেষে কিছু অর্থ সরকারের কোষাগারে ফেরতও প্রদান করা হয়েছে। তবে উপজেলাজুড়ে আরও যে মৃতপ্রায় খালগুলো রয়েছে সেগুলোও পুনঃখনন করা খুবই প্রয়োজন।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রেখে যাওয়া অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্যে দেশের মৃত প্রায় খালগুলো পুনঃখননের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাই সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক জেলার খালগুলো খনন কিংবা পুনঃখনন করার চেষ্টা করা হয়েছে। স্ব-স্ব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ তদারকির মাধ্যমে প্রতিটি খাল খনন করা হয়েছে। আর যেগুলোতে একটু সমস্যা দেখা গেছে সেগুলো পুনরায় সংস্কার করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, মৃত এই খালগুলো খননের ফলে জেলার কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতার নিরসন হবে, মাছের বংশবৃদ্ধি হবে, পরিবেশ ও ভূগর্ভস্থ পানির উপর চাপ কম হবে, গ্রামীণ পর্যায়ে ছোট নৌপথ সচল করা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে।
মনিরুল ইসলাম শামীম/এসএইচএ
