অভাবের সুযোগ নিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন এলাকায় উচ্চ সুদে দাদন ব্যবসার বিস্তার ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, ঋণ দেওয়ার সময় ব্যাংকের ফাঁকা চেক ও সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে পরে সেগুলোতে বড় অঙ্কের টাকা বসিয়ে আদালতে মামলা করা হচ্ছে। এতে বহু পরিবার আর্থিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে, একাধিক ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। সদর উপজেলার সালন্দর, আউলিয়াপুর, ভুল্লী, শিবগঞ্জ, জামালপুর, বালিয়াডাঙ্গী, পীরগঞ্জ, রানীশংকৈল ও হরিপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ সুদে দাদন ব্যবসা চলছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নিম্ন আয়ের মানুষ, কৃষক, দিনমজুর, ছোট ব্যবসায়ী, এমনকি শিক্ষকও।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ১ লাখ টাকা ঋণ নিলে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদ দিতে হয়। ঋণ দেওয়ার সময় জামানত হিসেবে ব্যাংকের ফাঁকা চেক ও একাধিক সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ে মূল টাকা পরিশোধ করতে না পারলে সেই চেক ব্যবহার করে কয়েক গুণ বেশি অর্থ দাবি করে আদালতে মামলা করা হচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ।
পুতুল চন্দ্র নামে এক শিক্ষক বলেন, পারিবারিক সংকটের কারণে স্থানীয় এক দাদন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে দুই মাসের জন্য ১ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলাম। ঋণ নেওয়ার সময় প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা সুদ নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি আমার কাছ থেকে ব্যাংকের ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর এবং কয়েকটি সাদা স্ট্যাম্পে সই নেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, আমি নিয়মিত সুদ পরিশোধ করলেও নির্ধারিত সময়ে মূল টাকা পরিশোধ করতে পারিনি। পরে আমার দেওয়া ফাঁকা চেকে ১৮ লাখ টাকা লিখে আমার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করা হয়েছে। এখন মামলা প্রত্যাহারের জন্য আমার কাছে ১০ লাখ টাকা দাবি করা হচ্ছে।
মালতি রানী রায় নামে আরেক শিক্ষিকা অভিযোগ করে বলেন, আউলিয়াপুর এলাকার জাহাঙ্গীর আলমের কাছ থেকে আমি ২ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলাম। ঋণ দেওয়ার সময় আমার কাছ থেকে দুটি ব্যাংক চেকে স্বাক্ষর এবং ১০টি সাদা স্ট্যাম্পে সই নিয়ে তিনি নিজের কাছে রেখে দেন। এরপর দীর্ঘদিন নিয়মিত সুদের টাকা পরিশোধ করলেও পরবর্তীতে আমার বিরুদ্ধে আদালতে চেকের মামলা করা হয়। আমি নিরুপায় হয়ে বাড়ির ভিটা বিক্রি করে মূল টাকা পরিশোধের প্রস্তাব দিলে তিনি ১২ লাখ টাকার কমে কোনো সমঝোতা করবেন না বলে জানান।
একই ধরনের অভিযোগ করেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি। তিনি বলেন, জাহাঙ্গীর আলম সুদের টাকা আদায়ের জন্য প্রায়ই আমাকে মানসিকভাবে হয়রানি ও চাপ প্রয়োগ করেন। নানা ধরনের ভয়ভীতি ও চাপের কারণে আমি চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি।
তবে এ বিষয়ে জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিবেদকের পরিচয় পেয়ে ফোন কেটে দেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করে বলেন, আকচা ইউনিয়নের নিমবাড়ি এলাকার প্রসন্ন চন্দ্রর কাছ থেকে আমি দেড় লাখ টাকা ধার নিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি আমার দেওয়া ফাঁকা চেক ব্যবহার করে আমার বিরুদ্ধে আদালতে ৭ লাখ টাকার চেক মামলা করেছেন। সেই মামলা মোকাবিলা করতে গিয়ে আমি চরম আর্থিক ও মানসিক সংকটে পড়েছি। প্রসন্ন চন্দ্র একজন দিনমজুর। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে প্রসন্নের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এর আগে, ভুল্লী উপজেলার বরগাঁও ইউনিয়নে বাঁশঝাড় থেকে চরণখোলা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রবীন্দ্র দেবনাথের (৫৫) মরদেহ উদ্ধার করেন পুলিশ। ঋণের চাপ সইতে না পেরে তিনি ‘আত্মহত্যা’ করেন বলে জানায় তার পরিবার।
তার কয়েকদিন পর পীরগঞ্জ উপজেলার নারায়ণপুর গ্রামের বাসিন্দা ও নসিবগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আক্তারুল ইসলাম নামে এক শিক্ষক দাদন ব্যবসায়ীদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেন বলে জানান পরিবারের লোকজন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, উচ্চ সুদের বোঝা, চেক মামলা এবং দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের কারণে অনেক পরিবার বসতভিটা, কৃষিজমি ও গবাদিপশু বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে। এতে বহু মানুষ আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
এরইমধ্যে, বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় এমন একটি ঘটনায় পুলিশ একজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
পুলিশ জানায়, ১২ হাজার টাকা সুদে ধার দেওয়ার পর ফাঁকা চেকে ১৩ লাখ টাকা বসিয়ে মামলা করার অভিযোগে খাদেমুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে গত বুধবার আটক করা হয়। পরে ভুক্তভোগী উত্তম কুমার রায়ের করা মামলায় তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, তিন বছর আগে উত্তম কুমার রায় ১২ হাজার টাকা ধার নিয়েছিলেন। পরে সুদসহ দ্বিগুণের বেশি টাকা পরিশোধ করলেও তার দেওয়া চেক ফেরত পাননি। অভিযোগ রয়েছে, সেই চেকে ১৩ লাখ টাকা লিখে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। মামলাটি লড়তে গিয়ে তিনি দেড় লাখ টাকার বেশি খরচ করেছেন বলে জানান।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগে আরও ৪০ থেকে ৫০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বালিয়াডাঙ্গী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বুলবুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ ও প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী খাদেমুল ইসলামকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
এর আগেও উঠেছিল একই ধরনের অভিযোগ, ঠাকুরগাঁওয়ে উচ্চ সুদের দাদন ব্যবসা ও ফাঁকা চেক ব্যবহার করে মামলা করার অভিযোগ নতুন নয়। প্রায় দুই বছর আগে সদর উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের ভকদগাজী বাজারকেন্দ্রিক একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসে। সে সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ অনুযায়ী, অগ্রণী ই-কমার্স’নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উচ্চ সুদে ঋণ দেওয়া, গ্রাহকদের কাছ থেকে ফাঁকা ব্যাংক চেক ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া এবং পরে বড় অঙ্কের টাকা দাবি করে আদালতে মামলা করার অভিযোগ ওঠে।
তৎকালীন ভুক্তভোগীদের অভিযোগ ছিল, অল্প পরিমাণ ঋণ নেওয়ার পরও তাদের বিরুদ্ধে কয়েক লাখ টাকা দাবি করে চেক মামলা করা হয়। এসব মামলার কারণে অনেক পরিবার দীর্ঘদিন ধরে আদালতে ঘুরেছেন। কেউ কেউ জমি-জমা ও গবাদিপশু বিক্রি করে মামলা পরিচালনা করেছেন। আবার সমন ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভয়ে কয়েকজন ভুক্তভোগী এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হয়েছেন বলেও স্থানীয়দের দাবি।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ওই ঘটনার পর কিছুদিন আলোচনা হলেও জেলার বিভিন্ন এলাকায় উচ্চ সুদের দাদন ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং নতুন ব্যক্তি ও চক্রের মাধ্যমে একই ধরনের অভিযোগ এখনো সামনে আসছে। বিচ্ছিন্নভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে পুরো দাদন চক্রকে চিহ্নিত করে তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনতে হবে। একইসঙ্গে ফাঁকা চেক ও সাদা স্ট্যাম্পের অপব্যবহার রোধে কার্যকর নজরদারি এবং ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।
ঠাকুরগাঁও আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ইমরান হোসেন চৌধুরী বলেন, দাদন বা উচ্চ সুদে অর্থ লেনদেনকে কেন্দ্র করে জেলায় চেক ডিজঅনার-সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে ঋণ দেওয়ার সময় ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে ফাঁকা চেক ও সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। পরে এসব চেকে বড় অঙ্কের টাকা বসিয়ে মামলা করা হলে সাধারণ মানুষ দীর্ঘ আইনি জটিলতার মধ্যে পড়ে যান। কেউ প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করা প্রয়োজন।
ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মোহাম্মদ খোদাদাদ হোসেন বলেন, উচ্চ সুদে অর্থ লেনদেনের আড়ালে যদি কোনো ব্যক্তি প্রতারণা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, ফাঁকা চেকের অপব্যবহার, জালিয়াতি বা অন্য কোনো বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ধরনের অভিযোগ পেলে পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
তিনি আরও বলেন, একইসঙ্গে সাধারণ মানুষকে অনুরোধ করব, কোনো অবস্থাতেই ফাঁকা চেক বা সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর দিয়ে আর্থিক লেনদেন করবেন না। কেউ প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত নিকটস্থ থানায় বা পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ দিন।
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার (সিভিল জজ) মজনু মিয়ার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও অসহায় মানুষ বিনামূল্যে বা স্বল্প খরচে আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কেউ যদি প্রতারণা, ভয়ভীতি বা বেআইনি উপায়ে অর্থ আদায়ের শিকার হয়েছেন বলে মনে করেন, তাহলে তিনি আইনি প্রতিকার পাওয়ার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষ বা লিগ্যাল এইড অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, প্রতিটি অভিযোগ আইন অনুযায়ী যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
রেদওয়ান মিলন/এএমকে