গাইবান্ধার তিস্তার ভাঙনের কবলে পড়েছে উপজেলার কাপাশিয়া ইউনিয়নের লালচামার এলাকার ‘ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) ভোরবেলা রাক্ষুসে তিস্তার আকস্মিক ভাঙনের তীব্রতায় বিদ্যায়ের একটি অংশ নদীতে বিলিন হয়ে গেছে।
বিদ্যায়টির অবশিষ্ট অবকাঠামো সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় কাজ করছে ৩০ জন শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দা। গেল কয়েকদিন আগেও পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ওই এলাকা পরিদর্শন করে কাজের আশ্বাস দিলেও হয়নি কোনো কাজ।
মঙলবার দুপুরে ঘটনাস্থল থাকা সুন্দরগঞ্জ উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (এটিও) মুকুল চন্দ্র বর্মণ ঢাকা পোস্টকে এসব বিষয় নিশ্চিত করেন। এদিন ভোরবেলা হঠাৎ ভাঙনের মুখে পড়ে বিদ্যালয়টি।
সংশ্লিষ্ট ও স্থানীয় সূত্র জানায়, চলমান বর্ষা মওসুমে কয়েক দফায় কাপাশিয়া ইউনিয়নের লালচামার এলাকা ভাঙনের কবলে পড়ে। দুই দফা তীব্র ভাঙনের সর্বশেষ গত ১৬ জুলাই দুপুরে ৪ নম্বর ওয়ার্ডের লাল চামারে আকস্মিক ভাঙনের তান্ডব চালায় রাক্ষুসে তিস্তা। এদিন অল্প সময়ের ব্যবধানে অন্তত ১০০ এর কাছাকাছি পরিবারের বসতভিটা নদীতে বিলিন হয়। আর তখনই ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ে এই ভোরের পাখি বিদ্যালয়টি। এরপরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা পাউবোসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে অবগত করে ওই এলাকাসহ বিদ্যায়টি রক্ষার আবেদন জানান। স্থানীয় বাসিন্দাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।

এ ছাড়া সর্বশেষ গত ৮ আগস্ট পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন গিয়ে বিদ্যালয়টিসহ ভাঙন এলাকার বসতিদের রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানালেও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পরিমাণ মতো জিও ব্যাগ ডাম্পিং করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলে বিদ্যালয়টি রক্ষা করা যেত।
ভাঙনের কবলে পড়া ভোরের পাখি বিদ্যালয় স্থলে থাকা ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রফিকুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, কাপাশিয়ার লালচামার এলাকার ৩ নম্বর ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ভাঙন এলাকাটা কাছাকছি লাগোয়া। চলমান ভাঙনে এই লালচামার এলাকার ৪ নম্বরের ২৭ ও ৩ নম্বরের ৩৬টিসহ ৬৩টি পরিবার বসতভিটা হারিয়েছেন। এখনো কয়েকশ পরিবার ভাঙনের মুখে রয়েছে।
এ সময় তিনি অভিযোগ করে বলেন, মন্ত্রী এসে আশ্বাস বা পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানানোর পরেও এখানে কোনো কাজ করা হয়নি। পর্যাপ্ত জিও ব্যাগ ফেলানো হলে বিদ্যালটি রক্ষা করা যেত।
কাপাসিয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য হাবিজার রহমান ঢাকা পোস্টকে জানান, এই ভাঙন গত দুই মাসের বেশি সময় ধরে চলছে। গত ১৬ জুলাই দুপুরে মুহূর্তের ভাঙনে সব শেষ হয়ে যায়। তখন থেকে বিদ্যায়টি ঝুঁকিতে ছিল। আজ ভোরে বিদ্যালয়টির একটি অংশ ভেঙে নদীতে যায়।
ভাঙনস্থলে থাকা উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুকুল চন্দ্র বর্মণ ঢাকা পোস্টকে বলেন, আজ ভোরে ভাঙন শুরু হয়েছে। ৩০ জন শ্রমিক ও স্থানীয় ১৫ জনসহ ৪৫ জন মানুষ বিদ্যালয়ের অবকাঠামো সরিয়ে নিতে আমরা কাজ করছি। এরমধ্যে বিদ্যালয়ের ঘরের পূর্ব পাশের লোহার এঙেলে লাগানো ২০/২৫ টি টিনের একটি বেড়া ও তিনটি জানালা নদীগর্ভে বিলিন হয়ে গেছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম বলেন, গতকালও স্কুলে ক্লাস হয়েছে। আজ ভোরে ভাঙন শুরু হয়েছে মর্মে আমরা খবর পাই। শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বিদ্যায়টি ভাঙনের মুখে পড়েছে-এমন বিষয়টি সংশিষ্ট সব দপ্তরকে অবগত করা হয়েছিল।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি ঢাকা পোস্টকে বলেন, বিদ্যালয়টির অবকাঠামো অন্যত্র সরিয়ে নিতে কাজ করা হচ্ছে। যত দ্রুত সম্ভব বাচ্চারা যাতে পড়া-লেখা শুরু করতে পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
মন্ত্রী পরিদর্শনের পরেও বিদ্যালয়টি কেন রক্ষা করা গেল না প্রশ্নে তিনি বলেন, গত কিছুদিন আগে ভাঙনের কবলে পড়া বিদ্যালয়টি রক্ষার জন্য পাউবোকে অবগত করে জিও ব্যাগ ফেলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। তারপর ওখানে ভাঙন ছিল না।
কিন্তু আজ ভোররাতে নদীর ভাঙনের গতিপথ পরিবর্তন হয়ে ওই এলাকায় আকস্মিক ভাঙনের মুখে পড়ে বিদ্যালয়টি।
এ বিষয়ে কথা বলতে গাইবান্ধার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
মাসুম বিল্লাহ/এএমকে
