ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের ফলাফল নিয়ে অসন্তোষের জেরে নাটোরের লালপুর ও বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও সরকারি কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করার অভিযোগে পৃথক দুটি এজাহার দায়ের করা হয়েছে। এতে সরকারদলীয় ২৫ নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ১৪০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
সোমবার (১৭ আগস্ট) সন্ধ্যায় লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আবু মাসুদ রানা এবং বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. শুকুর আলী নিজ নিজ থানায় লিখিত এজাহার দেন।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বিকেলে বিষয়টি নিশ্চিত করেন, লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম ও বাগাতিপাড়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (এসআই) আব্দুর রাজ্জাক।
লালপুর থানায় দেওয়া এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ১২ আগস্ট দুপুরে ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের ফলাফল বাতিলের দাবিতে সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে জড়ো হন। একপর্যায়ে ৪০ থেকে ৫০ জন ইউএনওর কার্যালয়ে প্রবেশ করে বিক্ষোভ ও স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় ইউএনও, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ও উপজেলা আইসিটি কর্মকর্তাসহ সরকারি কর্মকর্তারা কার্যালয়ে ছিলেন।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়, বিক্ষুব্ধরা কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করে নিয়োগের ফলাফল বাতিলের জন্য চাপ দিতে থাকেন। একপর্যায়ে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে মারধর করে তার শার্ট ছিঁড়ে ফেলা হয়। উপজেলা আইসিটি কর্মকর্তাকে ধাক্কা দেওয়ার পাশাপাশি কার্যালয়ের চেয়ার-টেবিলসহ বিভিন্ন আসবাব লাথি দিয়ে এলোমেলো করা হয়। ইউএনওর কক্ষে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ করতে চাপ দেওয়া এবং একপর্যায়ে ক্যামেরার তার ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগও করা হয়েছে।
এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়, কয়েকজন ইউএনওকে ঘিরে গালিগালাজ ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। তাকে কার্যালয় থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হলে ভেতরে থাকা ছাত্রদল-যুবদলের নেতাকর্মীরা ইউএনওর গায়ে ও কক্ষে ডিম ছুড়ে মারেন। পরে বিক্ষুব্ধরা কর্মকর্তাদের প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে উপজেলা পরিষদ চত্বরে গিয়ে আবারও জড়ো হন।
লালপুরের ঘটনায় ১৮ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ৪০-৫০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, বাগাতিপাড়া উপজেলা প্রশাসনের এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ১২ আগস্ট সকালে ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের ফলাফলকে কেন্দ্র করে শতাধিক ব্যক্তি উপজেলা পরিষদ ভবনের সামনে জড়ো হন। পরে তারা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ইউএনওর কার্যালয়ে গিয়ে আপত্তিকর স্লোগান দিতে থাকেন।
একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধরা ইউএনওর কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে দরজা খুলে দেওয়ার জন্য চাপ দেন। পরে কার্যালয়ের বারান্দায় থাকা কয়েকটি ফুলের টব ও একটি স্টিলের গেট ভাঙচুর করা হয়। এ সময় বিক্ষোভকারীদের ছুড়ে মারা একটি প্লাস্টিকের চেয়ার ইউএনও কার্যালয়ের সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তার কপালে আঘাত করে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এজাহারে আরও বলা হয়, উপজেলা ভূমি অফিসের এক কর্মচারী ঘটনার ভিডিও ধারণ করছিলেন। বিক্ষুব্ধরা তাকে মারধর করে তার কাছ থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নেন। পরে কয়েকজনকে ইউএনওর কক্ষে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলে তারা সেখানে থাকা সরকারি কর্মকর্তাদের বের করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে ইউএনওর টেবিলে আঘাত করে আপত্তিকর ভাষায় কথা বলার অভিযোগও করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, ফ্যামিলি কার্ডের প্রকাশিত ফলাফলের যেসব রোল নম্বর নিয়ে আপত্তি রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ লিখিতভাবে দিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু বিক্ষুব্ধরা তা না করে পুরো ফলাফল বাতিলের দাবি করেন। ইউএনও তাদের দাবির আইনগত ভিত্তি বোঝানোর চেষ্টা করলে তারা উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং পরদিন আবারও একই ধরনের ঘটনা ঘটবে বলে হুমকি দেন।
বাগাতিপাড়ার ঘটনায় ৭ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ১০০-১৫০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
উপজেলা প্রশাসনের অভিযোগ, ফ্যামিলি কার্ডের নিয়োগের ফলাফলকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভের একপর্যায়ে সরকারি কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, কর্মকর্তাদের ওপর হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পৃথক দুটি এজাহার দায়ের করা হয়।
লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম বলেন, গতকাল সন্ধ্যায় একটি লিখিত এজাহার পেয়েছি। পরবর্তী ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
বাগাতিপাড়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (এসআই) আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ইউএনও কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় একটি লিখিত এজাহার পেয়েছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
এদিকে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা জানিয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার, রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি, নাটোরের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
আশিকুর রহমান/এমএমবি
