ময়মনসিংহে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, জ্বালানি সংকট দ্রুত সমাধান করা সম্ভব নয়। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলছে, যা যে কোনো সময় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যার ফল। এ সংকট থেকে ভালো অবস্থায় যেতে অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) ময়মনসিংহে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন মিলনায়তনে নজরুল বর্ষ উদযাপন উপলক্ষে দেশব্যাপী প্রাথমিক, কারিগরি ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে বিভাগীয় পর্যায়ের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের লক্ষে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, দেশের মানুষ যথেষ্ট কষ্টের মধ্যে রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নিজেও এ বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। মানুষের দুর্ভোগ সত্য, তবে এর জন্য বর্তমান সরকারকে এককভাবে দায়ী করা সঠিক নয়। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যার ফল হিসেবেই বর্তমান জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে যে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করা হচ্ছে, এর পেছনে দীর্ঘদিনের ঘাটতি রয়েছে। সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার কারণে সংকট আরও প্রকট হয়েছে। দুর্ঘটনার কারণে বন্ধ থাকা দুটি প্ল্যান্ট চালু হলেও দেশে গ্যাসের চাহিদার তুলনায় সরবরাহে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট ঘাটতি থেকে যাবে। এ ঘাটতি এক বছরের বা স্বল্প সময়ের সমস্যা নয়, বছরের পর বছর ধরে তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, দ্রুত সমাধানের জন্য গ্যাসিফিকেশন প্ল্যান্টের দুর্ঘটনার পর একটি প্ল্যান্টের অর্ডার দেওয়া হয়েছে। ব্যাকআপ হিসেবে আরও দুটি প্ল্যান্ট আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে এসব ব্যবস্থা বাস্তবায়নেও কিছুটা সময় লাগবে।
তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুতে রূপান্তরের চেষ্টা চলছে। ভোলায় থাকা গ্যাস মূল ভূখণ্ডে আনার জন্য কী কী করা যায়, তা নিয়েও কাজ চলছে। পাশাপাশি এলএনজি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মধ্যমেয়াদে স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ শুরু হয়েছে। সরকারের কাছে থাকা তথ্য ও জরিপের ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে, দেশের স্থলভাগে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সম্ভাবনা রয়েছে। অথচ বর্তমানে বছরে দেশের প্রায় ১.৩ থেকে ১.৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হয়।
ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, এতদিন স্থলভাগের সম্ভাব্য গ্যাসের মজুত অনুসন্ধানের কাজ করা হয়নি। এখন সেই কাজ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে নতুন করে দুটি রিগ কেনা হয়েছে এবং বিদ্যমান রিগগুলো সক্রিয় রাখার চেষ্টা চলছে। কয়লা নিয়েও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তবে এসব উদ্যোগের ফল পেতে সময় লাগবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জ্বালানি সংকট দ্রুত সমাধান করা সম্ভব নয়। অর্থমন্ত্রী একটি মোটামুটি সময়সীমা দিয়েছেন। অন্তত দুই বছর লাগবে জ্বালানির ক্ষেত্রে ভালো বা অনেকটা ভালো অবস্থায় যেতে।
তিনি বলেন, এলএনজির আন্তর্জাতিক বাজারও বর্তমানে অত্যন্ত অনিশ্চিত। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলছে, যা যে কোনো সময় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি এর আগে হুতিদের সঙ্গে সংকটের সময় বাব-এল-মান্দেব প্রণালিতেও জ্বালানি পরিবহন নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছিল। এসব পরিস্থিতি একসঙ্গে জটিল হলে জ্বালানি সরবরাহ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।
সরকার রাতারাতি সব সমস্যার সমাধান করে ফেলবে- এমন দাবি করছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুই বছরের একটি সময়সীমার মধ্যেও মানুষের জীবনযাত্রা যাতে সহনীয় রাখা যায়, সে চেষ্টা করা হচ্ছে। দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য উদ্যোগগুলোর মধ্যে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো অন্যতম। ইতোমধ্যে সরকারি প্রতিটি স্থাপনায় সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। একইসঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিকে অতীতের দীর্ঘমেয়াদি সংকটের ফল হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অতীতে যেসব সমস্যা তৈরি হয়েছে, তার ফল অনেক সময় পরবর্তী সরকারের ওপর এসে পড়ে। তাই বর্তমান জ্বালানি সংকটের ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতির প্রভাব এখন মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
বিরোধী দলের সমালোচনার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, বিরোধী দল সরকারের সমালোচনা করবে, সেটি স্বাভাবিক। তবে তাদেরও রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে হবে। অপ্রয়োজনে বা অযৌক্তিকভাবে জনগণের সঙ্গে থাকার নামে সরকারের ওপর চাপ তৈরি করতে গিয়ে যদি জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়, তাহলে জনগণ তা প্রত্যাখ্যান করতে পারে।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সচিবালয়ের সামনে কর্মসূচির কারণে যান চলাচল বন্ধ হয়ে জনদুর্ভোগ তৈরি হয়েছিল। জনগণ এসব বিষয় দেখছে। বিরোধী দলের জন্য রাজপথের পরিবর্তে সংসদই সরকারের ভুল-ত্রুটি তুলে ধরার সবচেয়ে ভালো জায়গা।
আগামী ২৭ আগস্ট সংসদ অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিরোধী দল সংসদে গিয়ে যুক্তি দিয়ে সরকারের কোথায় কোথায় ভুল রয়েছে তা তুলে ধরতে পারে। প্রধানমন্ত্রীও তাদের কাছ থেকে বিশ্বাসযোগ্য পরামর্শ চেয়েছেন।
ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, বর্তমান সরকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। জনগণের অসুবিধাকে আমলে নিতে হয়। অন্যের পাপের কারণে মানুষের কষ্ট হলেও সেই কষ্টকে স্বীকার করতে হবে এবং জনগণের জীবন সহজ করতে সরকার যেকোনো ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
ময়মনসিংহ বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির সরকারের সভাপতিত্বে সভায় ময়মনসিংহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবু ওয়াহাব আকন্দ, ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান এবং জেলা পরিষদের প্রশাসক সৈয়দ এমরান সালেহ উপস্থিত ছিলেন।
সাখাওয়াত সুমন/এএমকে
