মামলার শুনানির জন্য সকালেই আদালতে এসেছেন আসমা বেগম। সঙ্গে থাকা মামলার কার্যক্রম শেষ হতে সময় লাগবে আরও কয়েক ঘণ্টা। এ সময়টুকু কোথায় বসে কাটাবেন, সেটিই তার চিন্তা। আদালত চত্বরে ঘুরে বেড়িয়েছেন, বসার জায়গা খুঁজেছেন। অথচ তার জন্যই আদালত প্রাঙ্গণে রয়েছে একটি বিশ্রামাগার। নাম ‘ন্যায়কুঞ্জ’। অথচ আসমা বেগম জানেনই না, সেটি কোথায়।
শুধু আসমা বেগম নন, ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর থেকে আসা বাবুল বনিক ও লোহাগাড়া থেকে আসা ইয়াকুব আলীরও একই অবস্থা। দূর-দূরান্ত থেকে আদালতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করলেও তারা জানেন না বিচারপ্রার্থীদের বিশ্রামের জন্য নির্মিত ন্যায়কুঞ্জের কথা। প্রায় অর্ধকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই বিশ্রামাগারে রয়েছে প্রায় ৪০ জনের বসার ব্যবস্থা, নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা ওয়াশরুম, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং একটি ছোট টি-স্টল। কিন্তু যে মানুষগুলোর জন্য এসব আয়োজন, তাদের কাছেই জায়গাটি যেন অচেনা।
আদালত ভবনের পেছনে ন্যায়কুঞ্জের অবস্থান। ব্যস্ত আদালত চত্বর থেকে সহজে চোখে পড়ে না এটি। কোথায় ন্যায়কুঞ্জ, সেখানে কী সুবিধা রয়েছে এসব জানিয়ে দৃশ্যমান কোনো সাইনবোর্ডও চোখে পড়েনি। তার ওপর নিয়মিত ব্যবহার না হওয়ায় আসবাবপত্র ও বিভিন্ন জায়গায় জমেছে ধুলো।
প্রশ্ন উঠছে, বিচারপ্রার্থীদের স্বস্তির জন্য অর্ধকোটি টাকা খরচ করে যে স্থাপনা নির্মাণ করা হলো, সেটির অস্তিত্বই যদি অধিকাংশ বিচারপ্রার্থী না জানেন, তাহলে এর সুফল তারা পাবেন কীভাবে? ২০২৩ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণে ন্যায়কুঞ্জ নির্মাণ করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল আদালতের বিভিন্ন কার্যক্রমে দূর-দূরান্ত থেকে আসা বিচারপ্রার্থীদের অপেক্ষার সময়টুকু কিছুটা স্বস্তিতে কাটানোর সুযোগ করে দেওয়া।

সরেজমিনে দেখা যায়, আদালত ভবনের পেছনে ন্যায়কুঞ্জটি অনেকটা আড়ালে পড়ে আছে। আদালতের প্রধান প্রবেশপথ থেকে এর অবস্থান সহজে বোঝার উপায় নেই। প্রথমবার আদালতে আসা একজন মানুষকে স্বাভাবিকভাবেই জানতে হবে ন্যায়কুঞ্জ কোথায়। কিন্তু সেই তথ্য জানার সুযোগই যদি না থাকে, তাহলে স্থাপনাটি ব্যবহার করবেন কারা? ন্যায়কুঞ্জের ভেতরে রয়েছে প্রায় ৪০ জনের বসার ব্যবস্থা। নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক ওয়াশরুম, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং একটি ছোট টি-স্টলও রয়েছে।
অর্থাৎ একজন বিচারপ্রার্থীকে কয়েক ঘণ্টা আদালতে অবস্থান করতে হলে প্রয়োজনীয় কিছু মৌলিক সুবিধা এখানে পাওয়ার কথা। কিন্তু নিয়মিত ব্যবহার না হওয়ায় সেই সুবিধাগুলোর কতটা কাজে আসছে, তা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, আসবাবপত্রের বিভিন্ন স্থানে ধুলোর আস্তরণ। আদালতের ব্যস্ততার বাইরে অনেকটা নীরবে পড়ে আছে স্থাপনাটি। অন্যদিকে আদালত প্রাঙ্গণে প্রতিদিনই বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়ন থেকে মানুষ আসেন। তাদের কেউ বাদী, কেউ বিবাদী, কেউ সাক্ষী। কেউ আসেন স্বজনের জামিনের আশায়। মামলার কার্যক্রম শেষ হওয়ার অপেক্ষায় অনেককেই দীর্ঘ সময় আদালত চত্বরে থাকতে হয়। এই অপেক্ষার সময়ে একজন বয়স্ক মানুষ, নারী কিংবা অসুস্থ ব্যক্তির জন্য একটি বসার জায়গা কতটা প্রয়োজন সেটি আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না।
আখানগর থেকে আদালতে আসা পঞ্চাশোর্ধ্ব আসমা বেগম বলেন, তিনি আদালতে এসে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছেন। কিন্তু বিচারপ্রার্থীদের জন্য ন্যায়কুঞ্জ নামে একটি বিশ্রামাগার আছে, তা তিনি জানতেন না। তার মতে, আদালতে আসা মানুষের চোখে পড়ার মতো করে ন্যায়কুঞ্জের অবস্থান জানানো হলে অনেকেই এর সুবিধা নিতে পারতেন।
হরিপুর থেকে আসা বাবুল বনিকের কথাও প্রায় একই। তিনি বলেন, আদালতে এসে কোথায় বসবেন, তা নিয়ে অনেক সময় সমস্যায় পড়তে হয়। ন্যায়কুঞ্জের বিষয়ে আগে জানা থাকলে সেখানে বসতে পারতেন।
লোহাগাড়া থেকে আসা ইয়াকুব আলী বলেন, দূর থেকে আদালতে এসে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। বিশ্রামাগারটি কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে স্পষ্টভাবে জানানো হলে বিচারপ্রার্থীদের উপকার হতো।
জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিনিয়র সহকারী জজ মো. মজনু মিয়া ঢাকা পোস্টকে বলেন, ন্যায়কুঞ্জটি আদালত ভবনের কিছুটা ভেতরে ও আড়ালে অবস্থিত হওয়ায় অনেক বিচারপ্রার্থী সহজে এর অবস্থান বুঝতে পারেন না। তবে বিচারপ্রার্থীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে আদালতের প্রধান ফটকের প্রবেশপথে তথ্যসেবা কেন্দ্রে বসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ন্যায়কুঞ্জটি যাতে বিচারপ্রার্থীরা নিয়মিত ও স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবহার করতে পারেন, সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
রেদওয়ান মিলন/এএমকে
