বিজ্ঞাপন

কলকাতায় হোটেলে অগ্নিকাণ্ড

‘আমার দেবাশীষকে এনে দাও তোমরা’

‘আমার দেবাশীষকে এনে দাও তোমরা’

‘আমার বিশ্বাস হচ্ছে না, দেবাশীষ আর নেই। রাতে কথা হয়েছিল, বলেছিল ব্যাগ গোছাচ্ছি, ভোরে রওনা দেবো। আমার দেবাশীষকে এনে দাও তোমরা।’ এভাবেই নিহত সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের মেয়ে মহিমা দত্তকে বুকে জড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন মা স্বপ্না দত্ত। 

বুধবার (১৯ আগস্ট) দেবাশীষ দত্তের বাড়িতে গেলে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের দেখা মেলে।

মা স্বপ্না দত্ত বলেন, ছোট মেয়েটাকে রেখে চিকিৎসার জন্য কোলকাতায় গেছিল দেবাশীষ। আজকেই আসার কথা ছিল। মেয়েটা আজ এতিম হয়ে গেল। অল্প বয়সে আমার দেবাশীষ চলে গেল। সব শেষ হয়ে গেল আমার। কত খুশি ছিল ও। গতকাল (মঙ্গলবার) ব্যাঙ্গালুর থেকে কোলকাতায় এসে সবার জন্য মার্কেট করেছে। সবকিছু আমাকে দেখাচ্ছিল ভিডিও কলে। দেশে আসবে বলে ও খুব খুশি ছিল। আজ সব শেষ হয়ে গেল।

দেবাশীষ দত্ত ভারতে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার আগে বাবা দিলীপ দত্ত, মা স্বপ্না দত্ত ও আট বছর বয়সী মেয়ে মহিমা দত্তকে রেখা যান। 

মহিমা দত্ত বাবা দেবাশীষ দত্ত, মা আফসানা শিম্মিন ও ছোট ভাই শর্ণশিষ দত্তের মৃত্যুর বিষয় বুঝতে না পারলেও বাড়িতে স্বজন ও দেবাশীষের সহকর্মীদের উপস্থিতি ও কান্নার দৃশ্য দেখে স্তব্ধ হয়ে আছে।

সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়ার এলাকার দিলীপ দত্তের ছেলে। বুধবার সকালে দিলীপ দত্ত ছেলে, পুত্রবধূ ও তাদের সন্তানের মৃত্যুর খবর পান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি ছেলের মরদেহের ছবি দেখেন।

বাবা দিলীপ দত্ত বলেন, প্লেনের টিকিট পায় না, ওই দিকে ট্রেনেরও টিকিট পায় না। এই জন্য আসতে দু-এক দিন দেরি হচ্ছিল। তারপর যখন শুনলো ওর মা খুব অসুস্থ হয়ে গেছে। তারপরে তাড়াহুড়া করে কত টাকা ডোনেশন দিয়ে আবার প্লেনের টিকিট কেটে গত পরশু দিন রাত ১১টার সময় কোলকাতায় এসে পৌঁছায়। রাতে হোটেলে থেকে পরের দিন সকাল থেকে সাড়াদিন কলকাতায় মার্কেট করে। মেয়ের সঙ্গে সব সময় কথা হয় দেবাশীষের। রাত ৯টার সময় দেখলাম মেয়ের সঙ্গে কথা বলছে। মেয়েকে বলছে লাগেজ গোছাচ্ছি। আর ওর ভাই খেলা করছে। 

তিনি বলেন, দেবাশীষের এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ে দেবনিতাকে (৮) রেখে ৩ আগস্ট দেবাশীষ স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে ভারতে যায়। দুই দিন পর তার শ্বশুরও কলকাতায় যান। প্রথমে তারা কলকাতায় দুই দিন ছিলেন। এরপর স্ত্রী ও ছেলের চিকিৎসার জন্য বেঙ্গালুরুতে যায় দেবাশীষ। গত সোমবার রাত ১১টায় প্লেনে কলকাতায় আসে তারা। আজ (বুধবার) সকালে জানতে পারি হোটেল আগুন লেগে শ্বশুরসহ তারা সবাই মারা গেছেন।

প্রসঙ্গত, বুধবার ভোররাতে ভারতের কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে আগুনের ঘটনা ঘটে। এতে ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ও আগুনে পুড়ে নিহত হন ৯ জন। এরমধ্যে কুষ্টিয়ার এই পরিবারের চারজন মারা যান।

কুষ্টিয়ার একই পরিবারের চারজন হলেন- কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজকের আলো পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, আজকের পত্রিকা ও চ্যানেল নাইনের কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি দেবাশিস দত্ত (৩৭), তার স্ত্রী আফসানা শিম্মিন (২৫), দুই বছর বয়সী শিশুপুত্র শর্ণশিষ দত্ত এবং দেবাশীসের শ্বশুর কুষ্টিয়া শহরের থানাপাড়ার বাসিন্দা আকরাম আলী (৬৪)।

মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় একই পরিবারের চারজনের নির্মম মৃত্যুতে তার স্বজনসহ কুষ্টিয়ার সাংবাদিক সমাজের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

রবিউল আলম ইভান/এএমকে