খালের ওপর ভাসছে সারি সারি নৌকা। কখনো বৃষ্টির ফোঁটায় ভিজছে, আবার কখনো তীব্র রোদের তাপে শুকিয়ে যাচ্ছে কাঠের নৌকাগুলো। খালের পাড়ের সড়কজুড়েও যেন নৌকার মেলা।
পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার কুড়িয়ানা খালে সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার ও সোমবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বসে এই ঐতিহ্যবাহী নৌকার হাট। এক সময় মানুষের নিত্যদিনের প্রয়োজন মেটাতে গড়ে ওঠা এই হাট এখন হয়ে উঠেছে ঐতিহ্য, জীবিকা ও পর্যটনের এক অনন্য মিলনস্থল। খালের জলে দুলতে থাকা সারি সারি নৌকা যেন শুধু কাঠ আর পেরেকের তৈরি কোনো বাহন নয়, এর প্রতিটি কাঠের গায়ে লেগে আছে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা, কৃষি, ব্যবসা আর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা এক পুরোনো ঐতিহ্যের গল্প। বর্ষা এলে তাই কুড়িয়ানা খালে শুধু নৌকা ভাসে না, ভেসে ওঠে শত বছরের এক জীবন্ত ইতিহাস।
জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষ দিকে কিংবা আষাঢ়ের শুরু থেকে জমে উঠতে শুরু করে হাটটি। বছরের পর বছর ধরে স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে মিশে আছে এই নৌকার হাট। এই অঞ্চলে নদী ও খালপথে চলাচলের প্রচলন দীর্ঘদিনের। আর সেই প্রয়োজনকে ঘিরেই বছরের পর বছর ধরে টিকে আছে কুড়িয়ানা খালের এই ঐতিহ্যবাহী নৌকার হাট।
এ হাটকে কেন্দ্র করে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। নৌকা বিক্রেতারা খালের পাড়ে সারি করে সাজিয়ে রাখেন নানা আকারের নৌকা। আর এসব নৌকা কিনতে নেছারাবাদসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসেন ক্রেতারা। আকার ও মানভেদে প্রতিটি নৌকা ২ থেকে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। প্রতি হাটে প্রায় ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত নৌকা বিক্রি হয়। প্রতি মৌসুমে ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার নৌকা বিক্রি হয়।
নৌকার বিক্রেতা হাবিবুর রহমান বলেন, ২০ যাবৎ এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আমরা এখানে খুব অল্প টাকায় লাভ করি। বেশি নৌকা বিক্রি করি। আমাগো এই জাগার মত কম দামে নৌকা আর কোথাও পাবে না। তাই বিভিন্ন জেলা দিয়ে আমাগো দ্বারে নৌকা কিনতে আসে মানুষ। আমাগো বাপ দাদারাও এই ব্যবসা করছে করি। আমরা তাগো ঐতিহ্য ধরে রাখতেছি।

নেছারাবাদ, ঝালকাঠির ভীমরুলি ও বরিশালের বানারীপাড়াসহ দক্ষিণাঞ্চলের এলাকাগুলোতে ব্যাপক আকারে পেয়ারা ও আমড়া হয়। বর্ষা মৌসুমে শস্য ও পেয়ারার উৎপাদন বেড়ে গেলে কৃষকরা ভাসমান বাজারে ছোট ছোট ডিঙি নৌকায় বেচাকেনার জন্য ব্যবহার করেন নৌকাগুলো। এছাড়াও বিভিন্ন মাছের খামারের জন্য, বর্ষায় কৃষিকাজে এই নৌকার প্রয়োজন হয়।
ঝালকাঠির থেকে নৌকাটিতে আসা কৃষক মো. শিকদার মোল্লা বলেন, বর্ষায় ধান খেতে পানি ওঠে।ফসল কাটা, ফসল ঘরে নেওয়ার কাজে নৌকা ব্যবহার করি। এছাড়া আমার একটা মাছের গেট আছে এটার জন্য নৌকা লাগবে। মাছের খাবার দিতে নৌকার প্রয়োজন হয়। তাই আসলাম নৌকা কিনতে এই ঘাটে। এই জায়গায় দাম কম, নৌকাগুলো ভালো। একটি নৌকা ৩৫০০ টাকায় কিনেছি, আরও একটি নৌকা কিনবো এজন্য বাজার ঘুরে দেখতেছি।
নৌকার সঙ্গে সঙ্গে আলাদাভাবে বিক্রি হয় নৌকার বৈঠাও ১৫০ টাকা থেকে ৭০০ টাকার মধ্যে মিলে ছোট বড় মাঝারে বৈঠা। বৈঠা বিক্রেতা কুদ্দুস মিয়া বলেন, প্রতিহাটে ১০০-১৫০ পিস বৈঠা বিক্রি করি। সাইজ অনুযায়ী দাম দাম ২০০ টাকা ৩০০ টাকা, ১০০ দেড়শ টাকারও আছে। এই বর্ষার সময় ব্যাপক চাহিদা।
আটঘর-কুড়িয়ানার শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী নৌকার হাট থেকে দক্ষ কারিগরদের তৈরি নিখুঁত হাতের ঐতিহ্যবাহী নৌকা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে জাপান, চীন, মালয়েশিয়া ও জার্মানির মতো বিভিন্ন দেশেও রপ্তানি ও সমাদৃত হচ্ছে। এছাড়া বর্ষা মৌসুমে স্বরূপকাঠির পেয়ারা বাগানের পাশাপাশি শতবর্ষেরও বেশি পুরোনো এই নৌকার হাটের সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশ-বিদেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন পর্যটকরা। ফলে এটি এখন শুধু বেচাকেনার স্থান নয়, পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
স্বরূপকাঠির নৌকা কারিগর বিমল হালদার বলেন, আমার কাছে ওয়ার্ডার দিয়ে নৌকা বানিয়ে নিয়েছে চীন, জাপান, জারমান ও সিঙ্গাপুরের লোকরা। আমি দীর্ঘ বছর ধরে বিভিন্ন আকারের নৌকা তৌরী করি এবং আমার কাছ থেকে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা নৌকা গুলো কিনে বিক্রি করেন।

স্বরূপকাঠি (নেছারাবাদ) বাসিন্দা মোস্তফা বলেন, এই ভাসমান নৌকার হাটটি প্রায় ২শ বছর আগে থেকে শুরু হয়। ঐতিহ্যবাহী এই নৌকার বাজারে সারাদেশ থেকে প্রতিদিন কয়েক হাজার পর্যটন ঘুরতে আসে। এছাড়া কিছুদিন আগে দেশের বাইরে চীন থেকে কিছু লোক এসে ১০টি নৌকা এখান থেকে বানিয়ে নিয়ে গেছেন। থাইল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড ও মালয়েশিয়া থেকেও পর্যটকরা এই হাটে ঘুরতে আসেন। আমার বাবার দাদার আমল থেকে শুনে এসেছি এখানে নৌকা তৈরি হয়, সেই ঐতিহ্য এখানকার স্থানীয়রা ধরে রেখেছেন।
তবে পর্যটকদের জন্য এখানে রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। খালে নেই কোনো পাকা ঘাট, নেই পর্যাপ্ত শৌচাগার বা বিশ্রামের ব্যবস্থা। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে নৌকার হাটটি আরও আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
পিরোজপুর থেকে ঘুরতে আসা মাহিম নামে এক কলেজ শিক্ষার্থী বলেন, আমি এই স্বরূপকাঠিতে দুটি পর্যটন কেন্দ্র ঘুরতে এসেছি। একটি হলো ভাসমান নৌকার হাট ও অপরটি পেয়ারা পার্ক। দুটোই সুন্দর পরিবেশ, তবে এর পাশাপাশি কিছু বড়ো সমস্যাও রয়েছে। এখানে কোন আবাসিক হোটেল বা সরকারিভাবে ওয়াশরুম না থাকায় আমরা ফ্রেশ হতে পারছি না, এ ক্ষেত্রে মা-বোনদের বেশি কষ্ট হচ্ছে। তা ছাড়া আমাদের গাড়ি গুলো রাখার কোনো ব্যবস্থা নেই এবং একটি রেস্ট হাউস নেই। এগুলো যাতে ব্যবস্থা করা হয় সেজন্য আমি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই স্থাপনাগুলো নির্মাণ করা হলে, এখানে সুন্দর একটি পরিবেশ তৈরি হবে এবং বাজারটি আরও প্রসারিত হবে। এতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে।
আটঘর-কুড়িয়ানা নৌকার হাটের ইজারাদার হুমায়ুন মোল্লা জানান, প্রতি হাটে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০টি নৌকা বেচাকেনা হয়। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে নৌকা কিনতে আসেন।
তিনি বলেন, আমাদের এই হাটের বয়স প্রায় ১০০ বছরের বেশি। প্রতি বছর সরকারিভাবে হাটটি ইজারা দেওয়া হয়। আমরা এ বছর ইজারা পেয়েছি। নৌকা বিক্রির ওপর নির্ধারিত হারে ইজারা আদায় করা হয়। কিন্তু হাটটি সরকারি ইজারায় চললেও প্রয়োজনীয় উন্নয়ন হয়নি। এখানে বেশ কিছু উন্নয়নমূলক কাজ দরকার। এসব করা হলে ব্যবসায়ী ও পর্যটক দুই পক্ষই উপকৃত হবে।

নেছারাবাদ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) অমিত দত্ত বলেন, শতবর্ষী এই নৌকার হাটে প্রতি বছর প্রায় ১০ কোটি টাকার নৌকা বিক্রি হয়। সপ্তাহে প্রতি সোম ও শুক্রবার এ হাট বসে। এখানে দূরদূরান্ত থেকে পর্যটকরা ঘুরতে আসে। আমরা পর্যটকদের কথা চিন্তা করে তিনটি পেয়ারা পার্কে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ওয়াশব্লক করেছি। এছাড়া নৌকার হাটসহ আরও কয়েকটি স্থানে ওয়াশব্লক করার পরিকল্পনা রয়েছে, বরাদ্দ পেলে আমরা কাজ শুরু করতে পারবো। তা ছাড়া পর্যটকদের জন্য কিছু নির্দেশনা রয়েছে, সেগুলো যারা না মানে তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।
পিরোজপুর বিসিক এর উপব্যবস্থাপক এইচ এম ফাইজুর রহমান বলেন, এ হাট বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে জমে ওঠে। আমরা শতবর্ষী এই নৌকার হাটের ব্যবসায়ীদের ঋণ সহায়তা দিয়ে থাকি এবং তাদেরকে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়। এছাড়া সার্বিক সহযোগিতায় আমরা সার্বক্ষণিক নজরদারি করছি।
আরকে
