বিজ্ঞাপন

খুলনায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক, এক সপ্তাহে ৭ জনের মৃত্যু

খুলনায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক, এক সপ্তাহে ৭ জনের মৃত্যু

খুলনায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। চলতি আগস্ট মাসে বিভাগে পরিস্থিতি রীতিমতো ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন নতুন রোগী ভর্তির রেকর্ড ভাঙার পাশাপাশি হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। খুলনা বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ১৭৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং দুই জনের মৃত্যু হয়েছে।

অন্যদিকে গত এক সপ্তাহেই জেলায় আইনজীবীসহ অন্তত ৭ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের সার্বিক চিত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত ১৪ আগস্ট খুলনা জেলায় ২ জনের মৃত্যু হয়। এরপর ১৭ আগস্ট থেকে বুধবার পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে একজন করে আরও ৩ জন মারা গেছেন। আর গত ২৪ ঘণ্টায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজন এবং গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

হাসপাতালগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর চাপ হু-হু করে বাড়ছে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডেঙ্গু ওয়ার্ডগুলোতে রোগীদের জায়গা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও সাধারণ মানুষকে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন। এছাড়াও খুলনা সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বাড়ির আঙ্গিনা অপরিচ্ছন্ন থাকায় ৯ জনকে ১৪ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

জানা গেছে, বুধবার (১৯ আগস্ট) দিবাগত রাত ১টা ৩০ মিনিটে গাজী মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় খুলনার বড় মির্জাপুরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে শামীমা ইয়াসমিন পলি (৪০) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। শামীমা ইয়াসমিন পলির দোয়া (৯) ও দিনি (৬) নামে দুইজন কন্যা সন্তান রয়েছে। তার স্বামী হাসিবুর অমি একটি বীমা কোম্পানিতে কর্মরত। তারা নগরীর ১/১, ইউসুফ রোডের বড় মির্জাপুরের বাসিন্দা। গত ১৫ আগস্ট পলির ডেঙ্গু পজিটিভ শনাক্ত হয়। তাৎক্ষণিক তাকে গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এছাড়া খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে।  

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় পরিচালকের (স্বাস্থ্য) কার্যালয় থেকে প্রকাশিত ২০ আগস্টের প্রতিবেদনে জানা যায়, নতুন ভর্তি হওয়া ১৭৩ জনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী খুলনা জেলায়। গত ২৪ ঘণ্টায় খুলনা জেলা সদরে ৫১ জন এবং খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে ৪২ জনসহ মোট ৯৩ জন ভর্তি হয়েছেন।

এছাড়াও বাগেরহাটে ৩৮, যশোরে ১৯, সাতক্ষীরায় ৭ (জেলা সদর ২ ও মেডিকেল কলেজ ৫), মাগুরায় ৬, কুষ্টিয়ায় ৩, মেহেরপুরে ৩, নড়াইলে ২ এবং ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গায় ১ জন করে রোগী ভর্তি হয়েছেন।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত খুলনা বিভাগে মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা পৌঁছেছে ৩ হাজার ৯৯৬ জনে। বিভাগে এ পর্যন্ত সরকারি খাতায় মোট ১৬ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে সর্বোচ্চ ১৩ জনই মারা গেছেন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। বাগেরহাটে ১ ও খুলনায় ২ জনের মৃত্যু দেখানো হয়েছে।

চিকিৎসাধীন অবস্থা থেকে এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৩ হাজার ৪৩৫ জন। বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ৫০৬ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন এবং গুরুতর হওয়ায় ৩৯ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার্ড করা হয়েছে।

ডেঙ্গুর এই দ্রুত বিস্তারে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে স্থান সংকট দেখা দিয়েছে। রোগী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। স্থানীয় বিশেষজ্ঞরা এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে অবিলম্বে কার্যকর ক্রাশ প্রোগ্রাম পরিচালনা এবং জ্বর হওয়ার সাথে সাথেই রোগীদের ডেঙ্গু পরীক্ষা করার পরামর্শ দিচ্ছেন।

এদিকে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধে মহানগরীর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিয়ন্ত্রণে কেসিসি পরিচালিত ক্রাশ প্রোগ্রামের আওতায় বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) নগরীতে মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়েছে। কেসিসির এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল্লাহ আল ইমরানের নেতৃত্বে এ মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়।

মোবাইল কোর্ট পরিচালনার চতুর্থ দিনে বাড়ির আঙ্গিনা অপরিচ্ছন্ন থাকায় নগরীর ইসলামপুর রোডস্থ শেখ আব্দুল হামিদকে এক হাজার টাকা ও মিঠুন বিশ্বাসকে ৫০০ টাকা, দোলখোলা রোডের আব্দুল হালিমকে ৩ হাজার টাকা ও তহুরা খাতুনকে এক হাজার টাকা, বাগমারা মেইন রোডস্থ আসাদুল হককে ৩ হাজার টাকা,  সিদ্দিকুর রহমানকে এক হাজার টাকা ও মিতুকে ২ হাজার টাকা, মতলেব মোড়ের হৃদয় হোসেনকে ২ হাজার টাকা ও পারভিন আক্তারকে ৫০০ টাকা জরিমানা করে তাৎক্ষণিক আদায় করা হয়।

কেসিসি সূত্রে জানা যায়, নগরীর পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে কেসিসি পরিচালিত কর্মসূচির পাশাপাশি নিজ নিজ বাড়ি অথবা স্থাপনার সীমানার মধ্যে মশার প্রজনন স্থান অথবা মশার লার্ভা পাওয়া গেলে বাড়ির মালিকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি এড়াতে নিজ নিজ বাড়ি অথবা স্থাপনার মধ্যে টায়ার, কৌটা, ডিমের খোসা, ডাবের খোল, ফুলের টব, বেসিনের নিচে, ফ্রিজের পাশে, এসির পাশে, সানসেটে পানি জমে আছে কিনা সেদিকে লক্ষ্য রাখাসহ বাড়ির আঙ্গিনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।  

কেসিসির প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, খুলনায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে কেসিসি ব্যাপক কাজ করছে। নগরবাসীকে সতর্ক করতে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এছাড়াও খুলনা মেডিকল কলেজ হাসপাতাল, সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। তারা সেখানে কাজ করছে। আক্রান্তের হার বিবেচনা করে নগরীর ওয়ার্ডগুলোকে রেড, কমলা ও হলুদ জোনে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে ১০টি ফগার মেশিন ও হ্যান্ড স্প্রের সাহায্যে মশক নিধনের কাজ চলছে। এ ছাড়াও উন্মুক্ত স্থান ও বড় নালার মশা মারতে প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি হুইল ব্যারো ফগার মেশিন (ধোঁয়া দিয়ে মশা মারার যন্ত্র) ব্যবহার করা হচ্ছে। 

মোহাম্মদ মিলন/আরএআর

বিজ্ঞাপন