বিজ্ঞাপন

এক সময়ের সাঁতার না জানা আতিক এখন জাতীয় প্রশিক্ষক, ঝুলিতে ৩৩০ পদক

এক সময়ের সাঁতার না জানা আতিক এখন জাতীয় প্রশিক্ষক, ঝুলিতে ৩৩০ পদক

নদীবেষ্টিত এলাকায় জন্ম ও বেড়ে উঠলেও একসময় সাঁতার জানতেন না নাটোরের গুরুদাসপুরের সন্তান আতিকুর রহমান আতিক (৪৫)। কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও প্রচেষ্টায় সেই আতিকই এখন দেশের অন্যতম সেরা সাঁতার প্রশিক্ষক। সাঁতারু ও প্রশিক্ষক হিসেবে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় সাফল্য অর্জন করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি পেয়েছেন তিনি। প্রশিক্ষক হিসেবে তার ঝুলিতে রয়েছে ৩৩০টি পদক। এর মধ্যে ৩২৫টি জাতীয় এবং পাঁচটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের।

সম্প্রতি বাংলাদেশ সুইমিং ফেডারেশনের এডহক কমিটির সদস্য মনোনীত হয়েছেন আতিকুর রহমান। নাটোর জেলা থেকে তিনিই প্রথম এ পদে মনোনীত হয়েছেন।

নাটোরের গুরুদাসপুর পৌরসভার খলিফাপাড়া মহল্লায় আতিকুর রহমানের বাড়ি। আত্রাই ও নন্দকুঁজা নদীবেষ্টিত এলাকায় বেড়ে উঠলেও শৈশবে সাঁতারে দক্ষ ছিলেন না তিনি। ১৯৯৭ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগদানের পরই তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। সেখানেই শুরু হয় তার সাঁতারের আনুষ্ঠানিক যাত্রা।

সেনাবাহিনীতে যোগদানের পর বগুড়া ক্যান্টনমেন্টের ২৬ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সামসুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে সাঁতারে নিবিড় প্রশিক্ষণ নেন আতিক। মেধা ও কঠোর পরিশ্রমে মাত্র দুই বছরের মধ্যে ১৯৯৯ সালে বগুড়া অঞ্চলের সেরা সাঁতারু হিসেবে স্বীকৃতি পান তিনি।

এরপর তাকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। সাঁতারু হিসেবে সাফল্যের পর প্রশিক্ষকের দায়িত্ব নেন আতিকুর। সেনাবাহিনীর সদস্যদের নিয়ে দল গঠন করে তাদের পেশাদার সাঁতারু হিসেবে গড়ে তোলার কাজে মনোনিবেশ করেন। ১৯৯৯ সাল থেকে ২০১৬ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়া পর্যন্ত তার প্রশিক্ষণে বিভিন্ন দল আন্তঃইউনিট, আন্তঃবাহিনী ও জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় ৩২৫টি পদক অর্জন করে।

জাতীয় পর্যায়ের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও রয়েছে তার সাফল্য। প্রশিক্ষক হিসেবে ২০০৪ সালের পাকিস্তান সাফ গেমস, ২০০৬ সালে শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতা এবং ২০০৮ সালের ইন্দো-বাংলা গেমসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইভেন্টে অংশ নেন তিনি। এসব প্রতিযোগিতা থেকে দেশের জন্য আসে পাঁচটি আন্তর্জাতিক পদক।

অবসরপ্রাপ্ত এই সেনাসদস্যের সর্বশেষ অর্জন বাংলাদেশ সুইমিং ফেডারেশনের এডহক কমিটির সদস্যপদ। নাটোর জেলা থেকে তিনিই প্রথম এ সম্মান অর্জন করেছেন। 

আতিকুর রহমান বলেন, প্রায় ২০ বছর সেনাবাহিনীতে চাকরি করেছি। পরিশ্রম, মেধা ও কৌশল কাজে লাগিয়ে সাঁতারে ভালো করার চেষ্টা করেছি। নিজের পাশাপাশি সেনাবাহিনীতে দক্ষ সাঁতারু তৈরির কাজ করেছি। অবসরের পরও বিভিন্ন ইউনিটে কোচ হিসেবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দায়িত্ব পালন করছি।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের পাশাপাশি নিজ এলাকার কিশোর-তরুণদের খেলাধুলায় দক্ষ করে গড়ে তুলতেও কাজ করছেন তিনি। গুরুদাসপুরে গড়ে তুলেছেন ভোরের ‘ডাক ফুটবল একাডেমি’। এ একাডেমির মাধ্যমে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সাঁতার ও ফুটবল প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা প্রতিভাবান কিশোর-তরুণদের নিয়ে এখন নতুন স্বপ্ন দেখছেন আতিক। তিনি জানান, গ্রামাঞ্চলে অসংখ্য প্রতিভা রয়েছে। কিন্তু সুযোগ ও যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাবে তাদের অনেকেই হারিয়ে যায়। তাই প্রত্যন্ত এলাকার এসব প্রতিভা খুঁজে বের করে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সাঁতার ও ফুটবলে জাতীয় পর্যায়ে তুলে আনতে চান তিনি। নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড় তৈরির মধ্য দিয়ে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে আরও বড় অবদান রাখাই তার লক্ষ্য।

গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাহমিদা আফরোজ বলেন, ফুটবল একাডেমির মাধ্যমে আতিকুর রহমান ও পলান ঘোষ এ অঞ্চলের জন্য নিবেদিতভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের প্রচেষ্টায় অনেক প্রতিভাবান ছেলেমেয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উঠে আসবে।

আশিকুর রহমান/আরকে

বিজ্ঞাপন