মানিকগঞ্জে শহীদ মিনারে কিশোর শিহাবের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের পর তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তুমুল আলোচনা-সমালোচনা। এক পক্ষ তাকে ছাত্রলীগের কর্মী দাবি করে হত্যার অভিযোগ তোলে। অন্য পক্ষের দাবি, জুলাই আন্দোলনে যোগ দেওয়ায় আওয়ামী লীগের লোকজন তাকে হত্যা করেছে।
তবে সরেজমিনে অনুসন্ধান করে শিহাবের কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সত্যতা মেলেনি। পুলিশ ও স্বজনরা এসব দাবিকে ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে জানিয়েছেন।
এর আগে গত ৯ আগস্ট মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার ধলেশ্বরী ব্রিজ-সংলগ্ন খেলার মাঠের পাশের শহীদ মিনার থেকে শিহাব (১৫) নামে ওই কিশোরের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে নানা পোস্ট ও মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ে।
নবম শ্রেণিতে পড়াকালীন লেখাপড়া বাদ দিয়ে বিভিন্ন কাজ করতেন শিহাব। জীবিকার তাগিদে গত এক বছর যাবত বিভিন্ন রকমের কাজ করছেন। সর্বশেষ তিনি মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে মাছ বাজারে এক দোকানে মাছ কাটার কাজ করতেন। এ ঘটনায় শিহাবের নানা আকরাম হোসেন বাদী হয়ে মানিকগঞ্জ সদর থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ, ছাত্রলীগের অফিসিয়াল পেজ এবং সংগঠনটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যসহ কয়েকজন নেতা-কর্মীর পোস্টে দাবি করা হয়, শিহাব ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তাকে বিএনপি-জামায়াতের কর্মীরা হত্যা করে মরদেহ শহীদ মিনারে ঝুলিয়ে রেখেছে বলেও এসব পোস্টে অভিযোগ করা হয়।
অন্যদিকে, বিভিন্ন ফেসবুক আইডি থেকে ছড়ানো পোস্টে দাবি করা হয়, শিহাব আগে ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরে জুলাই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল। এ কারণে আওয়ামী লীগের ‘সন্ত্রাসীরা’ তাকে হত্যা করেছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
তবে স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে, শিহাবের স্বজন ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে এবং পুলিশের বক্তব্য পর্যালোচনা করে তার কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ মেলেনি। এমনকি তাকে ছাত্রলীগের কর্মী কিংবা জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দেওয়ার মতো কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ মেলেনি।
শিহাবের স্বজনদের দাবি, তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টি তারা জানেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে যেসব রাজনৈতিক পরিচয় ও হত্যার দাবি ছড়ানো হচ্ছে, সেগুলো সত্য নয়।
পুলিশ জানিয়েছে, শিহাবের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবিগুলোর সত্যতা তারা পায়নি। মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেউ যেন যাচাই-বাছাই ছাড়া বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে না করে, সে বিষয়েও সতর্ক করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিহাবের বাবার বাড়ির পাশে স্থানীয় এক যুবক বলেন, আমরা তাকে কখনোই রাজনীতি করতে দেখিনি। সে মাছের বাজারে কাজ করত শুনেছি।
শিহাবের নানা আকরাম হোসেন বলেন, ‘আমার নাতি বাজারে মাছ কাটে। সেদিন বাজারে যায় নাই। পরে আমাকে বলছে, “নানা ৫০০ ট্যাকা লাগবো”। আমি বললাম ট্যাকা দিয়া কি করবা? প্রতিদিন তুমি ট্যাকা ন্যাও, বাজারে ৫০০ ট্যাকা কামাই করো সেইটারেও আমরা খোঁজ নেই না, তো তুমি এখন ট্যাকা দিয়া কি করবা? বলল, “ভাই আমি নৌকা ভ্রমণে যাব”। তখন আমি বললাম, নৌকা ভ্রমণে যেদিন যাও তার আগের দিন আমাকে বইলো আমি চেষ্টা নিব, এখন এই মুহূর্তে আমার কাছে নাই। বলার পরে বাইর হইয়া গেলো “নানা ঘুইরা-ঘাইরা আসি”। ওই রাইতে আর বাড়ি ফিরে নাই। পরে ফোন দিলাম বলল, “আমি আমার এক বন্ধুর বাসায় আছি”। সকাল ৬টার সময় খবর পাইলাম লোকজন বলল, “তোমার নাতির মরদেহ শহীদ মিনারে ঝুলতেছে”। আমরা ঘুমে থিকা উইঠা আইসা দেখলাম সত্য ঘটনা, আইসা পাইলাম ওইখানে লাশ। এইটা ভালো-মন্দ কাউকে দোষারোপ করি না আমরা।’
তিনি আরও বলেন, ‘কোনো রাজনীতিতে নাই ও বাজারে মাছ কাটে এইটাই ওর রাজনীতি। তা ছাড়া কোনো রাজনীতি নাই ওর। কাস্টমারে মাছ দেয় ও মাছ কাইটা দেয়। কাস্টমার ট্যাকা দেয় ওই ট্যাকা ইনকাম কইরা ও বাড়ি চলে আসে। কোথাও কোনো রাজনীতির মধ্যে ও জড়িত নাই।’
এদিকে ভিন্ন দাবি শিহাবের বাবার। তিনি বলেন, ‘রোজার ঈদের ছুটিতে শিহাব বাড়িতে আসে। আসার পর সে আমার এই বাড়িতেই থাকে। সে বলছে, আমার ভালো লাগে না, আমি এই যায়গায়ই থাকুম। কেউরে দেখতে পাই না, ওইখানে সবাই ওচেনা মানুষ এরকম লাগে, এই কারণে ও বাড়ি রইলো। ও ওর নানি বাড়ি গেছে এক মাসের মতো হইলো। তো ৮ তারিখে আনুমানিক ৮টার দিকে ওর সঙ্গে আমার কথা হয়। কথা বলার পরে ওরে আমার স্বাভাবিক মনে হয়। ৯ তারিখ সকালে আমার ছোট ভাই বলে, বাড়িতে আয় ওই যায়গায় নাকি ওর লাশ ঝুলানো রইছে। তখন আমি চইলা আসি। আসতে আসতে গাড়ি জ্যামে পড়ে ৩-৪ ঘণ্টা লেগে যায়। আমাকে সেই লাশ দেখতে হইছে মর্গে গিয়ে, কাটার আগে। তার শরিরে আঘাতের যে চিহ্ন ছিল, এটা আত্মহত্যা নয়, এটা মার্ডার।’
শিহাবের কাকা বলেন, ‘এলাকাবাসীর থেকে খবর পাই জাগীর ব্রিজের ওইখানে শহীদ মিনারে তার ঝুলন্ত লাশ পাওয়া গেছে। যাইয়া দেখি আমার ভাইস্তার লাশ শহীদ মিনারে ঝুলাইয়া রাখছে। লাশ যেভাবে ঝুলাইয়া রাখছে সে যদি আত্মহত্যা করত তাহলে তার পায়ের নিচে চকি থাকত বা যে কোন কিছু থাকত। কোনো কিছুই ছিলো না। এটা আত্মহত্যা কিভাবে মেনে নেওয়া যায়।’
মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড মাছ বাজারের মাছবিক্রেতা মনির বলেন, ‘ও তো কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না। ও কাজ করতো। শনিবার দিন ছুটি নিছে, পরে ও আর আসে নাই। শুক্রবার ও আমার সঙ্গে কাজ কইরা গেছে।’
লাশের সুরতহাল প্রতিবেদনকারী মানিকগঞ্জ সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আয়নাল হক জানিয়েছেন, সুরতহাল প্রতিবেদনের সময় তার বাম হামকতের কনুই এর পাশে হালকা আচরের দাগ ছিল। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা গেছে, এটি মার্ডার নয় আত্মহত্যা। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পেলে বিষয়টি নিশ্চিত করা যাবে।
এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনির হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, শিহাবের রাজনৈতিক কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। সুরতহাল প্রতিবেদনের সময় আমি দেখেছি ওর বা হাতে হালকা আচরের দাগ আছে। তবে এটা সামান্য, এটা নিয়ে ভিন্ন দাবির সুযোগ নেই। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা যাচ্ছে, এটা আত্মহত্যা। তবে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসলে বিস্তারিত বলা যাবে। এই বিষয়ে শিহাবের নানা একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছেন।
সাইফুল ইসলাম/এএমকে
