মাদক ও ক্যাসিনো জুয়ার প্রতিবাদ করায় লালমনিরহাটে আহত সেই কলেজশিক্ষক আরিফুল ইসলাম (৩৫) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। শুক্রবার (২১ আগস্ট) রাতে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
মৃত কলেজশিক্ষক আরিফুল ইসলাম আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের গন্ধমরুয়া এলাকার আবু বক্কর সিদ্দিকের ছেলে এবং লালমনিরহাট সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, মাদক, জুয়া ও বাল্য বিয়েসহ নানা সামাজিক অপরাধ দমনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু আলোকিত লালমনিরহাট নামে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। এ সামাজিক আন্দোলনের কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার। ওয়ার্ড পর্যায় থেকে মূল কমিটিতে শিক্ষকসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তারই ধারাবাহিকতায় শিক্ষক আরিফুল ইসলাম নিজ জন্মস্থান উত্তরের ভারতীয় সীমান্ত ঘেঁষা দুর্গাপুর ইউনিয়নের গন্ধমরুয়া গ্রামের মাদক ও জুয়া চক্রকে সতর্ক করেন এবং এসব থেকে সরে আসার আহ্বান জানান।
তার গ্রামের মৃত আনোয়ার হোসেনের ছেলে রহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে ওই গ্রামের হাসান আলী, মেহেদী হাসান, পারভেজ, মমিন মিয়া ও হৃদয় মিয়াসহ কয়েকজনের নেতৃত্বে একটি বড় অনলাইন জুয়া পরিচালিত হচ্ছে। এ খবরে তাদেরকে ডেকে নিয়ে সতর্ক করে এসব থেকে সরে আসার আহ্বান জানান কলজ শিক্ষক আরিফুল ইসলাম। সরে না এলে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে অবগত করার ঘোষণা দেন তিনি। সমাজ থেকে সামাজিক অপরাধ দমনের এ ঘোষণা কাল হয়ে দাঁড়ায় কলেজশিক্ষক আরিফুলের।
গত ১ আগস্ট প্রতিদিনের মত কলেজ থেকে বাড়ি ফিরছিলেন আরিফুল ইসলাম। এ সময় ওঁৎ পেতে থাকা রহিদুলের নেতৃত্বে জুয়া চক্রটি দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে শিক্ষক আরিফুলের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলাকারীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে আরিফুলের মাথায় কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম করে।
পরে স্থানীয়রা রক্তাক্ত অবস্থায় আরিফুলকে উদ্ধার করে প্রথমে লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাৎক্ষণিক তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করে। সেখানে অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা এভারকেয়ার হাসপাতালের আইসিইউ ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বিভিন্ন হাসপাতালে টানা ২১ দিন বেঁচে থাকার লড়াই করে শুক্রবার মৃত্যুর কাছে হার মেনে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান কলেজশিক্ষক আরিফুল ইসলাম।
এদিকে গত ৬ আগস্ট আরিফুলের গর্ভবতী স্ত্রী ক্লিনিকে অস্ত্রপাচার করে ছেলে সন্তানের জন্ম দেন। সমাজ আলোকিত করতে গিয়ে কলেজশিক্ষক আরিফুলের পরিবার আজ দিশেহারা। সদ্য প্রসূত সন্তানের মুখও দেখে যেতে পারেননি আরিফুল।
এ ঘটনায় শিক্ষক আরিফুলের বাবা আবু বক্কর সিদ্দিক বাদী হয়ে পরদিন ২ আগস্ট রহিদুলকে প্রধান করে ১০ জনের বিরুদ্ধে আদিতমারী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। সেই মামলায় ৮ জন আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পেলেও পলাতক থাকা প্রধান অভিযুক্ত রহিদুলকে গত ১২ আগস্ট রাতে রাজধানী ঢাকার হাতিরঝিল নয়াটোলা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে র্যাব।
এদিকে কলেজশিক্ষক আরিফুলের মৃত্যুর খবরে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী অভিযুক্তদের বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ করছে।
আদিতমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুস সাকিব সজীব ঢাকা পোস্টকে বলেন, আরিফুলের মৃত্যুর খবরে এলাকাবাসী অভিযুক্তদের বাড়িতে ভাঙচুর করছে। এমন একটি খবরে ঘটনাস্থলে অফিসার পাঠানো হয়েছে। আমি নিজেও ঘটনাস্থলে যাচ্ছি। পরে বিস্তারিত জানাতে পারব।
মুরাদ মুর্শিদ/এসএইচএ
