বাবা নেই এক দশক ধরে। অভাবের সংসারে অন্যের বাড়িতে কাজ করে মেয়েকে বড় করা মায়ের দুশ্চিন্তার শেষ ছিল না মেয়ের বিয়ে নিয়ে। ঠিক তখনই বাবার স্নেহের ছায়া হয়ে পাশে দাঁড়ালেন নাটোরের বড়াইগ্রামের ব্যবসায়ী রুহুল আমিন রুবেল।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে তিনি বিয়ে দিলেন রাজশাহীর সুমাইয়া আক্তার তিথিকে। এটি তার উদ্যোগে দেওয়া ১১২তম মেয়ের বিয়ে।
রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার বালাদিয়া গ্রামে তিথিদের জরাজীর্ণ বাড়িটি এদিন সেজেছিল উৎসবের রঙে। বাড়ির সামনে কারুকাজ করা গেট, ভেতরে বরযাত্রী ও অতিথিদের জন্য সাজানো চেয়ার-টেবিল। এক পাশে চলছিল গরু, খাসি ও মুরগির মাংসসহ পোলাও রান্নার বিশাল আয়োজন। চারপাশের এই ব্যস্ততা দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে, এটি এক বাবা-হারা অসহায় মেয়ের বিয়ে।
প্রায় ১০ বছর আগে বাবাকে হারান ১৯ বছর বয়সী সুমাইয়া আক্তার তিথি। এরপর থেকে মা জহুরা খাতুন অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার ও মেয়ের পড়াশোনা চালিয়েছেন। মেয়ের বিয়ের বয়স হওয়ায় বিয়ের আয়োজনের সামর্থ্য না থাকায় তিনি যখন দিশেহারা, তখনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রুহুল আমিন রুবেলের মানবিক কাজের কথা জানতে পারেন।
যোগাযোগ করার পর রুবেল তিথির পরিবারের সব খোঁজখবর নেন এবং বিয়ের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাস দেন। বৃহস্পতিবার গায়ে হলুদের পর শুক্রবার সম্পন্ন হয় বিয়ের মূল আনুষ্ঠানিকতা। জুমার নামাজের পর বর তরিকুল ইসলাম কনের বাড়িতে এলে রুবেল তাকে সোনার আংটি পরিয়ে বরণ করে নেন। এরপর বাঙালি বিয়ের সব রীতি মেনেই সম্পন্ন হয় তিথি ও তরিকুলের বিয়ে।
তিথির মা জহুরা খাতুন বলেন, মেয়ের বিয়ে নিয়ে খুব চিন্তায় ছিলাম। রুবেলের সাথে যোগাযোগ করার পর তিনি সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। নিজের মেয়ের মতো করে তিনি সব আয়োজন করেছেন, যা আমরা কল্পনাও করতে পারিনি।
নববধূ সুমাইয়া আক্তার তিথি বলেন, আজকের দিনে বাবা বেঁচে না থাকলেও রুবেল আঙ্কেলের জন্য তার অভাব বুঝতে পারিনি। এত বড় আয়োজন দেখে আমি নিজেই অবাক হয়েছি।
বর তরিকুল ইসলামও কনেপক্ষের আতিথেয়তায় মুগ্ধতা প্রকাশ করেন এবং নবজীবনের জন্য সকলের কাছে দোয়া চান।
স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও এলাকাবাসী রুবেলের এই উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তারা জানান, অসহায় ও এতিম মেয়েদের পাশে দাঁড়িয়ে বছরের পর বছর বিয়ের দায়িত্ব পালন করা নিঃসন্দেহে একটি মহৎ ও মানবিক কাজ। সমাজের বিত্তবানরা এ ধরনের উদ্যোগে এগিয়ে এলে আরও অনেক অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফুটবে।
পেশায় ব্যবসায়ী রুহুল আমিন রুবেল গত ২৪ বছর ধরে এতিম ও অসহায় মেয়েদের ধুমধাম করে বিয়ে দেওয়ার এই মানবিক কাজ করে আসছেন। একজন বাবা তার মেয়ের বিয়েতে যে দায়িত্ব পালন করেন, তিথির বেলায় যেন সেই দায়িত্বই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন রুবেল। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও মেয়ের বিয়েতে বাবার মতোই পাশে দাঁড়িয়ে সব দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
রুবেল বলেন, এটি তার ১১২তম মেয়ের বিয়ে। বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে কেউ যোগাযোগ করলে তিনি খোঁজখবর নেন। সত্যিই অসহায় হলে নিজের তহবিল থেকে বিয়ের যাবতীয় খরচ বহন করেন। পেশায় ব্যবসায়ী হলেও মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে তিনি নিজের দায়িত্ব ও সৌভাগ্য মনে করেন।
আশিকুর রহমান/এসএইচএ
