বিজ্ঞাপন

পেটে গজ রেখে সেলাইয়ের পর রোগীর মৃত্যু

রাজবাড়ীতে মা হারানো শিশুর পাশে ডিসি আফরোজা

রাজবাড়ীতে মা হারানো শিশুর পাশে ডিসি আফরোজা

মায়ের শূন্যতা বুঝে ওঠার আগেই মাকে হারিয়েছে নিষ্পাপ শিশুটি। চারপাশে শোকের ভার, স্বজনদের চোখে জল। এমন এক বেদনাবিধুর মুহূর্তে মায়ের স্নেহবঞ্চিত শিশুটিকে কোলে তুলে নিলেন রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক (ডিসি) আফরোজা পারভীন। দীর্ঘ সময় শিশুটিকে বুকে আগলে বসে রইলেন শোকাহত পরিবারের পাশে।

বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের বাঘুটিয়া গ্রামে মৃত কনিকা মন্ডলের বাড়িতে গিয়ে শুক্রবার (২১ আগস্ট) সকালে দেখা যায় হৃদয়স্পর্শী এই দৃশ্য।

জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন বাড়িতে ঢুকে তিনি শোকাহত স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন। পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে শোনেন তাদের কষ্ট, অসহায়ত্ব ও উদ্বেগের কথা। এ সময় তিনি তাদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন।

কথা বলার একপর্যায়ে স্বজনদের কাছে থাকা কনিকার ছোট শিশুটিকে কোলে তুলে নেন ডিসি। শিশুটিকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে দীর্ঘ সময় পরিবারের পাশে বসে থাকেন তিনি। মায়ের আদর-স্নেহ বোঝার আগেই মাকে হারানো শিশুটিকে বুকে আগলে রাখা জেলা প্রশাসকের এই দৃশ্য উপস্থিত সবার মন ছুঁয়ে যায়। নীরব হয়ে আসে চারপাশ। শোকাহত স্বজনদের চোখে তখন প্রিয়জন হারানোর কষ্টের পাশাপাশি ফুটে ওঠে শিশুটির ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ।

কনিকার স্বজনরা জানান, একদিকে প্রিয়জন হারানোর শোক, অন্যদিকে মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত এই ছোট্ট শিশুটির ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা চিন্তিত। এমন কঠিন সময়ে জেলা প্রশাসক তাদের বাড়িতে এসে পাশে দাঁড়ানোয় তারা কিছুটা সাহস পেয়েছেন।

জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন বলেন, কনিকার পরিবারের এই শোক অত্যন্ত বেদনাদায়ক। বিশেষ করে ছোট শিশুটিকে দেখে খুবই কষ্ট লেগেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই পরিবারের পাশে থাকার চেষ্টা করা হবে। শিশুটির ভবিষ্যৎ ও পরিবারের প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখব।

যে মায়ের কোলে থাকার কথা ছিল শিশুটির গত ২৯ জুন ফরিদপুরের সমরিতা হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে কন্যাসন্তানের জন্ম দেন বালিয়াকান্দির বহরপুর ইউনিয়নের বাঘুটিয়া গ্রামের কনিকা মন্ডল (৩৫)।

পরিবারের অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের পর কনিকার পেটে গজ রেখে সেলাই করে দেওয়া হয়। পরদিন থেকেই তার পেট ফুলে যায় এবং শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। পরে ৩ জুলাই তাকে ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ৭ জুলাই পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তার পেটে গজ থাকার বিষয়টি ধরা পড়ে। ওই দিনই অস্ত্রোপচার করে পেট থেকে গজ বের করা হয়। এরপর দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন ও অসুস্থ থাকার পর ১৯ আগস্ট দিবাগত রাত সোয়া ২টার দিকে ঢাকার কল্যাণপুরের একটি হাসপাতালে মারা যান তিন সন্তানের জননী কনিকা।

একটি শিশুর পৃথিবীতে আসার আনন্দের মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেই পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেলেন তার মা। মায়ের মুখ, মায়ের স্পর্শ কিংবা মায়ের স্নেহ—কিছুই বুঝে ওঠার আগেই মাতৃহারা হলো শিশুটি।

আর সেই শোকের বাড়িতে জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীনের শিশুটিকে কোলে তুলে নেওয়ার মুহূর্তটি যেন প্রশাসনিক দায়িত্বের গণ্ডি পেরিয়ে মানবিকতার এক অনন্য ছবি হয়ে উঠল।

মীর সামসুজ্জামান সৌরভ/এএমকে