যে বয়সে মায়ের কোলে মুখ লুকিয়ে আর বাবার বুকে মাথা রেখে পৃথিবী চেনার কথা, সেই বয়সেই হাসপাতালের আইসিইউতে জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ে নেমেছিল সাড়ে পাঁচ মাসের মোহাম্মদ সাইফান। হামের পর একে একে দেখা দেয় শারীরিক নানা জটিলতা। শেষ পর্যন্ত জীবন বাঁচাতে তাকে রাখা হয় লাইফ সাপোর্টেও। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে বাবা-মায়ের কোল খালি করে চলে গেছে তাদের একমাত্র সন্তান সাইফান।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) ফেনী সদর উপজেলার ফাজিলপুর ইউনিয়নের মাদরাসা রোডের ওয়াজ পাটোয়ারী বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
সাইফানের বাবা মোহাম্মদ কাওছার স্থানীয় গণমাধ্যম দৈনিক ফেনীর চিত্র সাংবাদিক এবং ড্রিম আর্টিসান নামে একটি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী। তার মা ফোজিয়া আক্তার ইভা। সাইফান ছিল এ দম্পতির প্রথম সন্তান। চলতি বছরের ৪ মার্চ জন্ম হয়েছিল তার। প্রিয় সন্তানকে বুকে নেওয়ার সাড়ে পাঁচ মাসের মাথায় তাকে হারিয়ে নির্বাক হয়ে পড়েছেন বাবা-মা।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত ৭ আগস্ট সকালে সাইফানের শারীরিক অবস্থা খারাপ হয়। এর আগে তার শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছিল। ফেনীর স্থানীয় চিকিৎসকদের পরামর্শে তখন তার চিকিৎসা চলছিল। ‘লুতি’ বা লালচে দানা ওঠার পর কয়েকদিন চিকিৎসা দেওয়ায় তার অবস্থার কিছুটা উন্নতিও হয়েছিল। পরে আবার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে ফেনীর একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা অথবা চট্টগ্রামে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
পরে সাইফানকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে টানা ১৩ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়। গত বুধবার (২০ আগস্ট) রাতে তাকে ঢাকার আরেকটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার রাতে তার মৃত্যু হয়েছে।
সাইফানের বাবা মোহাম্মদ কাওছার বলেন, হামের উপসর্গ নিয়ে আমার ছেলেকে ঢাকায় নিয়ে মহাখালীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করেছিলাম। সেখানে হামের চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও অবস্থার উন্নতি হয়নি। একপর্যায়ে পরপর দুবার খিঁচুনি হলে সাইফানের মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর হৃদযন্ত্রের জটিলতাসহ শরীরে আরও নানা সমস্যা দেখা দেয়।
তিনি বলেন, টানা ১৩ দিন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিল সাইফান। শেষ দিকে তাকে লাইফ সাপোর্টেও রাখা হয়। ২০ আগস্ট রাতে তাকে ঢাকার আরেকটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার রাত ১২টার পর সেখানেই মারা যায়।
সন্তান হারিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, আমার সন্তানের মতো আর কোনো শিশু যেন হামে আক্রান্ত হয়ে এভাবে প্রাণ না হারায়। সেজন্য পরিবার থেকে শুরু করে সরকারকে আরও বেশি সচেতন হতে হবে।
সাইফানের বয়স ছিল পাঁচ মাসের কিছু বেশি। অর্থাৎ নিয়মিত সূচির হামের টিকা নেওয়ার বয়সে পৌঁছানোর আগেই সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোকের ভারে এখন নির্বাক তার বাবা-মা।
তারেক চৌধুরী/এএমকে
