রাজশাহী ও নাটোরে পরীক্ষার ধাপ পেড়িয়ে এখন বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে চুইঝাল। চাষবাদ ও দাম ভালো হওয়ায় সম্ভাবনাময় হিসেবে চুইঝালকে দেখছে কৃষি অফিস। চুইঝাল চাষ বিস্তারে কৃষকদের চুইঝালের চারা সরবারহ করা হয়েছে। তবে রাজশাহীতে না পাওয়া গেলে নাটোর হর্টিকালচার সেন্টারের মিলছে চুইঝালের চারা।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জেলার মোহনপুর এলাকায় পান চাষ ভালো হয়। চুইঝালের চাষ পদ্ধতি অনেকটা পানের মতোই। তাই এই এলাকায় ২০২৪ সালের শেষে দিকে পরীক্ষামূলক চাষ করা হয়। দুই বছর গড়াতে চুইঝালের চাষ ভালো হয়েছে। চাই চাষিরা ছাড়াও কৃষি অফিসের আগ্রহ বেশি। চুইঝাল সাধারণত ছায়াযুক্ত স্থানে বা আম, নারিকেল ও সুপারি গাছের সাপোর্ট নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে। তাই বাড়তি জায়গার প্রয়োজন নেই।
তবে পানের চেয়ে চুইঝালের বাজারমূল্য ভালো। মানভেদে শুকনা চুইঝাল বাজারে বিক্রি হয় প্রতি কেজি ১৮০০ থেকে ৩০০০ টাকা পর্যন্ত। তবে এটি কাঁচা এবং শুকনা উভয়ভাবেই বিক্রি করা হয়। চুইঝালের বিশেষ ওষুধি গুণ ছাড়াও বর্তমানে বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে চুইঝাল দিয়ে রান্না করা মাংস বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
জানা গেছে, চুইঝাল লতাজাতীয় সপুষ্পক উদ্ভিদ। যার কাণ্ড, শিকড় বা ডাল মাংস ও মাছের রান্নায় মসলা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা এবং বাগেরহাট জেলায় চুইঝাল জনপ্রিয় একটি ঐতিহ্যবাহী মসলা। রান্নায় এটি ব্যবহারের ফলে খাবারে চমৎকার ঝাঁঝালো স্বাদ এবং কড়া সুঘ্রাণ তৈরি হয়। যা সাধারণ মাংসের স্বাদকেও রাজকীয় করে তোলে। গরুর, খাসির বা হাঁসের মাংস ভুনায় মসলা কষানোর পর বা মাংস সেদ্ধের কিছুক্ষণ আগে চুইঝালের টুকরোগুলো দেওয়া হয়।
রাজশাহী জেলার মোহনপুর উপজেলার জাহানাবাদ ইউনিয়নের চান্দোপাড়ায় বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হচ্ছে চুইঝাল। এলাকাটিতে চুইঝাল চাষ করছেন আব্দুর রশিদ মোল্লা। তিনি বাড়ির পাশে আমের গাছের নিচে ১০ শতক জমিতে চুইঝালের গাছ লাগিয়েছেন।
আব্দুর রশিদ মোল্লা বলেন, মোহনপুর কৃষি অফিস ও রাজশাহী হর্টিকালচার সেন্টারের সহায়তায় চুইঝাল চাষের উদ্যোগ নিয়েছি। এই অপ্রচলিত ফসলের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে। বাজারে দামও ভালো। এর চারাও করা যাবে। শিখেছি চারা করা। প্রথম চারা স্থানীয় গ্রামবাসীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের পান চাষের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এর গাছও পানের মতো। এই জমিতে চুইঝালের গাছগুলো ভালোই রয়েছে। কোনো রোগবালায় নেই, তাই সতেজ হয়ে উঠছে। এখানে হালকা রোদ ও ছায়াযুক্ত জায়গা। এই আবহাওয়া চুইঝাল চাষের উপযোগী। সব মিলে ভালো হচ্ছে চাষ। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, রাজশাহীতে সেইভাবে বাজার তৈরি হয়নি। তবে অন্যসব বাজারে যে দামে চুইঝাল বিক্রি হচ্ছে, সেই দামে কিনতে চেয়েছে হর্টিকালচার সেন্টার।
স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, চুইঝালের সঙ্গে সেইভাবে পরিচিত ছিল না। যখন শুনলাম আব্দুর রশিদ চুইঝালের চাষ করছেন। তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সার্চ করে দেখলাম এই খাবার খুব জনপ্রিয় খুলনা অঞ্চলে। ঢাকাতেও বিভিন্ন হোটেলে চুইঝালে রান্না মাংস পাওয়া যায়। যেহেতু আমাদের এলাকায় চুইঝাল চাষ হচ্ছে। আমরাও মাংসে দিয়ে খাব।
চুইঝাল গাছের চারা ২৫ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন নাটোর হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক শামীম ইকবাল। তিনি বলেন, হর্টিকালচার সেন্টারে প্রথমে চুইঝালের চাষে ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। পরে চাষ সম্প্রসারণ করা হয়। বর্তমানে প্রতিটি চুইঝালের কাটিং চারা ২৫ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। চুইঝালের প্রতি মানুষের আগ্রহ রয়েছে। তবে চুইঝাল চাষের জন্য কিছুটা উঁচু জমি প্রয়োজন।
এ বিষয়ে রাজশাহী হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ববিদ ছাইয়্যেদা দিল ছালিন বলেন, চুইঝাল পরীক্ষামূলকভাবে দিয়েছিলাম মোহনপুরে। দেখলাম খুব ভালো হচ্ছে। নাটোরের দিকেও চুইঝালের চাষ হচ্ছে। মোহনপুর এলাকায় পানের চাষ ভালো হয়। চুইঝাল এবং পান দুইটার চাষ প্রায় একই। তাই আমরা মোহনপুরকে বেছে নিয়েছি। চুইঝালের বাজার খুব ভালো। দক্ষিণাঞ্চল বা ঢাকার দিকে চুইঝাল বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে স্পেশাল মাংস রান্না হয়। গরু, মহিষ, খাসি, মুরগি বা হাঁসের মাংসে স্পেশাল ভাবে চুইঝাল দিয়ে রান্না হয়।
দেশের বাজারে চুইঝালের চাহিদা ভালো উল্লেখ করে তিনি বলেন, চুইঝাল ১৮০০ টাকা কেজি বা অনেক সময় ক্ষেত্রবিশেষে ভালো যদি হয় সেগুলা ৩০০০ টাকা কেজি পর্যন্ত বিক্রি হয়। রাজশাহীতে অল্প হলেও নাটোরে কয়েকজন চাষি চাষ করছেন। আমাদের এদিকে আম বাগান প্রচুর আছে। আমবাগান বা সুপারি, নারিকেল বাগানে পরগাছার মতো চাষ করা সম্ভব। এতে খরচ নেই বললেই চলে। আমরা আশা করছি, রাজশাহী অঞ্চলে দিন দিন বাড়বে চুইঝালের চাষ।
শাহিনুল আশিক/এএমকে
