বিজ্ঞাপন

হাওরে ‘সোনার হরিণ’ প্যাড এখন নারীর হাতের নাগালে

কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার হাওরবেষ্টিত দুর্গম গ্রাম গোড়াদিঘা। কয়েক বছর আগেও এই গ্রামের নারীদের কাছে পিরিয়ড ছিল অনেকটা গোপন ও সংকোচের বিষয়। স্যানিটারি প্যাডের ব্যবহার সম্পর্কে জানতেন না অনেকে। পিরিয়ডের সময় প্যাডের বদলে পুরোনো কাপড় বা তুলা ব্যবহার করতেন তারা। স্যানিটারি প্যাডও সহজে মিলতো না। দূরের বাজারে গিয়ে কিনতে হতো। ফলে দুর্গম এই জনপদের নারীদের কাছে প্যাড ছিল অনেকটা ‘সোনার হরিণ’।

সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। পিরিয়ড নিয়ে নারীদের মধ্যে আগের মতো সংকোচ নেই। কিশোরীরা পিরিয়ডকালীন স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে জানে। নারীরা ব্যবহার করছেন স্যানিটারি প্যাড। গ্রামের ফার্মেসিগুলোতেও এখন পাওয়া যাচ্ছে প্যাড। 

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, এই পরিবর্তনের পেছনে ‘স্টেসেফ’র ধারাবাহিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

গোড়াদিঘার স্কুল শিক্ষার্থী, গৃহবধূ, ফার্মেসি ব্যবসায়ী ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক বছর আগেও পিরিয়ড ও এর স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে এখানকার নারীদের অনেকেরই ধারণা ছিল না। নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে  স্টেসেফ তাদের নিরাপদ পিরিয়ড ব্যবস্থাপনা ও স্যানিটারি প্যাড ব্যবহারের গুরুত্ব সম্পর্কে জানিয়েছে। সান কমিউনিকেশন এবং স্টেসেফের উদ্যোগে দুর্গম গোড়াদিঘার মেয়েদের জীবন বদলে গেছে।

নৌকায় করে পৌঁছেছে স্বাস্থ্যবার্তা

দুর্গম গোড়াদিঘায় স্বাস্থ্যসচেতনতার বার্তা পৌঁছানোও সহজ নয়। চারদিকে পানি থাকায় নৌকাই এখানকার প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম। তাই সেই নৌকাকেই সচেতনতার বাহন করেছে স্টেসেফ। তিনটি বিশেষ নৌকায় আয়োজন করা হয়েছে ‘আনন্দ মেলা’ ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি। নৌকায় করে দূর-দূরান্ত থেকে নারীরা ও কিশোরীরা অংশ নিয়েছেন আয়োজনে। সেখানে পিরিয়ডকালীন স্বাস্থ্যবিধি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং স্যানিটারি প্যাড ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাদের জানানো হয়। 

কর্মসূচিতে চিকিৎসকেরাও অংশ নেন। নারীরা তাদের কাছে পিরিয়ড ও প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে নানা প্রশ্নের উত্তর পান। পাশাপাশি বিনামূল্যে বিতরণ করা হয় তিন মাসের স্যানিটারি প্যাড।

খেলতে খেলতেই স্বাস্থ্যশিক্ষা

পিরিয়ড নিয়ে সরাসরি কথা বলতে অনেকের সংকোচ থাকে। তাই প্রচলিত বক্তৃতার পাশাপাশি ভিন্ন কৌশল নিয়েছে স্টে সেফ। নারীদের পরিচিত খেলা লুডুকে ব্যবহার করা হয়েছে স্বাস্থ্য সচেতনতার মাধ্যম হিসেবে। বিশেষভাবে তৈরি লুডুর ছকে কোথাও ‘ইনফেকশন’, কোথাও ‘বন্ধ্যাত্ব’ কিংবা ‘জরায়ুমুখের ক্যানসার’- এর মতো স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা তুলে ধরা হয়েছে। আবার ঘরে রাখা হয়েছে নিরাপদ পিরিয়ড ও স্যানিটারি প্যাড ব্যবহারের সুফল।

খেলার মধ্য দিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা জানছেন নারী ও কিশোরীরা। ফলে যে বিষয় নিয়ে কথা বলতে আগে সংকোচ ছিল, সেটিই এখন হয়ে উঠেছে সহজ আলোচনার বিষয়।

ফার্মেসির তাকে এখন প্যাড

সচেতনতার পাশাপাশি প্যাড সহজলভ্য করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় ফার্মেসি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কাজ করেছে স্টে সেফ। তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি ফার্মেসিগুলোতে প্যাড রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে এখন গোড়াদিঘার নারীদের প্যাড কিনতে দূরের বাজারে ছুটতে হয় না। স্থানীয় ফার্মেসিতেই পাওয়া যাচ্ছে প্যাড।

স্থানীয় ফার্মেসি ব্যবসায়ী আরমান মিয়া জানান, আগে প্যাডের চাহিদা ছিল না। এখন নারীরা নিজেরাই প্যাড কিনতে আসেন। এতে বোঝা যায়, শুধু পণ্য পৌঁছানো নয়, ব্যবহারকারীর মানসিকতাতেও পরিবর্তন এসেছে।

স্কুলের মেয়েরাও এখন জানে

পরিবর্তনের বড় অংশটি দেখা যাচ্ছে কিশোরীদের মধ্যে। স্থানীয় বিদ্যালয়ে বিশেষ ক্লাস ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে তাদের পিরিয়ডকালীন স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে জানানো হয়েছে। কয়েক বছর আগেও যে বয়সে পিরিয়ড নিয়ে মেয়েদের অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলতো না, এখন সেই বয়সেই তারা জানতে পারছে কীভাবে পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে, কেন নিরাপদ প্যাড ব্যবহার করা প্রয়োজন এবং অনিরাপদ উপায়ে পিরিয়ড ব্যবস্থাপনার কী ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি হতে পারে।

স্কুল শিক্ষার্থী ইসমা বলে, আগে আমরা এসব বিষয়ে জানতাম না। স্টেসেফ মেলার মাধ্যমে আমাদেরকে এসব বিষয়ে সচেতন করেছে। আমরা সবাই এখন এসব বিষয়ে সচেতন।

তৃপ্তি আক্তার বলে, স্টেসেফের মাধ্যমে শুধু আমি একা নই, আমাদের এলাকার প্রত্যেকে স্যানিটারি প্যাড সম্পর্কে জানতে পেরেছে এবং এখানকার সব নারী এখন প্যাড ব্যবহার করে।

কাজেফা আক্তার নামে অপর এক ছাত্রী বলে, আগে আমরা কাপড় ব্যবহার করতাম। এখন স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে আমরা সচেতন। আমরা এখন কাপড় ব্যবহার করি না। পিরিয়ডে প্যাড ব্যবহার করি।

উঠান বৈঠকে ভাঙছে সংকোচ

গ্রামের নারীদের নিয়ে করা হয়েছে উঠান বৈঠকও। সেখানে ঘরের পরিবেশে পিরিয়ড ও নারীস্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা হয়েছে।

স্থানীয় নারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগে পিরিয়ডের বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করতেন না তারা। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। পিরিয়ড হলে প্যাড ব্যবহার করা এবং প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে নেওয়া তাদের কাছে আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। 

মাধুরী আক্তার তিশা নামে এক গৃহবধূ জানান, আগে এসব বিষয়ে জানতেন না। প্যাড ব্যবহারও করতেন না। স্টেসেফের মাধ্যমে তারা এসব বিষয়ে জেনেছেন। তাই এখন নিরাপদ পিরিয়ডের জন্য ন্যাপকিন ব্যবহার করেন। 

একই কথা জানান, লাকী আক্তার ও হাফসা। 

বদলে গেছে নারী স্বাস্থ্যের চিত্র

গোড়াদিঘার পরিবর্তনটি শুধু স্যানিটারি প্যাড ব্যবহারের পরিবর্তন নয়। এটি একটি দুর্গম হাওর জনপদের নারীদের চিন্তা ও অভ্যাস বদলে যাওয়ার গল্প। যে জনপদে কয়েক বছর আগেও পিরিয়ডের সময় কাপড় ব্যবহার করতেন অনেকে, এখন সেখানে নারীরা প্যাড ব্যবহার করছেন। যে পণ্য একসময় সহজে পাওয়া যেত না, সেটি এখন স্থানীয় ফার্মেসিতে পাওয়া যাচ্ছে। যে বিষয় নিয়ে কথা বলতে সংকোচ ছিল, সেটি নিয়ে এখন স্কুলে, উঠানে, নৌকায় এমনকি খেলতে খেলতেও আলোচনা হচ্ছে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. আবদুল মোতালিব বলেন, এই জনপদের নারীরা আগে সচেতন ছিল না। এখন চিত্র পাল্টে গেছে। এখন সবাই সচেতন। এই পরিবর্তনের পেছনে স্টেসেফের ধারাবাহিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও প্যাড সহজলভ্য করার উদ্যোগ বড় ভূমিকা রেখেছে।

পল্লী চিকিৎসক আনোয়ার হোসেন বলেন, বছর খানেক আগেও এখানকার নারীরা পিরিয়ড এবং প্যাড ব্যবহার সম্পর্কে তেমন একটা জানতো না। এখন অধিকাংশ নারীই সচেতন এবং তারা স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করেন।

যা বলছে স্টেসেফ কর্তৃপক্ষ

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ব্র্যান্ড ম্যানেজার আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, আমাদের আইডিয়াটা আসলে ঢাকা পোস্টের একটা নিউজ থেকে আসা। আমরা প্রায় বছরখানেক আগে ঢাকা পোস্টে একটা নিউজ দেখি যে কিশোরগঞ্জে এ রকম একটা এরিয়া আছে যেখানে আসলে মানুষজন স্যানিটারি ন্যাপকিন সম্পর্কে জানতো না। ​এই বিষয়টা জানার পর আমার কাছে মনে হয়েছে যে স্টে সেফ যেহেতু মেয়েদেরকে নিরাপদে রাখার কথা বলে, সো আমরা এই সকল মেয়েদের জন্য, এখানকার যে মানুষ আছে তাদের জন্য কিছু একটা করতে পারি। যেটা আমার ব্র্যান্ডের পাশাপাশি সে মানুষগুলোকেও অনেক হেল্প করবে, তাদেরকে সচেতন করবে।

তিনি বলেন, বিভিন্ন সচেতনতামূলক বার্তা তাদের কাছে পৌঁছে দেই। বিভিন্ন আনন্দমূলক ইভেন্টের মাধ্যমে আমরা এখানে মেলার আয়োজন করি। আমরা এখানকার মানুষের নিয়মিত যে জীবনযাপন, তাদের লুডু খেলা, উঠান বৈঠক, বিভিন্ন স্কুলে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করি। এখানকার যে ফার্মেসিগুলো আছে সে ফার্মেসিগুলোতেও মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করি। বিশেষ করে যারা ফার্মেসিতে ওষুধ বিক্রি করে তাদেরকে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা, যে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিষয়টা, পিরিয়ডের বিষয়টা খুবই স্বাভাবিক। 

আবদুল্লাহ আল মামুন, একটা জনগোষ্ঠী এতটা পিছিয়ে আছে- এটা আসলে অ্যাজ এ ব্র্যান্ড, অ্যাজ এ বাংলাদেশি পিপল- এটা আমাদের কাছে খুবই দুঃখজনক মনে হয়েছে। আমরা বর্তমানে এসে যেটা দেখতে পাচ্ছি যে এখানকার প্রায় ৫০ থেকে ৬০ পার্সেন্ট মেয়েরাই আমাদের সেই ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে অনুপ্রাণিত হয়েছে এবং এখানকার মেয়েরা এখন স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করছে, যেটা খুবই ইতিবাচক। আমরা চাই এই সচেতনতা শুধু গোড়াদিঘায় না, সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ুক। 

সাখাওয়াত হোসেন হৃদয়/আরএআর

বিজ্ঞাপন