সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার তারালী ইউনিয়নের বরেয়া গ্রামের ‘সরদার বাড়ি’ শুধু একটি বাড়ির নাম ছিল না, এলাকার অনেক মানুষের কাছে ছিল ভরসার জায়গা। কারও বিপদ, অসহায় মানুষের প্রয়োজন কিংবা কোনো সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কাজে সহযোগিতায় এস এম আলিমুজ্জামান সাজুর কাছে গিয়ে খালি হাতে ফিরতে হয়নি। নিজের জন্য সংসার না গড়লেও মানুষের পাশে দাঁড়িয়েই যেন গড়ে তুলেছিলেন বড় এক পরিবার।
সেই মানুষের শেষ ঠিকানাও হলো সেই সরদার বাড়িতেই। জীবদ্দশায় নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী বাড়ির সামনের কাঁঠালগাছের নিচে শনিবার (২২ আগস্ট) তাকে দাফন করা হয়েছে।
এস এম আলিমুজ্জামান সাজু চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়ে কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার ‘শিখা ইন’ আবাসিক হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে নিহত হন। শনিবার দুপুরে ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে তার মরদেহ বাংলাদেশে পৌঁছায়। ইমিগ্রেশনের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে দুপুর সোয়া ২টার দিকে লাশবাহী গাড়িটি কালীগঞ্জ উপজেলার তারালী ইউনিয়নের বরেয়া গ্রামের সরদার বাড়িতে পৌঁছায়।
মরদেহ আসার আগেই সকাল থেকে বাড়িতে অপেক্ষা করছিলেন স্বজনেরা। কবরও প্রস্তুত করে রাখা হয়েছিল। গাড়ি বাড়ির সামনে পৌঁছাতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। খবর পেয়ে আশপাশের গ্রামসহ দূর-দূরান্ত থেকে শত শত মানুষ ছুটে আসেন তাকে শেষবারের মতো দেখতে।
স্থানীয়রা জানান, সাজু ছিলেন মিশুক ও পরোপকারী। বিয়ে করেননি। এলাকার মানুষকে নিজের আপনজন মনে করতেন। ধনী-গরিব, ধর্ম-বর্ণ কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের কোনো ভেদাভেদ করতেন না। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি মসজিদ-মাদরাসাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কাজেও সহযোগিতা করতেন।
শৈশব থেকে সাজুর সঙ্গে ওঠাবসা করা তেঁতুলিয়া গ্রামের ভবেশ ঘোষ বলেন, আমরা শুধু একজন বন্ধুকে হারাইনি, একজন মহামানবকে হারিয়েছি। তার কাছে ধনী-গরিব, ধর্ম-বর্ণের কোনো ভেদাভেদ ছিল না। সবার সঙ্গে সমানভাবে মিশতো।
তিনি বলেন, সাজু বিয়ে করেনি। কিন্তু এলাকার মানুষই ছিল তার আপনজন। কারও বিপদ হলে পাশে দাঁড়াতো। সরদার বাড়িটাও মানুষের কাছে ভরসার জায়গা ছিল।
প্রতিবেশী ফরহাদ হোসেন বলেন, সাজু ভাইয়ের মৃত্যুতে ছোট-বড়, বৃদ্ধ সবাই মর্মাহত। অসহায়-দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াতেন তিনি। এলাকার গরিব-দুঃখী মানুষের ভরসা ছিলেন।
তিনি আরও বলেন, এমন একজন মানুষ আমাদের মাঝ থেকে চলে গেলেন, এটা মেনে নেওয়া কঠিন। ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের কাছে আমাদের আবেদন, বাংলাদেশের মানুষ চিকিৎসার জন্য ভারতে গেলে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক।
সাজুর বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেন সাতক্ষীরা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রবিউল বাসার।
তিনি বলেন, আজ শোকের দিন। তিনি এলাকার একজন সমাজসেবক ও বিশেষ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি আমার জামাইয়ের খালাতো ভাই। অস্বাভাবিকভাবে তার মৃত্যু হয়েছে। আমরা শোকাহত। মানুষের সঙ্গে তার একটা ভালো সম্পর্ক ছিল, তিনি মিশুক ছিলেন।
একই অগ্নিকাণ্ডে নিহত কালীগঞ্জের আরেক বাসিন্দা রেবতী সরকারের শেষকৃত্য শুক্রবার কলকাতার নিমতলা ঘাটে সম্পন্ন হয়েছে। তার দুই সন্তান ভারতে থাকায় সেখানেই শেষকৃত্যের আয়োজন করা হয়। এ সময় তার স্বামীও সেখানে ছিলেন।
রেবতীর দেবর তপন সরকার বলেন, রেবতী আমার দাদার স্ত্রী। চিকিৎসার জন্য প্রায় ১০ দিন আগে তিনি ভারতে গিয়েছিলেন। শনিবার তার দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু লাশ হয়ে ফিরবে, সেটা ভাবিনি।
গত বুধবার (১৯ আগস্ট) রাতে কলকাতার ‘শিখা ইন’ আবাসিক হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে নয়জন নিহত হন। তাদের মধ্যে সাতজন বাংলাদেশের নাগরিক। সাজু ছিলেন তাদের একজন।
দুই দিনের অপেক্ষার পর শনিবার তার মরদেহ দেশে পৌঁছায়। দুপুর সোয়া ২টার দিকে মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর গোসল ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। এরপর আসরের নামাজের পর জানাজা শেষে সাজুর নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী সরদার বাড়ির সামনের কাঁঠালগাছের নিচে তাকে দাফন করা হয়।
যে বাড়ির দরজা একসময় মানুষের প্রয়োজনে খুলে যেত, সেই বাড়ির আঙিনাতেই এখন সাজুর কবর। জীবদ্দশায় মানুষের ভরসার জায়গা হয়ে ওঠা সরদার বাড়িই হয়ে থাকল তার শেষ ঠিকানা।
ইব্রাহিম খলিল/আরএআর
