বিজ্ঞাপন

পাকুন্দিয়া–কিশোরগঞ্জ সড়কে থামছে না দুর্ঘটনা, বাড়ছে প্রাণহানি

পাকুন্দিয়া–কিশোরগঞ্জ সড়কে থামছে না দুর্ঘটনা, বাড়ছে প্রাণহানি

কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া–কিশোরগঞ্জ সড়কে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। কখনো যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে পিকআপ বা মাইক্রোবাসের সংঘর্ষ, কখনো মাছবাহী ট্রাকের ধাক্কায় প্রায়ই ঘটছে প্রাণহানি। পাশাপাশি আহত হচ্ছে বহু মানুষ।

সাম্প্রতিক সময়ে সড়কটির বিভিন্ন অংশে ঘটে যাওয়া বড় কয়েকটি দুর্ঘটনায় অন্তত ১০ জন নিহত এবং অর্ধশতাধিক আহত হয়েছেন। সর্বশেষ শনিবার (২২ আগস্ট) সকালে দুর্ঘটনা দেখতে গিয়ে নিজেই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন নুরুজ্জামান (৬০) নামে এক বৃদ্ধ। এর আগে গত ১৭ ও ১৯ আগস্টের দুটি দুর্ঘটনায় নিহত হন তিনজন। ধারাবাহিক এসব দুর্ঘটনায় উদ্বেগ ও আতঙ্ক বাড়ছে স্থানীয় মানুষের মধ্যে। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং সড়কের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। পাশাপাশি পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক সাইন, সড়কবাতি ও কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ঘাটতিও রয়েছে। দুর্ঘটনার পর সাময়িক তৎপরতা দেখা গেলেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। 

একের পর এক প্রাণঘাতি দুর্ঘটনা

গত ৬ জুলাই পাকুন্দিয়া–কিশোরগঞ্জ সড়কের সুখিয়া বাজারসংলগ্ন এলাকায় যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে গরুবাহী একটি পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে পিকআপটি দুমড়েমুচড়ে গিয়ে চালকসহ তিনজন ঘটনাস্থলেই নিহত হন। গুরুতর আহত হন কয়েকজন। দুর্ঘটনায় পাঁচটি গরুও মারা যায়।

১০ জুলাই একই সড়কের পোড়াবাড়িয়া পশ্চিমপাড়া এলাকায় প্রাইভেট কার ও কাভার্ডভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাইভেট কারের চালকসহ দুইজন গুরুতর আহত হন।

২৪ জুলাই চিলাকাড়া মৌলভীবাড়ি এলাকায় যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে মাইক্রোবাসের চালক নিহত হন। আহত হন আরও ১০ জন।

৮ আগস্ট পৌরসদরের বরাটিয়া চৌরাস্তা এলাকায় অনন্যা পরিবহনের একটি বাসের ধাক্কায় দুইজন নিহত ও দুইজন গুরুতর আহত হন। এরপর ১৭ আগস্ট সকালে মির্জাপুর বাইপাস এলাকায় ঢাকা–কিশোরগঞ্জ সড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশার এক যাত্রী নজরুল ইসলাম নিহত হন। এ ঘটনায় শিশুসহ আরও চারজন গুরুতর আহত হন।

১৯ আগস্ট দুপুরে সুখিয়া বাজারসংলগ্ন এগারসিন্দুর কোল্ড স্টোরেজ এলাকায় মাছবাহী একটি ট্রাকের ধাক্কায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দুই যাত্রী নিহত হন। নিহত দুজন স্বামী-স্ত্রী—কাগারচর গ্রামের নুরু মিয়া (৬০) ও তার স্ত্রী আনোয়ারা (৫৮)। এ ঘটনায় তাদের মেয়েসহ আরও তিনজন গুরুতর আহত হন।

সর্বশেষ শনিবার সকালে দুর্ঘটনা দেখতে গিয়ে নিজেই প্রাণ হারান নুরুজ্জামান (৬০)। সকালে উপজেলার বাহাদিয়া পাঁচপীরের মাজারসংলগ্ন ঢাকা–কিশোরগঞ্জ সড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে। স্থানীয়রা জানান, সড়কে ঘটে যাওয়া একটি দুর্ঘটনা দেখতে গিয়ে প্রাইভেটকার চাপায় নুরুজ্জামান নিজেই দুর্ঘটনার শিকার হন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান।

নুরুজ্জামান উপজেলার বাহাদিয়া আকন্দ বাড়ির আবদুল কদ্দুছের ছেলে। বাহাদিয়া বাজারে তাঁর একটি পানের দোকান ছিল।

এ ছাড়াও ৯ আগস্ট নিরাপদ সড়কের দাবিতে মানববন্ধন চলাকালে শ্রীরামদী এলাকায় যাত্রীবাহী অনন্যা পরিবহনের একটি বাসের ধাক্কায় প্রাইভেটকারের চালক ও মালিক আহত হন।

স্থানীয়রা বলেন, পাকুন্দিয়া বাইপাস, মির্জাপুর বাইপাস, বরাটিয়া, বাহাদিয়া, সুখিয়া ও শ্রীরামদীসহ সড়কের বিভিন্ন অংশে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনের বেপরোয়া গতি এবং প্রতিযোগিতামূলকভাবে চলাচল নিয়ে তাদের উদ্বেগ বেশি।

পাকুন্দিয়ার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সড়কে গাড়ি চালানোর সময় মনে হয়, কখন কোন দিক থেকে গাড়ি এসে ধাক্কা দেয়। দুর্ঘটনা ঘটার পর সবাই কিছুদিন কথা বলে, কিন্তু স্থায়ীভাবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে কোরআন খতম, মানববন্ধন

ধারাবাহিক দুর্ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে নিরাপদ সড়কের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন স্থানীয়রা। নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের আত্মার মাগফিরাত ও আহতদের সুস্থতা কামনায় কোরআন খতম ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে। গত ৬ আগস্ট বিকেলে পাকুন্দিয়া বাইপাসে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
পরে নিরাপদ সড়কের দাবিতে মানববন্ধন ও স্মারকলিপিও দেওয়া হয়। কর্মসূচিতে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত চালক নিশ্চিত করা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন বন্ধ, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া এবং ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের দাবি জানানো হয়।

কর্মসূচির আয়োজক প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। নিয়মিত দুর্ঘটনা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। দুর্ঘটনার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আগাম কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এ জন্য চালক, মালিক ও প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

ছাত্র প্রতিনিধি এনামুল হক হৃদয় বলেন, নিরাপদ সড়ক কোনো দাবি নয়, এটি মানুষের অধিকার। প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ, চালকদের দায়িত্বশীলতা ও জনগণের সচেতনতাই সড়ককে নিরাপদ করতে পারে।

দুটি স্থানে স্পিডব্রেকার নির্মাণের সিদ্ধান্ত

দুর্ঘটনা কমাতে সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ দুটি স্থানে স্পিডব্রেকার নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বিষয়টি তুলে ধরেন কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী–পাকুন্দিয়া) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দিন।

পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রূপম দাস বলেন, সড়কের মির্জাপুর ও শ্রীরামদী কোল্ডস্টোরেজ এলাকায় দুটি স্পিডব্রেকার স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলোর একটি বেপরোয়া গতি। গতি নিয়ন্ত্রণে অভিযান শুরু করেছে উপজেলা প্রশাসন। 

তিনি জানান, এর অংশ হিসেবে শুক্রবার ও শনিবার বিকেলে উপজেলার থানারঘাট মোড় ও বাহাদিয়া এলাকায় লাইসেন্স ও রেজিস্ট্রেশনবিহীন মোটরসাইকেল এবং বাস, সিএনজি, প্রাইভেটকার, ট্রাকসহ অন্যান্য যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দিন বলেন, দুর্ঘটনার বিষয়টি জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পরিবহন মালিক সমিতির নেতাদেরও চালকদের সতর্ক করার বিষয়ে বলা হয়েছে। আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে দুর্ঘটনাপ্রবণ শ্রীরামদী ও মির্জাপুর বাইপাস এলাকায় দুটি স্পিডব্রেকার নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

দরকার সমন্বিত উদ্যোগ

পাকুন্দিয়া–কিশোরগঞ্জ সড়কটি এ অঞ্চলের মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন এ সড়ক দিয়ে শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, রোগীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিপুলসংখ্যক মানুষ যাতায়াত করেন। ফলে সড়কটিতে ধারাবাহিক দুর্ঘটনা শুধু প্রাণহানিই ঘটাচ্ছে না, পরিবারগুলোকে ঠেলে দিচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও মানসিক সংকটে।

স্থানীয় সংবাদকর্মী জাহিদ হাসান মুক্তার বলেন, একটি দুর্ঘটনা শুধু একজন মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয় না, একটি পরিবারকে অর্থনৈতিক ও মানসিক সংকটের মধ্যে ফেলে দেয়। গুরুতর আহত ব্যক্তিদের অনেকে কর্মক্ষমতা হারান। ফলে দুর্ঘটনার ক্ষতি দীর্ঘস্থায়ী হয়।

পাকুন্দিয়া থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম আরিফুর রহমান বলেন, প্রতিটি দুর্ঘটনায় পুলিশ মামলা নিচ্ছে। পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সবাইকে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

সাখাওয়াত হোসেন হৃদয়/আরএআর