ভোরের আলো ফুটতেই গাজীপুরের কালিগঞ্জে অন্যরকম ছন্দে জেগে ওঠে একটি গ্রাম, যেটি দোলনার গ্রাম নাম হিসেবে পরিচিত। হাতুড়ির ঠুকঠাক, রঙিন সুতোর বুঁনন, আর গল্পের ছন্দে ভরে ওঠে গ্রামের প্রতিটি বাড়ি। এটি শুধু দোলনা তৈরিই নয়। বরং স্বপ্ন গড়া আর নিজের পায়ে দাঁড়ানোর এক প্রবল ইচ্ছে বুকে ধারণ করছে এই গ্রামের নারীরা।
গাজীপুর কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী ইউনিয়নের বিরতুল-বালু নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই ধনুন গ্রামের বাসিন্দা মিনারা বেগম। ৫০ বছর বয়সী এ নারীর চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও কণ্ঠে দৃঢ়তা স্পষ্ট— আগে নিজের বলতে একরকম কিছু ছিল না। তবে সময়ের সাথে সাথে ঘুরে দাড়িয়েছেন তিনি। এখন মাসে ৮ থেকে ১০টা দোলনা বানান এই নারী।
শুধু মিনারা বেগমই নয়, তার মতোই রেখা দেবনাথ, মতিজা বেগম, রাহিমা বেগম, লিমা রাণী দাস, রেহেনা বেগম ও মনি আক্তারের এমন সংগ্রাম তাদের স্বাবলম্বিতা এনে দিয়েছে।
জানা গেছে, একসময় এই গ্রামের নারীরা ছিলেন ঘরবন্দি। দিন শুরু হতো রান্নাঘরে, শেষ হতো সংসারের ক্লান্তিতে। পরিবারের অর্থনৈতিক ভার ছিল পুরোপুরি পুরুষদের ওপর। কিন্তু সময়ের পালাবদলে বদলে গেছে সেই চিত্র। এখন ঘরের ভেতরের সেই নারীরাই হয়ে উঠেছেন পরিবারের প্রধান ভরসা। বহু বছর আগে পুরুষদের হাত ধরেই শুরু হয়েছিল দোলনা তৈরির এই যাত্রা। তবে সময়ের সঙ্গে পাল্টেছে চিত্র। এই শিল্প এখন নারীরাই নিজেদের করে নিয়েছে। বর্তমানে বিরতুল গ্রাম ছাড়িয়ে ধনুন, বাগদী, বিন্দান ও সেনপাড়াসহ পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে এই উদ্যোগ। প্রায় ৩০০ পরিবারের সহস্রাধিক নারী এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
তাদের হাতে তৈরি দোলনা এখন শুধু স্থানীয় বাজারে সীমাবদ্ধ নয়। গাজীপুর, ঢাকা ছাড়িয়ে পৌঁছে যাচ্ছে চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী-এমনকি দেশের বাইরেও।

উদ্যোক্তা রেখা বেগম ঢাকা পোস্টকে বলেন, সময়ের সাথে সাথে এই দোলনাগুলো এখন আমরা ডিজাইন আর রঙে নতুনত্ব আনার চেষ্টা করছি। অনলাইনেও অর্ডারও পাই। আমাদের দোলনা ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন স্থানে কদর বাড়ছে।
সাথী বেগম নামে এক নারী ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা একে অপরকে দেখে কাজগুলো শিখছি। এই শিল্পে যদি একটু প্রশিক্ষণ আর আর্থিক সহায়তা পাওয়া যেতো তাহলে আরও বড় পরিসরে কাজ করতে পারতাম।
উদ্যোক্তা শেখ ফরিদ বলেন, বর্তমানে কাঁচামালের দাম অনেক বেড়েছে। রড, চেইন, সুতা-সবকিছুর খরচ বাড়ছে, কিন্তু দোলনার দাম সেইভাবে বাড়েনি। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো-প্রশিক্ষণ বা সহজ শর্তে ঋণের অভাব। এটা হলে আমাদের আরও ভালো কিছু সম্ভব রয়েছে।
এ ব্যাপারে কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ. টি. এম. কামরুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, দোলনা তৈরিতে কালিগঞ্জ উপজেলার বিরতুলের নারীরা দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন। তারা যদি সংগঠিতভাবে এগিয়ে আসেন, তাহলে ক্ষুদ্র ঋণ থেকে শুরু করে বড় আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থাও করা সম্ভব। আমরা সেটির ব্যবস্থা করব। পাশাপাশি ওই গ্রামসহ পার্শ্ববর্তী যে গ্রামগুলোতে নতুন করে এই শিল্প শুরু হচ্ছে সব স্থানেই আমরা পরিদর্শনসহ তাদের আরও কিভাবে দক্ষ করে গড়ে তোলা যায় সেই বিষয় নিশ্চিত করব।
আশিকুর রহমান/এমটিআই
