বিজ্ঞাপন

রাজবাড়ীতে লাম্পি স্কিনে বিপাকে গরু খামারিরা, টিকা সরবরাহ অপ্রতুল

রাজবাড়ীতে লাম্পি স্কিনে বিপাকে গরু খামারিরা, টিকা সরবরাহ অপ্রতুল

গরু পালন করেই সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন রাজবাড়ী সদর উপজেলার দাদশী ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রামের গৃহিণী আসমা খাতুন। স্বামী মারা যাওয়ার পর নিজের প্রয়োজন মেটাতে এবং পরিবারের ওপর কিছুটা চাপ কমাতে গরু পালনকে জীবিকার পথ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন তিনি। গোয়ালে ছিল একটি গাভী, ষাঁড় ও একটি বাছুর। কিন্তু হঠাৎ লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) কেড়ে নেয় তার একমাত্র বাছুরটি।

প্রায় তিন মাস আগে লাম্পি স্কিনে আক্রান্ত হয় এক বছর বয়সী বাছুরটি। টানা ১৫ দিন চিকিৎসা করিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি। মারা যায় বাছুরটি। এতে প্রায় ৭০ হাজার টাকার ক্ষতির মুখে পড়েন খুরশিদা বেগম। এখন অবশিষ্ট দুটি গরুকে টিকা দিয়েছেন তিনি।

আসমা খাতুন বলেন, প্রায় তিন বছর আগে আমার স্বামী মারা গেছেন। ছেলেদের সংসারে থাকি। নিজেরও কিছু টাকা-পয়সার দরকার হয়। তাই গরু পালন করি। তিন মাস আগে আমার বাছুরটি লাম্পি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। ১৫ দিন চিকিৎসা দেওয়ার পর বাছুরটি মারা যায়। এতে আমার প্রায় ৭০ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। আগে কোনো টিকা দেওয়া ছিল না। বাকি দুটি গরুকে এখন টিকা দিয়েছি।

আসমার মতো জেলার অনেক প্রান্তিক কৃষক ও খামারি এখন লাম্পি স্কিন ডিজিজ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। ভাইরাসজনিত এই রোগে আক্রান্ত গরুর শরীরে গুটি দেখা দেওয়ার পাশাপাশি জ্বর, খাবারে অরুচি এবং দুধ ও মাংস উৎপাদন কমে যায়। গুরুতর অবস্থায় গরুর মৃত্যুও হতে পারে। ফলে একদিকে বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়, অন্যদিকে গরু হারিয়ে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন খামারিরা।

জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাজবাড়ীর পাঁচটি উপজেলায় মোট গরুর খামার রয়েছে ১৬ হাজার ১৫০টি। এর মধ্যে নিবন্ধিত খামার ৪০০টি এবং অনিবন্ধিত ১৫ হাজার ৭৫০টি। এছাড়া নিবন্ধিত গরু হৃষ্টপুষ্টকরণ খামার রয়েছে ৩৪টি এবং অনিবন্ধিত ৭ হাজার ১৪৩টি। জেলায় মোট গরুর সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার।

তবে বিপুলসংখ্যক গরুর বিপরীতে এলএসডির টিকা সরবরাহ রয়েছে খুবই সীমিত। প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত অর্থবছরে রাজবাড়ীতে সরকারিভাবে এলএসডির মাত্র ৬ হাজার ৫০০ ডোজ টিকা সরবরাহ করা হয়েছে। অথচ জেলার চাহিদা প্রায় দেড় লাখ ডোজ। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় সরকারি টিকার সরবরাহ অত্যন্ত কম।

সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সদর উপজেলায় গরুর খামার রয়েছে ৪ হাজার ৪৬৩টি। এর মধ্যে হৃষ্টপুষ্টকরণ খামার রয়েছে ৪ হাজার ৫৪টি। এ উপজেলায় মোট গরুর সংখ্যা ৭৬ হাজার ৪৩টি।সদর উপজেলায় প্রায় শতাধিক লাম্পি স্কিন ডিজিজে আক্রান্ত গরু ও বাছুর রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এলএসডিতে আক্রান্ত হয়ে ৩ থেকে ৪ টি বাছুর মারা গিয়েছে।

প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা জানান, ভাইরাসজনিত রোগ সময়ের সঙ্গে রূপ পরিবর্তন করে থাকে। লাম্পি স্কিনেও বর্তমানে দুই ধরনের লক্ষণ দেখা যায়। এক ধরনের গুটি গরুর শরীরে ছোট আকারে দেখা দেয়, যা ফেটে যায় না এবং এটি তুলনামূলক বেশি বিপজ্জনক। অন্য ধরনের গুটি তুলনামূলক বড় হয় এবং পরে ফেটে ঘা তৈরি হয়। ঘা হওয়া ধরনের ক্ষত দ্রুত ভালো হয়ে যায়।তিনি বলেন, আক্রান্ত গরুর শরীরে তাপমাত্রা বেড়ে যায়, খাবারের পরিমাণ কমে যায় এবং দুধ ও মাংস উৎপাদন কমে যায়।

বাংলাদেশে ২০১৯ সালের দিকে প্রথম লাম্পি স্কিন রোগ দেখা দেয়। শুরুতে বড় খামারগুলোতে আক্রান্তের হার বেশি থাকলেও টিকা ও অন্যান্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার কারণে অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। তবে প্রান্তিক পর্যায়ে গরু পালনকারীদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ও টিকা ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতার ঘাটতি থাকায় এখনো নানা সমস্যা রয়েছে। সরকারিভাবে সরবরাহ করা এলএসডি টিকার এক অ্যাম্পুলে পাঁচটি গরুকে টিকা দেওয়া যায়। অন্যদিকে বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানির টিকার এক অ্যাম্পুলে ১০টি গরুকে টিকা দিতে হয়। এসব টিকার এক অ্যাম্পুলের দাম ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত। ফলে অনেক প্রান্তিক গরু পালনকারীর কাছে টিকার এই খরচও বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে।

রাজবাড়ীতে বর্ষা মৌসুমে রোগটির বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের মতে, মশা, মাছি ও আটালির মাধ্যমে এ রোগ ছড়িয়ে পড়ে। ফলে গরুর বাসস্থান পরিষ্কার রাখা এবং রোগ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সুস্থ গরুকে সময়মতো টিকা দেওয়া জরুরি।

রাজবাড়ী সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. খায়ের উদ্দীন আহমেদ বলেন, সদর উপজেলায় সম্প্রতি শতাধিক গরু ও বাছুর লাম্পি স্কিন ডিজিজে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩ থেকে ৪টি বাছুর মারা গেছে। ভ্যাকসিনের উচ্চমূল্য ও সচেতনতার অভাবে অনেক খামারি টিকা দিতে আগ্রহী হন না। তবে আমাদের কিছু বিনামূল্যে ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রমের ফলে বর্তমানে রোগটি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

তিনি বলেন, মশা, মাছির কামড়ে এ রোগ ছড়ায়। তাই নিয়মিত গরুকে টিকা দেওয়ার পাশাপাশি খামার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং মশা-মাছির কামড় থেকে গরুকে সুরক্ষিত রাখার পরামর্শ দেন তিনি।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা প্রকাশ রঞ্জন বিশ্বাস বলেন, লাম্পি স্কিন একটি ভাইরাসজনিত রোগ। সারাদেশেই এটি ছড়িয়ে পড়েছে। সাধারণত মশা, মাছি ও আটালির মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায়। বর্ষার শুরুতে রোগটির প্রকোপ বাড়ে। আক্রান্ত গরুর তেমন কোনো চিকিৎসা নেই। সুস্থ গরুকে ভ্যাকসিন দেওয়ার মাধ্যমে রোগটি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

তিনি আরও বলেন, প্রাণিসম্পদ দপ্তরের উদ্যোগে খামার পরিদর্শন ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে খামারি এবং প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদের টিকা ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে আমাদের জনবল সংকট রয়েছে। মানুষকে সচেতন করার জন্য যে পরিমাণ উঠান বৈঠক করা প্রয়োজন, আমরা তা করতে পারছি না। গরু পালনকারীরা নিয়মিত টিকা দিলে এ রোগের প্রাদুর্ভাব অনেকটাই কমে যাবে।

খামারিদের অভিযোগ, লাম্পি স্কিন মোকাবিলায় তাদের সামনে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে টিকার অপ্রতুলতা ও দাম। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত সচেতনতামূলক কার্যক্রম না থাকায় অনেক কৃষক রোগের লক্ষণ, প্রতিরোধ ও টিকা দেওয়ার সঠিক সময় সম্পর্কে জানেন না।

প্রান্তিক কৃষকদের কাছে একটি গরু শুধু পশু নয়—অনেক পরিবারের সঞ্চয়, জীবিকা ও ভবিষ্যতের আশার প্রতীক। সেই গরু রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে চিকিৎসা ব্যয়ের পাশাপাশি হারিয়ে যায় পরিবারের বড় একটি সম্পদ। খুরশিদা বেগমের বাছুর হারানোর ঘটনা তারই একটি উদাহরণ।

তাই খামারি ও কৃষকদের দাবি, লাম্পি স্কিনের বিস্তার ঠেকাতে জেলার চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বাড়াতে হবে সচেতনতামূলক কার্যক্রম। মাঠপর্যায়ে জনবল সংকট দূর করে নিয়মিত খামার পরিদর্শন ও কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া গেলে রোগটির প্রকোপ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মীর সামসুজ্জামান সৌরভ/আরকে

বিজ্ঞাপন