একসময় সন্ধ্যা নামলেই আতঙ্কের জনপদে পরিণত হতো নওগাঁর সারাইগাছী- চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক। ডাকাত দলের রামদা, লোহার রড কিংবা সড়কে গাছ ফেলে ডাকাতির ঘটনা ছিল এই সড়কের নিত্যদিনের চিত্র। তবে জেলা পুলিশের সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত, নৈশকালীন বিশেষ ‘এসকর্ট’ (নিরাপত্তা বেষ্টনী) সেবা এবং কৌশলগত পয়েন্টে টহল বৃদ্ধি করার পর পাল্টে গেছে সড়কটির নিরাপত্তার দৃশ্যপট। বর্তমানে সড়কটিতে দূরপাল্লার যানবাহন ও পণ্যবাহী ট্রাক নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে চলাচল করছে।
গেল বছরের ডিসেম্বরে এই আঞ্চলিক সড়কটির পোরশা উপজেলার বেজোড়া বাজারে একসঙ্গে ২০টি দোকানে ডাকতি এবং ভাঙচুর করা হয়েছিলো। রাত ৮টার পর দোকান খুলে রাখা ব্যবসায়ীদের কাছে ছিল আতঙ্ক। সড়কে গাছ ফেলে পথরোধ করে লুটে নেওয়া হতো সর্বস্ব।
জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর সড়কটিতে ১৬টি ডাকাতি এবং দস্যুতার ঘটনা ঘটে। ঘটনা বিশ্লেষণ করে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করায় গত ৭ মাসে সড়কটিতে কোনো ডাকাতি কিংবা দস্যুতার ঘটনা ঘটেনি। ফলে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করছেন এই সড়কের যানবাহন চালক, স্থানীয় বাসিন্দা এবং ব্যবসায়ীরা।
সম্প্রতি মধ্যরাতে সড়কটি ঘুরে দেখা যায়, নওগাঁর পোরশা উপজেলার সারাইগাছি মোড় থেকে বন্ধু পাড়া মোড় পর্যন্ত পুলিশের বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে বসানো হয়েছে চেকপোস্ট ও সোলার লাইট। সারাইগাছী মোড়ে স্থাপন করা হয়েছে পুলিশ বক্স। এছাড়াও ঝুঁকিপূর্ণ মোড়গুলোতে মোতায়েন করা হয়েছে বিশেষ পুলিশ। চেকপোস্ট গুলোতে কোনো যানবাহনকে সন্দেহজনক মনে হলে করা হচ্ছে তল্লাশি। রাত ৯টার পর থেকে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে যানবহনগুলোকে পার করে দেওয়া হচ্ছে পুলিশের এসকর্ট সেবার মাধ্যমে। এছাড়াও সড়কটিতে নিয়মিত টহল দিচ্ছে পুলিশের বিশেষ টিম। জেলা পুলিশের এমন উদ্যোগে আতঙ্কের সড়কটিতে ফিরে এসেছে স্বস্তি। তাইতো এই সড়কে এখন স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করছেন আশপাশের গ্রামের বাসিন্দা এবং দূরপাল্লার যানবাহন চালকরা।
পিকআপ চালক দেলোয়ার হোসেন বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর থেকে মাল নিয়ে সৈয়দপুরের উদ্দেশ্যে যাচ্ছি। সাত-আট মাস আগে সন্ধ্যার পরে এ রাস্তা দিয়ে যেতে অনেক ভয় লাগতো। এখন আর ভয় কাজ করে না। পুলিশ আমাদেরকে নিরাপত্তা দিয়ে নিয়ে যায়।
সিএনজি চালক মোহাম্মদ মাহমুদ হোসেন বলেন, রাজশাহী থেকে রোগী নিয়ে এই সড়কে যাতায়াত করি। আগে রাতের বেলা রোগী আনার সময় ভয় কাজ করতো। এখন চেকপোস্ট স্থাপন করাতে গাড়িগুলোকে একসঙ্গে করে পুলিশ আমাদেরকে পার করে দিচ্ছে। যার কারণে এখন রাত দুইটা তিনটা বাজলেও রোগী নিয়ে আসতে কোন ভয় লাগে না। চালকদের পাশাপাশি যাত্রীরাও এখন স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াত করতে পারছেন।
বেজোড়া বাজার এলাকার ইলেকট্রিক ব্যবসায়ী বুলবুল ইসলাম বলেন, এই রোডে আমাদের ওপরে আগে অনেক নির্যাতন হয়েছে। সড়কে গাছ ফেলে রাস্তায় ডাকাতি হয়েছে। সন্ধ্যার পরে ডাকাতরা আমাদের অনেক ব্যবসায়ীকে মারধর করে টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। প্রায় সময় আমাদের বাজারে বিভিন্ন দোকানে ডাকাতি করে সর্বস্ব লুটি নিয়ে গেছে। কিন্তু এখন আর আমাদের ভয় নেই। আমাদের বাজারে নিয়মিত রাত্রিবেলায় পুলিশ ডিউটি করছে। যার কারণে আগে যেখানে সন্ধ্যা ৭টা-৮টার মধ্যেই দোকান বন্ধ করে দিতে হতো এখন রাত ১০টা পর্যন্ত দোকান খোলা রেখে ব্যবসা করতে পারছি। এমন উদ্যোগ গ্রহণের জন্য জেলা পুলিশকে ধন্যবাদ জানাই।
বাজারটির সেলুন ব্যবসায়ী মোহাম্মদ লালন বলেন, আগে বাজারে প্রায়ই ডাকাতি হতো। দোকানে কোনো ক্যাশ রেখে যাওয়া যেত না। রাতের বেলা ঘুমাতেও স্বাচ্ছন্দ্য কাজ করতো না। মনে হতো কখন যেন দোকানে চুরি হয়ে যাবে। এখন আর সেই ভয় নেই। নির্বিঘ্নে বাড়ি গিয়ে ঘুমাতে পারি।
সড়কটিতে ডিউটিতে থাকা পোরশা থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) অমিত কুমার দাস বলেন, পুলিশ সুপার স্যারের নির্দেশনায় আমরা সড়কে দায়িত্ব পালন করছি। আমাদের সীমানার যে ঝুঁকিপূর্ণ অংশটি রয়েছে এখানে প্রায় ছয়টি চেকপোস্টের মাধ্যমে গাড়িগুলোকে পার করা হয়ে থাকে। ফলে এখন আর কোনো ঝুঁকি নেই।
নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, পত্নীতলা থেকে পোরশা হয়ে আড্ডা পর্যন্ত সড়কটি একটি অপরাধ প্রবণ সড়ক। আগে প্রতিনিয়ত এই সড়কে ডাকাতি এবং দস্যুতার ঘটনা ঘটতো। নওগাঁ জেলায় গত বছর ১৬ টি ডাকাতির ঘটনা ঘটে। আমি এই জেলায় যোগদান করার পর আমরা এই পূর্বাপর ইতিহাসগুলো স্টাডি করি এবং আমরা কয়েকটা ধাপে কাজ শুরু করি। প্রথমত, আমরা পোরশা থানায় জনবল বৃদ্ধি করি। একই সাথে এখানে লজিস্টিকস এবং গাড়ির পরিমাণ বাড়ানো হয়। সেই সাথে অতীতের যে ডাকাতি মামলাগুলো ছিল, সেই ডাকাতদের গ্রেপ্তার করার জন্য বিশেষ টিম গঠন করি এবং গ্রেপ্তার করি।
তিনি আরও বলেন, আমরা ওই সড়কে এখনো মাঝে মাঝে ওত পেতে থাকি এবং স্পেশাল ড্রাইভ দেই। যাতে আমরা ডাকাতি প্রতিরোধ করতে পারি। আমরা এই পাঁচ-ছয়টা ধাপে যখন একসাথে কাজ করা শুরু করলাম, আমরা দেখলাম যে ফেব্রুয়ারি পর আমাদের এখানে এই সড়কে আর কোনো ডাকাতির ঘটনা নাই। কিন্তু তারপরও আমরা এই রাস্তায় আমাদের যে শক্ত অবস্থান সেটা আরও জোরদার করেছি। সম্প্রতি স্থানীয় জনসাধারণের সহায়তায় এখানে পুলিশের উদ্যোগে বেশ কিছু সোলার লাইট বসানো হয়েছে। একটা কথা পরিষ্কারভাবে আমি বলে দিচ্ছি, যারা এই সড়কে অপরাধ করতো বা অপরাধ করার ইচ্ছা আছে, তাদের বিরুদ্ধে জেলা পুলিশ আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ কঠোর ব্যবস্থা নেবে। পোরশা, সাপাহার এবং সারাইগাছী, আড্ডা— এই সড়কে ডাকাতির অধ্যায় আমরা স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে চাই।
মনিরুল ইসলাম শামীম/আরএআর
