রংপুরে একই পরিবারের চারজনের খুন হওয়ার ঘটনা যখন দেশ জুড়ে আলোচনায়, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে বেড়াচ্ছে আগামী চক্রবর্তীর একটি ছবি। যে ছবিতে ছিল একটি নতুন জীবন শুরুর গল্পের ইঙ্গিত। পছন্দের অদিত করের সঙ্গে বিয়ের পিড়িতে বসার কথা ছিল আগামী চক্রবর্তীর। কিন্তু মা-বাবা আর একমাত্র ভাইয়ের সঙ্গে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন আগামীও।
রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েলের একমাত্র মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী। সম্প্রতি কারমাইকেল কলেজ থেকে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে আগামী চক্রবর্তী। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা পূর্বপরিচিত অদিত করের সঙ্গে তার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। দুই পরিবারের মধ্যে বিয়ের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মাদকাসক্ত বখাটে যুবকদের নির্মমতায় শুরু না হতেই শেষ হয়ে গেছে অদিত কর ও আগামী চক্রবর্তীর স্বপ্নগল্প।
অদিতের এক বন্ধু জানিয়েছেন, আগামী চক্রবর্তী ও অদিতের বিয়ে চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল। দুই পরিবারের মধ্যে বিয়ের প্রস্তুতি নিয়ে কথাও হচ্ছিল। কিন্তু এমন ঘটনায় অদিত হতবাক।
সেই বন্ধু জানিয়েছে, অদিত কর হবু স্ত্রী আগামীকে হারিয়ে ‘ট্রমাটাইজড’। কদিন আগে অদিতের বাবা মারা গেছেন। এখন তার হবু স্ত্রীও মারা গেলেন। পরিস্থিতিতে অদিতকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা তার জানা নেই।
এদিকে অদিত কর নিজের ফেসবুক আইডিতে আগামী চক্রবর্তীর সঙ্গে একটি ছবি পোস্ট করেছেন। সেই ছবিতে লিখেছেন__ ‘আমার জীবনের শেষ সম্বলটাও শেষ হয়ে গেল। এটা বুধবারের ছবি। খুব করে বলল সেদিন আমরা তো কখনো কাপল পিক তুলি নাই, চলো আজকে তুলি। চিন্তা করো না আগামী, আমি তোমার সাথে ছিলাম, আছি, থাকব।’
শনিবার (২৩ আগস্ট) রাতে রংপুর নগরীর কামাল কাছনা মাছুয়াপাড়ার একটি বাসা থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার হয়।

নিহতরা হলেন-রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০), স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়ম (১২)। তাদের সবাইকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পর থেকে পরিবারটির সঙ্গে স্বজনদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। স্বজনদের মাধ্যমে খবর পেয়ে শনিবার রাতে বাসায় গিয়ে চারটি মরদেহ পায় পুলিশ।
বৃহস্পতিবার রাত ১টার দিকে আগামী চক্রবর্তীর সঙ্গে শেষ কথা বলেছিলেন তার মাসি পূজা চক্রবর্তী। তারপর থেকে আর কোনো যোগাযোগ ছিল না। পূজা চক্রবর্তীই শনিবার রাতে আবার তার বড় বোন প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও তাদের পরিবারের খোঁজ নিতে আসেন। আর তখনি তিনি জানতে পারেন পরিবারের সবাইকে খুন করা হয়েছে।
রোববার (২৩ আগস্ট) দুপুরে নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মেট্রোপলিটনের পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার কানুদাসের ছেলে মুগ্ধ দাস (২৩) ও বিনয়চন্দ্র দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাস (১৯)।
পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, দুইজন খুনি মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পাশের বিল্ডিংয়ের ওপর দিয়ে উনাদের ছাদে আসে। ছাদে আসে বৃহস্পতিবার দিবাগত শেষ রাতে। এই দুজন ছাদে বসে ইয়াবা সেবন করছিল। শব্দ পেয়ে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গিয়ে আড্ডা দেওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে পরিচয় গোপন রাখার জন্য তার গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। তার চিৎকার শুনে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় প্রীতিলতা চক্রবর্তীকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর মায়ের চিৎকারে এগিয়ে আসা মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তীকেও গামছা ও রশি দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। খুনিরা জানিয়েছে- প্রার্থী চক্রবর্তী মারা যাচ্ছিল না, প্রায় চার-পাঁচ মিনিট লাগে তার প্রাণ যাওয়ার ক্ষেত্রে। সেই সময় তারা রশি দিয়ে তার গলায় এবং মুখে পেঁচিয়ে ধরে। সর্বশেষে ঘুমন্ত অবস্থায় শিশু প্রিয়মকে কাপড় পেঁচিয়ে ও বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়।
ফরহাদুজ্জামান ফারুক/এসএইচএ
